শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ এ মাসেই ॥ আবাসিক ক্ষেত্রে আটকে পড়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ গ্যাস সংকটের কারণে দেশের শিল্প কারখানা এবং আবাসিক ক্ষেত্রে চলছে এক নাজুক অবস্থা। সমপ্রতি পেট্রোবাংলা শিল্প কারখানায় নতুন কিছু সংযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

পেট্রো বাংলা সূত্রে জানা গেছে, মধ্য এপ্রিল থেকে শিল্পে সীমিত গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হবে। তবে যে সব শিল্প গ্রাহক গ্যাস সংযোগ বন্ধ হওয়ার আগে আবেদন করেছিল সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে সে সব গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। মূলত শেভরন কর্তৃক মুচাই কম্প্রেসার চালুর সঙ্গে সঙ্গে পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে এমন পরিকল্পনা থেকেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ছাড়া একই সময়ে বাপেক্সের দুটি ক্ষেত্র থেকে আরও ২০ মিলিয়ন ঘনফুট জাতীয় গ্রিডে যোগ করার আশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, এ মুহূর্তে আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সংযোগ দেয়ার কথা ভাবছে না সরকার। তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়া ও শিল্প গ্রাহক কম থাকায় কেবলমাত্র রাজশাহীতে আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সংযোগ দেয়া হতে পারে। এদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিনিয়োগ বোর্ডের এক অনুষ্ঠানে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেছিলেন, মার্চ-এপ্রিল থেকে শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হবে। এদিকে, গ্যাসের কম উৎপাদনের অজুহাতে সংযোগ বন্ধ থাকলেও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে বলেও সূত্র জানায়।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর এ বিষয়ে বলেন, মার্চের ৩০ তারিখ শেভরনের মুচাই কম্প্রেসার উদ্বোধন করা হবে। এর আগে এই কম্প্রেসার পরীক্ষামূলকভাবে মার্চের মাঝামাঝি চালু করা হবে। মুচাই কম্প্রেসার চালু হলে সিলেট অঞ্চলে শেভরনের ফিল্ড থেকে প্রায় ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তাৎক্ষণিকভাবে পাব। এ ছাড়া আরও দুটি ক্ষেত্র থেকে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। তিনি আরও জানান, মধ্য এপ্রিল থেকে শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হবে। তবে আবাসিক গ্রাহকদের এখনই গ্যাস সংযোগ দেয়ার চিন্তা করা হচ্ছে না বলে তিনি জানান।

সিলেটের মুচাই কম্প্রেসার চালু হলে গ্যাসের চাপ বাড়বে। ফলে শেভরনের নিয়ন্ত্রণাধীন জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। এ ছাড়া মৌলভীবাজার গ্যাস ফিল্ডে শেভরন নতুন দুটি কূপ খনন করেছে। এই দুটি কূপ থেকে দৈনিক ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যাবে। মোট ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট মুচাই কম্প্রেসার চালুর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে। তাছাড়া বাপেক্সের নিয়ন্ত্রণাধীন নোয়াখালী সুন্দলপুর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহের পাইপ লাইন নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় এই ক্ষেত্র থেকে এপ্রিলের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যোগ হবে। একই সঙ্গে সালদা নদী গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রায় একই সময়ে অতিরিক্ত পাওয়া যাবে ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সবমিলিয়ে এপ্রিলের শেষ নাগাদ ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে।

পেট্রো বাংলার এক কর্মকর্তা আরও জানান, মে মাস নাগাদ সালদা নদী গ্যাস ক্ষেত্রে নতুন একটি অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ শেষ হবে। একইসঙ্গে কৈলাসটিলায় নতুন একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা শেষ হবে। এ ছাড়া কাপাসিয়ায় নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে শ্রকাইলে অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ। পাশাপাশি সুনেত্র গ্যাস ক্ষেত্রে অনুসন্ধান কূপ খননে রিগ নেয়া হবে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এ সবক’টি অনুসন্ধান কূপের কাজ করছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাপেক্স। এ সব অনুসন্ধান কূপে গ্যাস পেলে এক বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রে একমাত্র গ্যাস ক্ষেত্র সাঙ্গুতে অনুসন্ধান কূপ খনন করছে সান্তোস। সাউথ সাঙ্গুর এই কূপ থেকে মে মাস নাগাদ ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে সান্তোস। তবে পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাউথ সাঙ্গু থেকে ১৬ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস পাওয়া সম্ভব হবে না। ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক নতুন গ্রাহক এবং ২০১০ সালের জুলাই থেকে আবাসিক গ্রাহকদের নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ করে সরকার। ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গ্যাসের উৎপাদন দৈনিক ২২০ কোটি ঘনফুট না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোন গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে না। পরে শিল্প উদ্যোক্তাদের চাপে ২০১১ সালের ৩ জানুয়ারি শর্তসাপেক্ষে শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ চালু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রফতানিমুখী শিল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালে আগে গ্যাস সংযোগ দেয়ার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। ওইদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের এ সংক্রান্ত একটি নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি বেশ কিছু শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেয়ার বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে বলে জানা গেছে।

শুধু শিল্প কারখানা নয়, রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে হাজার হাজার নতুন বাড়ি নির্মাণ হয়েছে। গ্যাসের কারণে তা হস্তান্তর করা যাচ্ছে না। এ কারণে নির্মাণ শিল্পেই আটকে পড়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। ব্যবসায়ীদের একটি সূত্রে জানা গেছে, শিল্প কারখানার জন্য মেশিনারিজ এনে এখনও উৎপাদনে আসতে পারেনি এমন সাড়ে তিশ’ কারখানা রয়েছে। তিতাসে এসব কোম্পানির তালিকা রয়েছে। গ্যাসের অবস্থা খুবই খারাপ। বিদ্যুতের চেয়ে খারাপ অবস্থা হচ্ছে গ্যাসের। গ্যাসের কারণে অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ রয়েছে। অনেক কারখানা চালু করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নেই। ফলে অনেক শিল্প কারখানা বাধ্য হয়ে তাদের উৎপাদনের ক্ষমতা কমিয়ে এনেছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানও কমেছে। এ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলেও মিনিমাম চার্জ আদায় করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে দুই হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। আর চাহিদা রয়েছে আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এই অবস্থায় শিল্প-কারখানায় সীমিত আকারে সংযোগ দিলেও তাতে কতখানি লাভ হবে তা ভাববার বিষয়। তাছাড়া আবাসিক বাসা বাড়িতে গ্যাস সংযোগ না দেওয়ায় সেখানেও তৈরি হয়েছে এক নাজুক অবস্থা। বিশেষ করে যে সব বাড়িতে সংযোগ রয়েছে অথচ এক্সটেনশন করা দরকার, তাদের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া উচিত বলে অভিজ্ঞ মহলের মত।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...