The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের জন্য এবার মুম্বাইতেও বন্দি শিবির!

‘অবৈধ বিদেশি’দের আটক রাখতে মুম্বাইয়ের উপকণ্ঠে এক বিশাল ‘ফরেনার্স ডিটেনশন সেন্টার’ বা ‘বিদেশি বন্দি শিবির’ গড়ে তোলারও উদ্যোগ নিয়েছে মহারাষ্ট্র সরকার

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে ‘প্রকৃত নাগরিক’ চিহ্নিত করার যে বিতর্কিত অভিযানের পর কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের জন্য এবার মুম্বাইতেও বন্দি শিবির করা হচ্ছে!

কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের জন্য এবার মুম্বাইতেও বন্দি শিবির! 1

আসামে প্রায় ২০ লাখ মানুষের রাষ্ট্রহীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই একই ধরনের অভিযান এবার পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্রেও শুরু হতে চলেছে বলে পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তারই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাজ্যে ‘অবৈধ বিদেশি’দের আটক রাখতে মুম্বাইয়ের উপকণ্ঠে এক বিশাল ‘ফরেনার্স ডিটেনশন সেন্টার’ বা ‘বিদেশি বন্দি শিবির’ গড়ে তোলারও উদ্যোগ নিয়েছে মহারাষ্ট্র সরকার।

ভারতের আর্থিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত মুম্বাইয়ের শহরতলীতে ‘নাভি মুম্বাই’ নামে যে উপনগরী তৈরি করা হয়েছে, তারই নেরুল এলাকায় এই সেন্টারটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে ভারত সরকার। মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই নাভি মুম্বাইতে সিটি অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের কাছে চিঠি লিখে এর জন্য সাড়ে ৪শ’ বর্গমিটারের একটি প্লট অধিগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।

মুম্বাইতে সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এই জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে ‘অবৈধ বিদেশি’দের আটক রাখার জন্যই। ওই জমিতে বর্তমানে দু:স্থ মহিলাদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র চালানো হচ্ছে, সেই স্থানে সেটিকে পরিণত করা হবে একটি বন্দি শিবিরে।

ইতিমধ্যেই আসামে এই মুহূর্তে ৬টি ডিটেনশন সেন্টার গড়ে তুলে যেভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে শত শত মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে, মুম্বাইও এবার সেই একই পথে হাঁটতে চলেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মত দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের সঙ্গে আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিতব্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।

মুম্বাইতে টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞানী পি কে শাজাহান জানিয়েছেন যে, ‘‘মুম্বাই তথা মহারাষ্ট্রে প্রতিবার ভোটের পূর্বে ‘অবৈধ বাংলাদেশি তাড়ানো’কে রাজনৈতিক ইস্যু বানানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকে। এবারও ডিটেনশন সেন্টার বানানোর নামে সেই চেষ্টাই যে করা হচ্ছে তাতে কোনও রকম সন্দেহ নেই।’

অধ্যাপক শাহজাহান আরও বলেছেন, ‘ভোটের মাত্র মাসখানেক বাকি, তার পূর্বে হয়তো এখানে আসামের এনআরসি-র মতো প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে না। কারণ তার জন্য যথেষ্ট সময় হাতে নেই। তবে ডিটেনশন সেন্টার গড়ার কথা বলে বিজেপি-শিবসেনা এটাই প্রমাণ করতে চাইছেন যে, আবার ক্ষমতায় এলে তারা কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের তাড়িয়েই ছাড়বে!’

মুম্বাইভিত্তিক ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলনের নেত্রী জাকিয়া সোমান আবার আশঙ্কা করছেন যে, এই প্রস্তাবিত সেন্টারে বাংলাদেশি ভরার নামে ভারতের সত্যিকারের বাংলাভাষী মুসলিম নাগরিকরাও হেনস্থার শিকার হবেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

জাকিয়া সোমান সংবাদ মাধ্যমকে বলছিলেন, ‘দেখুন মুম্বাই হতে প্রায় প্রতি মাসেই কিছু কিছু বাংলাদেশি নাগরিককে ডিপোর্ট করা হয় বলে আমরা জেনেছি। ভোটের পূর্বে সেই প্রবণতা হয়তো আরও কিছুটা বাড়ে। তবে সেই সংখ্যাটা কখনও এতো বেশি নয় যে তার জন্য শহরতলিতে পেল্লায় সেন্টার গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে।’

সোমান আরও বলেছেন, ‘আমার আশঙ্কা যে, এখন এই ধরনের ডিটেনশন সেন্টার ভর্তি– এটা দেখানোর জন্য মুম্বাইয়ে কর্মরত পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু বাঙালি মুসলিমরা, যাদের হয়তো সঠিকভাবে কাগজপত্র নেই, তাদের এখানে পুরে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’

অপরদিকে এনআরসি ইস্যুটি যেভাবে ভারতে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর একটি বিষয় হয়ে উঠছে, তাতে করে মহারাষ্ট্রে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও এই ডিটেনশন সেন্টার গড়ার বিরোধিতা করতে দ্বিধার মধ্যে রয়েছে।

মুম্বাইতে কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা সঞ্জয় নিরুপমের (যিনি নিজেও আসলে মহারাষ্ট্রের লোক নন, বিহার হতে আসা অভিবাসী) সঙ্গে এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা হতে বিরত থেকেছেন।

তবে বিজেপি এবং শিবসেনার মতো হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর দাবি হলো, মহারাষ্ট্রে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের চাপ এতোটাই বেড়ে গেছে যে, এই ধরনের সেন্টার গড়ে তোলা ছাড়া তাদের কোনও উপায় নেই।

‘রামভাউ মহালগি প্রবোধিনী’ নামক আরএসএস প্রভাবিত এনজিও মুম্বাইয়ের এই কথিত বিদেশিদের নিয়ে গবেষণা করছে দীর্ঘদিন থেকে। ওই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা রভি পোখর্নাও মনে করেন যে, মুম্বাইতে এই ধরনের সেন্টার আসলে গড়ে তোলা উচিত ছিল আরও অনেক পূর্বেই। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা লাখ লাখ অবৈধ অভিবাসী মুম্বাইয়ের রিসোর্স ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই শুধুই চাপ সৃষ্টি করছে না, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।’

রভি আরও বলেছেন, ‘সে কারণে ডিটেনশন সেন্টার গড়ে তাদের আটকে রাখতেই হবে এবং তাদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। সাজার মেয়াদ শেষ হলেই নিজের দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। ঠিক এই কথাই বলে ভারতের ফরেনার্স অ্যাক্টও।’

সুতরাং মহারাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনের পূর্বে কথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ শনাক্ত করার অভিযান জোরেশোরে শুরু হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, অন্তত সেটি দেখানোর তাগিদ সরকারের দিক থেকেই বেশি।

Loading...