নৌপথে ভ্রমণ- কুড়িগ্রাম থেকে সেন্টমার্টিন

ক্লান্তিকর জীবনে ছন্দ আনতে ভ্রমণ অপরিহার্য, তাই নিজের মতো সময় বের করে ঘুরে আসুন

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ ক্লান্তিকর জীবনে ছন্দ আনতে ভ্রমণ অপরিহার্য, তাই নিজের মতো সময় বের করে ঘুরে আসুন। একবার ভাবুন তো আপনি ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা, মেঘনার বুক চিড়ে নদীর মাঝের চরের সৌন্দর্য, দুই পাশের প্রকৃতির রূপ লীলা, সাগরের বুকে জেগে উঠা দ্বীপের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে কখনও ট্রলারে আবার কখনও বা লঞ্চ জাহাজে ছুটে চলেছেন। কেমন হবে সেই দৃশ্যগুলো? কল্পনার মতো মনে হলেও আজ আমি আপনাদের বাস্তবিকেই এমন রুটের সন্ধান দিব যেখানে পরতে পরতে লুকিয়ে থাকবে অনাবিল সৌন্দর্য। আপনি যখন কুড়িগ্রাম সদর থেকে ধলেশ্বরী হয়ে যাত্রা শুরু করবেন, তখন পথে পথে ঠিক এমন দৃশ্যই চোখে পড়বে।

কুড়িগ্রাম থেকে নৌপথে আগে কেউ সেন্ট মার্টিন গিয়েছেন বলে শোনা যায়নি। কয়েকদিন আগে আমার মাথায় সর্বপ্রথম এই রুটের প্ল্যান আসে। এরপর ব্যাপক খোঁজ খবর নিয়ে যাতায়াতের বিস্তারিত বের করি।

এ যাত্রায় আপনি দেখতে পারবেন অসংখ্য চর, দেশের একমাত্র রেল ফেরি ঘাট, নিচ থেকে যমুনা সেতুর ভিউ, যমুনা-পদ্মার মিলনস্থল, মনপুরা দ্বীপ, নিঝুমদ্বীপ, সন্দ্বীপ, কুতুবদীয়া দ্বীপ, মহেশখালী দ্বীপ। যাকে বলে এক ঢিলে সব পাখি মারা। নদীর স্রোতধারা, শীতের শান্ত সমুদ্রের মায়াবী ঢেউ আপনার আনন্দকে বাড়িয়ে দিবে কয়েকগুণ। পথ চলতে চলতে মাঝ সমুদ্রে দাঁড়িয়ে যখন সূর্যাস্ত দেখবেন সেটা হতে পারে আপনার জীবনের সেরা মুহূর্ত। এই রোমাঞ্চকর ভ্রমণের সঙ্গী হতে হলে আপনার প্রচুর ধৈর্য, সাহস, সময় যেকোনো পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার মন মানসিকতা থাকতে হবে। ১০/১২ দিনের লম্বা ভ্রমণের শেষের দিকটা একঘেয়েমি ধরে যেতে পারে। তাই ধৈর্য ধরতে হবে শেষ পর্যন্ত।

কীভাবে যাবেন?

আপনি দুই দিক থেকে যাত্রা শুরু করতে পারেন। কুড়িগ্রামের রৌমারি ঘাট থেকে বা কুড়িগ্রাম সদরের মোঘলবাসা ঘাট থেকে। ঢাকা থেকে বাসে কুড়িগ্রাম অথবা জামালপুর হয়ে রৌমারি যেতে হবে। কুড়িগ্রাম সদরের মোঘলবাসা ঘাট থেকে শুরু করলে থেকে সকাল ৯টায় রাজিবপুরের উদ্দেশ্যে ট্রলার ছেড়ে যায়। ধরলার কোল ঘেঁষে আপনি গিয়ে পরবেন ব্রহ্মপুত্রে। উঠবেন গিয়ে রাজিবপুর। আর রৌমারি থেকে শুরু করলে রৌমারি ঘাট থেকে রাজিবপুর যেতে হবে ট্রলারে। রাজিবপুর থেকে ট্রলারে যেতে হবে গাইবান্ধার বালাসি ঘাটে। আপনার প্রথম দিনের যাত্রা এখানেই সমাপ্তি। বালাসিতে ক্যাম্পিং করুন। হোটেলে থাকতে চাইলে গাইবান্ধা সদরে চলে যান। মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে। তবে বালাসিতেও হোটেল পেতে পারেন। এই বালাসি ঘাট দেশের একমাত্র রেল ফেরি ঘাট। যমুনা সেতু হওয়ার পূর্বে এই ঘাট হয়েই ফেরি দিয়ে রেল পারাপার হত জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাটে।

