The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

রাজধানী ঢাকায় ৪৪ শতাংশ মানুষই বিষণ্ণতায় ভুগছে!

এ বছরের জুন-জুলাই মাসে ঢাকায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মানুষের ওপর একটি সমীক্ষা চালালো হয়

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ ছোট্ট একটি তথ্য আমাদের চমকে দিতে পারে আর তা হলো রাজধানী ঢাকায় ৪৪ শতাংশ মানুষই বিষণ্ণতায় ভুগছে! সত্যিই কী তাই? কিন্তু কেনো এমন পরিস্থিতি? বিষয়টি নিয়ে একটি ছোট্ট পর্যালোচনা।

রাজধানী ঢাকায় ৪৪ শতাংশ মানুষই বিষণ্ণতায় ভুগছে! 1

জুন-জুলাই মাসে ঢাকায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মানুষের ওপর একটি সমীক্ষা চালালো হলে তা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে, রাজধানী ঢাকার ৬৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ভাবে অসুস্থ। এছাড়াও মোট জনগোষ্ঠীর ৪৪ শতাংশই ভুগছে বিষণ্ণতায়। এই গবেষণাটি চালিয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস। তাহলে এতো মানুষের বিষণ্ণতায় ভোগার কারণ কী?

জবাবে বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড: এস এম জুলফিকার আলী সংবাদ মাধ্যম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এর বড় কারণই হলো স্বাস্থ্য সম্পর্কিত।”এই বিষণ্ণতার বড় কারণই হতে পারে অসুস্থতাও। এছাড়াও ১৭% দরিদ্র মানুষ। অর্থনৈতিক কারণে তাদের অনেকেই বস্তিতে বসবাস করে। বসবাসের সংস্থান নেই অনেকেরই।” এছাড়াও নগরীর ট্রাফিক জ্যাম, বাতাসের মান, বিশুদ্ধ পানির অভাব, ইভিটিজিংসহ আরও অনেক সমস্যা বিষণ্ণতার কারণ হিসেবে গবেষণায় উঠে এসেছে বলে বলেছেন ড: এস এম জুলফিকার আলী।

তিনি আরও বলেন, মূলত চারটি প্রধান কারণ পাওয়া গেছে, যেগুলো মানুষের ওপর চরম মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। এগুলো হলো- ১. অসুস্থতায় ভোগা ২. দারিদ্র্য ৩. জীবনযাত্রার মান এবং দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা।

সব কিছু মিলিয়ে এর সমাধান আসলে কোথায়:

সাধারণভাবে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ থাকে এবং অনেকেই সেজন্য চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকেন। তবে সেটি আক্রান্ত হওয়ার পর কিভাবে সুস্থ্য হওয়া যায় তার একটি উপায় রয়েছে। ড: জুলফিকার আলী বলছেন, মানুষ যেনো বিষণ্ণতার মতো সমস্যায় আক্রান্ত না হতে পারে সেটিও তারা তাদের গবেষণায় দেখার চেষ্টা করেছেন। “এটি ঠিক শহরে মানুষ যেসব কারণে সাধারণভাবে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হচ্ছে, সেগুলোর সব রাতারাতি সমাধান সম্ভব হবে না, তবে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যায় যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে আরও সহজ করে তুলবে।”

এক্ষেত্রে বলা হয়েছে যেমন যানজটের কথা। এই যানজট প্রতিনিয়ত মানুষকে মানসিক চাপে ফেলছে তবে রাতারাতি রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল করে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এমন একটি ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা যার মাধ্যমে যানজটের প্রকোপ ৩০/৪০ ভাগ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সেটি হলে সার্বিক পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়বে যা মানুষের মানসিক চাপ কমিয়ে আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে, বিষয়টি বলছিলেন মিস্টার আলী।

আবার হাসপাতালের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অবকাঠামোর ভেতরেই সেবাকে আরও অনেকখানি উন্নত বা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন এই গবেষক। বিষণ্ণতা কমিয়ে আনতে ৩টি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করে তিনি। সেগুলো হলো :

