পুলিশ দম্পতি হত্যাকাণ্ড ॥ হত্যার সময় ঐশীকে তার মা বলেছিল, ‘তুই না আমার মেয়ে!’

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী খুনের ঘটনায় ঐশী তার জবানবন্দীতে বলেছে, তার মাকে যখন সে ছুরিকাঘাত করে তখন তার মা জেগে গিয়ে বলেছিল, ‘তুই না আমার মেয়ে!’

Oishi-006

পুলিশের কাছে ঐশী আরও দাবি করেছে, বুধবার রাতে তার দুই বয়ফ্রেন্ড প্রাইভেটকার নিয়ে তাদের বাসায় প্রবেশ করে। মধ্যরাত পর্যন্ত দুই বয়ফ্রেন্ড ভবনের ছাদ সংলগ্ন সিঁড়িতে লুকিয়ে থাকে। এদিকে সে বাসায় কফির সঙ্গে ১০টি ঘুমের ট্যাবলেট নাইট্যাচ মিশিয়ে দুই কাপ কফি তৈরি করে। এর এক কাপ মাকে, আরেক কাপ বাবাকে খাইয়ে অচেতন করে। পরে ছোট ভাই ঐহী ও কাজের মেয়ে সুমি ঘুমিয়ে পড়লে দুই বয়ফ্রেন্ডকে বাসার ভেতরে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। পরে রাত ২টার দিকে ঘুমন্ত পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে বাসায় রক্ষিত ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। ঐশী আরও দাবি করেছে, স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা লুট করে বাসা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু তার মা ঘুম থেকে জেগে ওঠায় হত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। ছুরি দিয়ে একটি আঘাত করার পরপরই মা বলেছিল, ‘তুই না আমার মেয়ে!’ এ কথা দু’বার বলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এরপর মেয়ের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতের পর নিস্তেজ হয়ে পড়েন। পরে তার পিতাকে একই কায়দায় হত্যা করে তারা। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ঐশী খুবই ধুরন্ধর। নিজে বাঁচার জন্য বিভিন্ন রকমের গল্প বানানোর চেষ্টা করছে। একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কাজের মেয়ে সুমি ও নিহত দম্পতির ছোট ছেলে ঐহী’র বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা বারবার বলেছে, আপু (ঐশী) ছাড়া ওই রাতে তারা আর কাওকে দেখেনি।

এদিকে পুলিশ বলেছে এই খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত ছুরি ও বঁটিতে একই হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। অপরদিকে গতকালও রিমান্ডে থাকা পুলিশ দম্পতির মেয়ে ঐশীকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্তকারী একটি সূত্র জানিয়েছে, ঐশী বাবা-মাকে হত্যার পর তাদের লাশ কেটে টুকরো করতে চেয়েছিল। লাশ বস্তায় ভরে লুকানোরও চেষ্টা চালায় সে। তবে তা সম্ভব হয়নি। রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন গতকাল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার পাশাপাশি আরও দুই বয়ফ্রেন্ড জড়িত বলে দাবি করেছে। তবে এমন দাবির সত্যতা খুঁজে পাননি তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা। এক এক সময় ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দেওয়ার কারণে ঐশীর বক্তব্যকে পুলিশ পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও বঁটিতে একই ব্যক্তির হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। ওই ছাপ শনাক্তের পর খুনির পরিচয় জানা যাবে। গোয়েন্দারা জানান, ঐশী তার আগের বক্তব্য থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার চেষ্টা করছে। জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছে, হত্যাকাণ্ডের রাতে তার দুই বয়ফ্রেন্ড বাসায় ছিল। তাদের সঙ্গে নিয়েই পুলিশ দম্পতির হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ বিষয়ে ডিএমপি’র জয়েন্ট কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত হিসেবে এখন পর্যন্ত ঐশীর সংশ্লিষ্টতাই পাওয়া গেছে। বাকি তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

মোবাইল ফোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে গোয়েন্দারা ঘটনাস্থলে ঐশীর কোন ঘনিষ্ঠজনের তথ্য খুঁজে পায়নি। তবে খুনের পর ঐশী যাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে তাদের সবাইকে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য না পাওয়ায় অনেককেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সূত্রমতে, ঐশীর ঘনিষ্ঠ আরও দুই বয়ফ্রেন্ড সাইদুল ও জনিকে গ্রেফতার করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তাদের গ্রেফতার করতে পারলে এই খুনের রহস্য পুরোপুরি উদঘাটন হবে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে চামেলীবাগের বাসার সিকিউরিটি গার্ড শাহীন বলেছেন, বুধবার রাতে কোন অপরিচিত গাড়ি তাদের বাসায় প্রবেশ করেনি। কিংবা বৃহস্পতিবার সকালে বের হয়ে যায়নি।