পরদিন ভোরে আপনাকে ধরতে হবে বালাসি থেকে সিরাজগঞ্জ সদরের ঘাটের ট্রলার। মনে রাখবেন সকাল ১০ টার মধ্যে সব ট্রলার ছেড়ে যায়। মিস করলে আরও একদিন এখানেই থাকতে হবে। সিরাজগঞ্জে রাতে যাত্রা বিরতি দিয়ে পরদিন সকালে ঘাট থেকে ধরতে হবে আরিচার ট্রলার। এখান থেকেও ১০ টার আগেই সব ট্রলার ছেড়ে যায়। তাই মিস করা যাবে না। রাতটা এখানেই কাটাতে হবে। চাইলে ক্যাম্পিং করতে পারেন আরিচা ফেরি ঘাটে। হোটেলে থাকতে চাইলে খুঁজে নিতে হবে। পরদিন যেতে হবে আরিচা থেকে চাঁদপুর। দুঃখিত এই রুটের পাবলিক ট্রলার খুঁজে পাই নি এখনও। তাই আপনাকে যেতে হবে রিজার্ভ করে বা মালবাহী ট্রলারে। তবে চাঁদপুর গিয়ে ঘুমানো যাবে না। রাতেই আপনাকে মনপুরাগামী এমভি টিপু ৫ বা পানামা লঞ্চ ধরতে হবে।

মনপুরা দ্বীপে একদিন ঘুরে পরদিন যেতে ট্রলারে যেতে হবে নিঝুমদ্বীপ। নিঝুমদ্বীপ দেখে হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে যেতে হবে। সেখান থেকে জাহাজে সন্দ্বীপ যেতে হবে। সন্দ্বীপ দেখে জাহাজে করে চট্টগ্রাম সদরঘাট। সেখান থেকে ট্রলারে কুতুবদীয়া দ্বীপ। কুতুবদীয়া ঘুরেফিরে দেখে পরদিন ট্রলারে মহেশখালী। মহেশখালীতে দেখার মত কিছু নাই। তবুও আপনি চাইলে এখানে রাত কাটাতে পারেন। মহেশখালি থেকে ট্রলারে কক্সবাজার যেতে হবে। এরপর রিজার্ভ বা মাছ ধরার ট্রলারে টেকনাফ। রিজার্ভ ট্রলার নিয়ে উঠতে হবে টেকনাফ জেটিতে। সেখান থেকে জাহাজে করে সেন্ট মার্টিন। সেন্ট মার্টিন পৌঁছে চারদিকে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতির অপূর্ব রূপ সুধা পান করুন। সেন্ট মার্টিনে ২/১ দিন কাঁটিয়ে জাহাজে করে টেকনাফ ফিরে আসুন। টেকনাফ থেকে বাসে ঢাকা। আর আপনি যদি এত ঝামেলায় না যেতে চান তাহলে কুড়িগ্রাম থেকে রিজার্ভ ট্রলার নিয়ে চাঁদপুর চলে আসতে পারেন অথবা মালবাহী ট্রলারে ভেঙ্গে ভেঙ্গে চাঁদপুর আসতে পারেন। এরপর বাকি পথ উপরের মতোই।

খরচ হবে কত?

খরচ নির্ভর করবে আপনি কিভাবে ট্যুর দেন সেটার উপরে। যদি ব্যাকপ্যাক স্টাইলে ভ্রমণ করেন তাহলে খরচ হবে ৬৫০০ এর মত। মালবাহী ট্রলারে যেতে পারলে খরচ আরও কম হবে। এইটাই সবচেয়ে সস্তার ট্যুর। আর যদি হোটেলে থেকে খেয়ে ট্যুর করেন তাহলে খরচ হবে ১২,০০০ টাকা। রিজার্ভ করে নিয়ে গেলে খরচ হবে ১৫,০০০-২০,০০০ টাকা।

সাবধানতাঃ

সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট নিয়ে যাবেন। কারণ আপনাকে বিশাল বিশাল সব নদী, সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। অতিরিক্ত এডভেঞ্চারের জন্য বর্ষাকালে না যাওয়াই ভাল। বর্ষায় নদী, সাগর সবই উত্তাল থাকে। এ ছাড়া দ্বীপের জনমানবহীন এলাকায় ক্যাম্পিং করবেন না। ডাকাতির শিকার হতে পারেন।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...