টাকা দিয়ে বউ কেনার রেওয়াজ যে দেশে!

নাইজেরিয়ার সর্বদক্ষিণের ক্রস রিভার রাজ্যের বেশেরে নামক এই সম্প্রদায়ে এমন বিয়ের প্রচলন

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ সেই আদি কালে যেমন ছিলো দাসি প্রথা। সেই একই রকম প্রথা হলো বউ কেনার প্রথা। অর্থাৎ টাকা দিয়ে বউ কেনার রেওয়াজ এখনও প্রচলন রয়েছে নাইজেরিয়ার একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে!

আদি বিবর্তন হয়ে সভ্যতার বিবর্তনে এসে পৃথিবী এগিয়ে গেলেও এখনও অন্ধকারেই রয়েছে নাইজেরিয়ার একটি সম্প্রদায়। সেখানে এই আমলেও দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের শিশুদের টাকার বিনিময়ে বিয়ে দেওয়া হয়ে তাকে। অর্থাৎ বিয়ের নামে মেয়েদের কিনে নেয় প্রভাবশালীরা।

নাইজেরিয়ার সর্বদক্ষিণের ক্রস রিভার রাজ্যের বেশেরে নামক এই সম্প্রদায়ে এমন বিয়ের প্রচলন। সেখানে মানি ম্যারেজ বা অর্থের বিনিময়ে অল্প বয়সী মেয়েদের বিয়ের নামে বিক্রি করে দেওয়া ওই সম্প্রদায়ের একটি প্রচলিত প্রথা। শুধু বেশেরে-ই নয়, দেশটির আরও কয়েকটি সম্প্রদায়ের মধ্যেও এমন ধরণের বিতর্কিত প্রথা প্রচলিত রয়েছে।

অথচ বিক্রি হওয়া মেয়েটির না থাকে কোনো স্বাধীনতা বা শিক্ষা/চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ। স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা এই প্রথার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালালেও কোনো ফল হচ্ছে না।

সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা যায়, বেশেরে সম্প্রদায়ে মূলত দুই ধরণের বিয়ে হয়ে থাকে। একটি হলো লাভ ম্যারেজ বা ভালবাসার বিয়ে আর অপরটি এই মানি ম্যারেজ অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে বিয়ে।

লাভ ম্যারেজের ক্ষেত্রে স্ত্রীর জন্য কোনো রকম পণ দিতে হয় না। নববধূ স্বাধীনভাবে বাবার বাড়ি আসতে যেতেও পারেন এবং তার ঘরে যে সন্তান জন্ম নেবে সেটা মায়ের পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে।

তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি বেশেরের বেশিরভাগ গ্রাম প্রধানকেই মানি ওয়াইফ রাখতে দেখা যায়। মানি ম্যারেজে কম বয়সী মেয়েদের বিক্রি করে দেওয়ায় তারা তাদের স্বামীর পরিবারের নিজস্ব সম্পত্তিতে পরিণত হয়। এমনটাই জানিয়েছেন স্থানীয় মিশনারি এবং শিশু অধিকার আন্দোলনকারী সদস্য পস্তোর রিচার্ড।

পস্তোর রিচার্ড সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, একজন মানি ওম্যানের কোনো সম্মান থাকে না। তাদের স্কুলে যাওয়ার অনুমতিও নেই, তাদেরকে ঠিকঠাক মতো খেতেও দেওয়া হয় না। সে সবার উচ্ছিষ্ট খাবার খায়। তারা শিশুশ্রম হতে শুরু করে অমানবিক যৌন নিপীড়নেরও শিকার হন। অনেকেই অন্ত:সত্ত্বা হলেও মায়ের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পান না।

মনিকা নামে এক নারী হলেন বেশেরে সম্প্রদায়েরই একজন সদস্য । তিনি বসবাস করেন গাছপালা বেষ্টিত একটি এলাকায় যার চারপাশ উঁচু পাহাড় ও সবুজের গালিচায় ছাওয়া। তবে সেই সুন্দরের ছোঁয়া মনিকার পরিবারের মধ্যে নেই। তিনি তার দুই নাতনিকে অনেক ছোট থাকতেই মানি ম্যারেজের জন্য বিক্রি করে দিয়েছেন।

কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, পরিবারকে জুজু নামের অভিশাপ হতে রক্ষা করতে মোটা অংকের অর্থ প্রয়োজন ছিল। সেজন্যই তিনি নাতনিদের বিক্রি করে দিয়েছেন। তবে এক বছর পর হতেই সেই সিদ্ধান্তের জন্য ভীষণভাবে অপরাধবোধে ভুগছেন মনিকা।

মনিকার নাতনি হ্যাপিনেসের বর্তমান বয়স ১৫ বছর। গত বছর সে তার মানি ম্যারেজ হতে পালিয়ে এসেছে। হ্যাপিনেস জানিয়েছেন, ওই লোকটার এতোই বয়স বেশি যে তার নাতি-নাতনির ঘরেও সন্তান রয়েছে। লোকটা প্রায়ই আমাকে মারতো আর বলতো, আমাকে যদি সে পিটিয়ে মেরেও ফেলে তাকে কেও কিছুই বলতে পারবে না। আমাকে মেরে ফেললেও তার কিছুই হবে না। কারণ হলো আমি তার মানি ওয়াইফ!

ওই ঘটনার জন্য মনিকার সঙ্গে তার দুই মেয়ে ও দুই নাতনির সম্পর্ক আজও স্বাভাবিক হতে পারেনি। এখনও দাদীর প্রতি তীব্র ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন হ্যাপিনেস।

মনিকা বলেছে, আমি আমার দাদিকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছি। সেখানে আমি লিখেছি যদি আমি মারা যাই ও সে যদি আমার শেষকৃত্যে আসে, বাইকে করে। তাহলে একটা দুর্ঘটনা ঘটে তার হাত পা ভেঙ্গে যাবে।

হ্যাপিনেস আরও বলেন, যেদিন আমি স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে এলাম, সেদিন তাকে আমি বলেছি, কোনোদিন আমি এতোটাই রেগে যাবো যে আমি একটা ছুরি নিয়ে তাকে খুনও করে ফেলতে পারি।

মানি ওয়াইফ রাখা সামাজিক মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়ানো ও এই প্রথা বিলুপ্তির কোনো রকম আভাসই দেখা যাচ্ছে না। তবে এই সম্প্রদায়ের প্রধান চিভসামদে চিলের দাবি হলো, বর্তমান মানি ওয়াইফ প্রথার কোনো অস্তিত্বই নেই।

তিনি বলেছেন, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে তাদের কাওকেই মানি ওয়াইফ হিসেবে বিয়ে করা যায় না। তিনি আরও বলেন, এখনও অনেক মানুষ মনে করে যে বেশেরে সম্প্রদায়ে এখনও মানি ম্যারিজ হচ্ছে। তবে এখন আর এসব হয় না। এটি নব্বই দশকের শুরুর দিকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এই সম্প্রদায়ের প্রধান চিভসামদে চিলে এমন দাবি করলেও বাস্তব চিত্র পুরোই উল্টো। দুর্ভাগ্যবশত বেশেরের বেশিরভাগ গ্রাম প্রধানকেই মানি ওয়াইফ রাখতে দেখা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালেই নাইজেরিয়া হতে মানি ম্যারেজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলেও দায়ীদের কাওকে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এই ধরণের প্রথাকে নিশ্চিহ্ন করতে পাস্তর রিচার্ডের মতো আরও অনেক আন্দোলনকারী কাজ করে চলেছেন।

Advertisements
Loading...