১. প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে বা যাতে কার্যকর হয় তা নিশ্চিতও করতে হবে যেমন ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম খুবই দুর্বল, এটা ঠিক হলে যানজট অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

২. নীচের দিকে জনগোষ্ঠী অর্থাৎ দরিদ্র কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী- তারা যাতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশি সুযোগ পায়। এখন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সুযোগও অনেক কম। এই বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সহজ প্রবেশাধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

৩. টার্গেটেড ইন্টারভেনশন- সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শহরেও সঠিকভাবে থাকা উচিত। যেমন বায়ু দূষণের মতো সমস্যার ব্যবস্থাপনা এবং রেগুলেশনের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ইটভাটার ক্ষেত্রে বা যেসব গাড়ীতে কালো ধোঁয়া কিংবা শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

গবেষণায় উঠে আসা বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:

# ঢাকায় অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে বেশি থাকা সত্ত্বেও এখানেও অনেক দরিদ্র মানুষ বসবাস করেন।

# রাজধানী ঢাকার মাত্র চার ভাগের একভাগের নিজস্ব বসবাসের স্থান রয়েছে।

# ক্ষুদ্র পেশাজীবী কিংবা বেতনভুক্ত চাকুরেরাই পেশাজীবী গ্রুপগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

# অভিবাসন প্রবণতায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। এখন উত্তরাঞ্চল হতে বেশি লোক ঢাকায় আসছে।

# ট্রাফিক জ্যাম, বায়ু দূষণ, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং বাজে রাস্তাঘাট নগরবাসীর বড় কয়েকটি সমস্যা।

# আবার এসব অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও মানুষ তেমন অসুখী নয়, এর কারণ কাজের সুযোগের পাশাপাশি ঢাকাতেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বেশি রয়েছে।

# অন্যদিকে শিক্ষা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

মানসিক চাপ নাকি বিষণ্ণতা: মনোবিদরা কী বলেন?

এই বিষয়ে মনোবিদ মেঘলা সরকার বলেছেন, অনেক কিছুই মানুষের মধ্যে সাময়িক-মানসিক চাপ তৈরি করছে তবে সেগুলোকে বিষণ্ণতা বলা ঠিক হবেনা।

মনোবিদ মেঘলা সরকার বলেছেন, “বিষণ্ণতা একটি রোগ। মানুষ নানা কারণে চাপ বোধ করতে পারেন। সেটি যদি তার জীবনযাত্রা কিংবা দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত না করে তাহলে সেটি কখনও রোগ নয়। মানসিক চাপ মোকাবেলার ক্ষমতা মানুষের মধ্যে যতো বেশি থাকবে সেটি তার জন্য ততোই ভালো হবে।”

তিনি মনে করেন, দুটি কারণে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারে মানুষ: একটি হলো শারীরিক অন্তর্গত কারণ ও অন্যটি হলো বাহ্যিক পরিবেশ।

মনোবিদ মেঘলা সরকার বলেন, “বর্তমানে নিয়মিত ট্রাফিক জ্যামে পড়া, কিংবা অসুস্থতায় ভোগা বা অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না হলে মানুষ মানসিক চাপে ভুগতে পারেন। তবে এ থেকে উত্তরণের চেষ্টাও তার থাকে তারা। রাষ্ট্র কিংবা সমাজে সবকিছুই মনমতো হয়না। তবে মানুষ সে চাপ মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে থাকে। তাই মানসিক চাপে থাকার অর্থই অসুস্থতা নয়।”

তবে ক্রমাগত মানসিক চাপ যদিওবা কারও কাজে কর্মে ব্যাঘাত ঘটায় মারাত্মকভাবে কিংবা যদি তার উৎপাদনশীলতা কমে যায় কিংবা তার আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন অথবা সে যদি নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নেয় তাহলে তা অবশ্যই উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে মনে করেন মনোবিদ মেঘলা সরকার।

Loading...