The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

সীমান্ত পিলার বাড়ির উঠানে!

একদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল অপরদিকে দূরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের টহল

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ বৃটিশরা ২শ’ বছর শাসন করেছিলো এই অঞ্চলে দেশগুলো। ইংরেজ শাসনের সেইসব কথা এখন ইতিহাসের পাতায় পাতায় দেখা যায়। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসান হওয়ার সময় সীমানা পিলার করা হয়। সেই এমন একটি পিলার পড়েছে এক ব্যক্তির বাড়ির উঠানে।

সীমান্ত পিলার বাড়ির উঠানে! 1

২শ’ বছরের বৃটিশ শাসনের পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করেছিলো। তবে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার পূর্বে অবিভক্ত ভারতকে ভারত ও পাকিস্তান নামে পৃথক দুই দেশে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ একদিকে ভারত অপরদিকে পূর্ব পাকিস্তান।

এই দেশ ভাগ শুধু মানচিত্রের উপর এক দাগই নয়, এটি এক গভীর ক্ষত যা পরিবারকে বিভক্ত করেছে। এক হৃদয়কে দুই ভাগে ভাগ করেছে। সেই স্বাধীনতার ৭২ বছর পরও যা এখনও তাজা রয়েছে।

এই ক্ষত চিহ্নের জীবন্ত ছবি এখনও বিদ্যমান। যা দেখা যায় ত্রিপুরা রাজ্যের সিপাহীজলা জেলার কলমচৌড়া থানার অন্তর্গত নগর গ্রামটিতে। এই গ্রামের একটি বাড়ির উঠোনের উপর দিয়ে চলে গেছে ভারত-বাংলাদেশ সীমানা। দুই ভাইয়ের ঘরসহ সম্পত্তি চলে গেছে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে ও বাকি দুই ভাইয়ের ঘর পড়েছে ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে। বাড়ির উঠোনের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে সীমান্তের জিরো পয়েন্টের পিলার!

একদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল অপরদিকে দূরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের টহল। এরমধ্যেই চলছে দৈনন্দিন কাজ-কর্ম।

এই বাড়ির ভারতীয় অংশের বাসিন্দা হলেন মোহাম্মদ হোসান উল্লা (১৮)। তিনি জানিয়েছেন, দুই চাচার ঘরসহ সম্পত্তি বাংলাদেশের মধ্যে চলে গেছে। একই বাড়ির মানুষ হওয়া সত্বেও তারা বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক। অপরদিকে তাদের ঘর এবং সম্পত্তি ভারতীয় অংশে হওয়ায় তারা ভারতীয় নাগরিক।

সীমান্তের জিরো পয়েন্টে বাড়ি হওয়ায় জীবনে রয়েছে নানা সমস্যা। এমনিতে বাড়ির ভারত ও বাংলাদেশ অংশের লোকজন একে-অন্যের ঘরে অনায়াসে যাওয়া-আসা করতে পারে। কিন্তু সীমান্তের জিরো পয়েন্ট ছেড়ে মূল ভূখণ্ডে আসতে গেলে বেশ জটিলতার সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের নিজ নিজ পরিচয়পত্র দেখাতে হয় তাদেরকে।

একইভাবে পরিবার বাংলাদেশের দিকে থাকা সদস্যদেরও বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে গেলে বিজিবি সদস্যদের অনুমতি নিতে হয়। বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান করতে হলেও দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের অনুমতি নিতে হয়। নিয়ম-কানুনের বেড়াজালের কারণে অন্য জায়গায় থাকা আত্মীয় পরিজনরা অনুষ্ঠানে যোগও দিতে পারে না কখনও।

এমন নিয়ম-কানুনের কারণে যারা আর্থিকভাবে একটু স্বচ্ছল তারা সীমান্তঘেঁষা এলাকা ছেড়ে অন্য স্থানে গিয়ে বাড়ি তৈরি করেছেন। অপরদিক এর স্বাক্ষী হিসেবে রয়েছে জিরো পয়েন্টের আশপাশে পড়ে থাকা ফাঁকা বাড়িগুলো।

এই এলাকারই বাসিন্দা হলেন আবুল হোসেন (৫০)। তিনি জানিয়েছেন, বিভাজন শুধু বাড়িকেই ভাগ করেনি ভাগ করেছে জমিজমা, সম্পত্তি, পুকুর এমনকি মসজিদ পর্যন্ত!

তিনি আরও জানিয়েছে, পূর্বে পুরো এলাকাটির নাম ছিলো নগর গ্রাম। এখনও ভারতীয় অংশের নাম নগর গ্রাম তবে বাংলাদেশের অংশের নাম হায়দ্রাবাদ। প্রায় ২শ’ বছরের পুরাতন মসজিদ বিভাজনকারীদের কলমের দাগে চলে যায় পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশে। আগে সেখানে সমগ্র গ্রামের মানুষ নামাজ আদায় করতো কিন্তু এখন ভারতীয়রা আর যান না ওই মসজিদে।

নিজের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি সীমান্তের জিরো পয়েন্টে থাকলেও এখন এই বাড়ি ছেড়ে সীমান্ত হতে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বাড়ি তৈরি করে চলে গেছেন। যারা যেতে পারেননি তারা রয়ে গেছেন সীমান্তের জিরো পয়েন্টে। তবে তাদের একদিন পূর্বপূরুষের ভিটে ছেড়ে চলে যেতে হবেই। কারণ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সবদিকে কাঁটাতারের বেড়া হয়ে গেছে, এক সময় এই অংশেও হবে কাঁটাতারের বেড়া। তখন উভয় দেশের সীমান্তনীতি মেনে তাদের চলে যেতেই হবে।

Loading...