প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসার ন্যূনতম সুব্যবস্থা নেই!

দি ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ দেশে মোট প্রবীণের সংখ্যা কত তার সঠিক হিসাব না পেলেও এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, দেশে প্রবীণ ব্যক্তির সংখ্যা এক কোটির বেশি। দুঃখের বিষয় এইসব প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোথাও পৃথক কোন হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসার ন্যূনতম সুব্যবস্থা নেই।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বার্ধক্যের কারণে প্রবীণরা সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্ন ধরনের রোগশোকে ভুগে থাকেন। ডায়াবেটিস, হূদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি, উচ্চরক্তচাপ, হাড়ের ক্ষয়রোগসহ একাধিক রোগে আক্রান্ত হন তারা। শারীরিক ছাড়াও তারা মানসিক রোগে ভোগেন। দেশে বিভিন্ন বয়সের রোগীদের সুচিকিৎসার জন্য বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বিশেষজ্ঞ, সাব-বিশেষজ্ঞ ও সুপার বিশেষজ্ঞ তৈরির উদ্যোগ থাকলেও প্রবীণদের সুচিকিৎসা দিতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জেরিয়েট্রিক ও মানসিক চিকিৎসক ও হাসপাতালে বিশেষায়িত ইউনিট (জেরিয়েট্রিক ইউনিট) রাখার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেই। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ উন্নত বিশ্বে প্রবীণদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ের হাসপাতালেই ‘জেরিয়েট্রিক মেডিসিন’ নামে পৃথক বিভাগ চালু রয়েছে। দুঃখের বিষয় প্রবীণদের সমস্যাগুলো স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারকদের অজানা না থাকলেও এদেশে এখনও সে ধরনের কোন পৃথক বিভাগ গড়ে ওঠেনি। প্রবীণদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীল হয়ে বেদনাদায়ক জীবনযাপন করতে হয়।

এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত তিন দশকে এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ১২ বছর ২ মাস বেড়েছে। ১৯৮১ সালে গড় আয়ু ৫৫ বছর ও ২০০০ সালে ৬১ বছর থাকলেও বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৬৭ বছর ২ মাস হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৬০ বা তদূর্ধ্ব মানুষ মোট জনসংখ্যার ৬ দশমিক ৮ ভাগ। গড় আয়ু বৃদ্ধি ইতিবাচক দিক হলেও প্রচলিত সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় চিকিৎসা গ্রহণ করার ফলে লাখ লাখ প্রবীণ মানুষ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
এমনই এক অবস্থার মধ্য দিয়ে আজ ৭ এপ্রিল বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ পালিত হবে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ‘প্রবীণদের যত্ন নিন, স্বাস্থ্যরক্ষায় এগিয়ে আসুন’।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আফম রুহুল হক বলেছেন, প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত দেশে সে ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রবীণদের বিষয়টি গুরত্ব দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য করেছে। আগামীতে এদেশেও প্রবীণদের জন্য বিশেষ চিকিৎসাসেবা চালু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একটি প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকার বাইরে সংঘের ৫২টি প্রবীণ নিবাস রয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগেও বেশ কয়েকটি প্রবীণ নিবাস পরিচালিত হচ্ছে। সরকারিভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রবীণদের পুনর্বাসনসহ স্বাস্থ্য পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে দাবি করা হলেও বাস্তবে তা নামকাওয়াস্তে রয়েছে।

জাতীয় স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন জাতীয় কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি প্রফেসর ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, শুনতে খারাপ শোনালেও বাস্তবতা হল সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত প্রবীণ নিবাসগুলো হল ‘প্রবীণদের এতিমখানা’। প্রবীণ নিবাসগুলোতে বার্ধক্যজনিত রোগব্যাধির চিকিৎসার জন্য যে ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চিকিৎসা সুবিধা থাকা প্রয়োজন তার কিছুই নেই।

উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ৩ হাজার ৮৪টি হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ৫৮৩টি ও বেসরকারি পর্যায়ে ২ হাজার ৫০১টি। সরকারি হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা ৩৯ হাজার ৬৩৯ ও বেসরকারি পর্যায়ে ৪২ হাজার ২৩৭টি শয্যাসহ মোট ৮১ হাজার ৮৭৬টি শয্যা রয়েছে। সরকারি ২২টি মেডিকেল, বেসরকারি ৫৩টি মেডিকেল কলেজ, ৬২ জেলা সদর হাসপাতাল, ৪১৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৫ হাজার ১৬৮টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টার ও স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। স্বাস্থ্য সেক্টরে জনসংখ্যা ও চিকিৎসকের অনুপাত ৩০১২ঃ১। জনসংখ্যা ও শয্যা সংখ্যার অনুপাত ২ হাজার ৬৬৫ঃ১, জনসংখ্যা ও নার্স ৬ হাজার ৩৪২ঃ১।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...