বয়স নিরূপণে দাঁত পরীক্ষা

বয়স নিয়ে বিতর্কের ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থা ঐশীর দাঁত পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পিতা-মাতার খুনি সন্দেহে ঐশীকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। এরপরই বিভিন্ন মহলে তার বয়স নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ঐশীর চাচা রুবেল বলেন, ১৯৯৫ সালে খুলনায় ঐশীর জন্ম হয়েছে। তাতে অপরাধ সংগঠনকালীন ঐশীর বয়স ১৮ পার হয়েছে। ঐশীর বিদ্যালয় অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ভর্তি ফর্মে জন্মতারিখ লেখা হয়েছে ১৭ই আগস্ট, ১৯৯৬। আর পুলিশ দাবি করেছে, ঐশীর বয়স ২০-এর কম হবে না। স্কুলে ভর্তির সময় বাবা-মা বয়স কমিয়ে ভর্তি করিয়েছে। তাই বয়স নিয়ে বিতর্কের অবসান করতে পরীক্ষাগারে ঐশীর দাঁত পরীক্ষা করে প্রকৃত বয়স নিরূপণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ডিএমডি’র জয়েন্ট কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে হত্যাকাণ্ডে মেয়েটির সরাসরি জড়িত হওয়ার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ কি- তা এখনও পুলিশ উদ্ঘাটন করতে না পারলেও ঐশী মাদকাসক্ত ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শহীদুল্লাহ প্রধান বলেন, পুলিশের কাছে ধরা দেয়ার পর ঐশী নিজেই তার বয়স ১৮-১৯ বছর বলে জানিয়েছিল। পরে বয়স কম ও একাধিক খুনি জড়িত থাকলে তার কম শাস্তি হওয়ার তথ্য জানতে পেরেই বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করছে। এখন ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমেই তার প্রকৃত বয়স জানা যাবে।

পিয়ন ও বস্তির অশিক্ষীত ছেলেরা ঐশীর বয়ফ্রেন্ড!

নিহত পুলিশ দম্পতির মেয়ে ঐশী’র বয়ফ্রেন্ডের তালিকায় বখাটেরাই বেশি। ঐশী অক্সফোর্ডের মতো ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী হলেও বয়ফ্রেন্ড হিসেবে ডিজে ও ড্যান্স পার্টির ছেলেদের বেছে নিয়েছিল। এদের মধ্যে পুরান ঢাকার বখে যাওয়া অল্পশিক্ষিত যুবকরাই বেশি। তাদের সঙ্গদোষে অনিয়ন্ত্রিত প্রেম ও মাদকের নেশায় ডুব দিয়েছিল সে। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে ঐশী স্বীকার করেছে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বৃত্তান্ত না জেনেই ঐশী অসংখ্য যুবকের ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়ে পড়ে। সূত্রমতে, ঐশীর বয়ফ্রেন্ড পারভেজ রাজধানীর একটি স্কুলের পিয়ন। যদিও পারভেজ নিজের কেনা গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর আশ্বাস দিয়েছিল ঐশীকে। আরেক বয়ফ্রেন্ড মিজানুর রহমান রনি বস্তির পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। লেখাপড়া বাদ দিয়ে বিভিন্ন পার্টিতে ড্যান্স করে বেড়ায় সে। ঐশীকে দুবাই নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। জনি ও সাইদুল ইয়াবার নেশায় বুঁদ বানিয়ে রঙিন দুনিয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এর বাইরে আরও ৭ জন যুবকের সঙ্গে ঐশীর বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। যারা সবাই ঐশীর বয়সের তুলনায় অনেক বড়। তাদের ধরতে গোয়েন্দা পুলিশ রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়েছে।

বাসা থেকে পালানোর ঘটনা

পিতা-মাতাকে হত্যার মাস খানেক আগেও বাসা থেকে পালিয়েছিল ঐশী। রাত যাপন করেছিল এক বয়ফ্রেন্ডের বাসায়। পরের দিন তার বাবা ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান বিভিন্ন জায়গায় অনুসন্ধান চালিয়ে মেয়ের অবস্থান শনাক্ত করেন। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাসায় নিয়ে যান। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত মেয়েকে হঠাৎ করেই বাসায় বন্দি করে রেখেছিলেন বাবা-মা। বাইরের পরিচিত বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে সকল ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। এতে ঐশী’র সঙ্গে বাবা-মার মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। ঐশী পিতা-মাতাকেই তার জীবনের প্রধান শত্রু বলে মনে করতে থাকে। বাসা থেকে পালানোর পাশাপাশি একাধিকবার আত্মহত্যারও চেষ্টা চালায় সে। শেষ পর্যন্ত নিজের পিতা-মাতাকেই হত্যা করে মুক্তির পথ খুঁজেছিল মা-বাবার বখে যাওয়া মেয়ে ঐশী।

হত্যার পরও অনুশোচনা নেই

ঐশীর বর্বরতা ও এর কারণ জানতে চেয়ে গোয়েন্দা পুলিশের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের মুখে বলেছে, আসলে তখন বুঝতে পারিনি। মাথা ঠিকমতো কাজ করেনি। ধরা পড়ে যাবো, মনেও হয়নি। পরে বন্ধু-বান্ধব ও গণমাধ্যমে আমার সম্পৃক্ততার তথ্য প্রকাশ হওয়ায় বাধ্য হয়ে আত্মসমর্পণ করেছি। গোয়েন্দারা জানান, পিতা-মাতার জন্য তার মধ্যে মোটেই অনুশোচনা নেই। একেবারেই নির্বিকার। উল্টো বাবা-মার খারাপ দিকগুলো প্রকাশ করে হত্যাকাণ্ডের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে তারমধ্যে।

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় ঢাকার চামেলীবাগের ফ্ল্যাট থেকে এসবি’র ইন্সপেক্টর মাহফুজ ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দুই সন্তান ঐশী ও ঐহী এবং গৃহকর্মী সুমিকে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন তারা। বাবা-মার লাশ উদ্ধারের পরদিন পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে ঐশী। এরপর তার দেয়া তথ্য মতে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ঐশীর এক বন্ধুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। রোববার ঐশী, তার বন্ধু ও বাসার পরিচারিকা খাদিজা খাতুন সুমিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...