ভেজাল কীটনাশকে বাজার সয়লাব ॥ বোরো মৌসুমে কৃষকদের বিঘা প্রতি ৯শ’ টাকা লোকসান গুনতে হবে!

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ এবারের বোরো মৌসুমে কৃষকদের লোকসান গুনতে হবে বলে মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা জানিয়েছেন। শ্রমিক স্বল্পতা, বীজের দুষ্পাপ্যতা, ভেজাল কীটনাশকের কারণে উৎপাদন ব্যাপক আকারে হ্রাস পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে কৃষকরা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

প্রতি কেজি টিএসপির সরকারি দাম ২২ টাকা হলেও প্রায় ৩০ টাকা কেজি দামে কৃষককে কিনতে হচ্ছে। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃষকরা নানাভাবে লোকসান দিতে দিতে তারা উৎপাদনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এখন যাদের জমি আছে তারা নিজেরা চাষ না করে বর্গা দিয়ে দিচ্ছেন। আবার যারা নিজেদের জমি চাষ করছেন তারাও লোকসানের ভয়ে শুধু নিজের মেটানোর জন্য খাদ্যশস্য উৎপাদন করছেন।

ধান উৎপাদনে খরচ

ঈশ্বরদী কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে পাওয়া প্রতি বিঘা ধান চাষের খরচের হিসাব নিম্নে দেওয়া হলোঃ

বীজ প্রতি কেজি ৪০ টাকা হিসেবে সাড়ে ৪ কেজির দাম ১৮০ টাকা
ইউরিয়া প্রতি কেজি ২০ টাকা হিসেবে ২৯ কেজির দাম ২০ টাকা
টিএসপি প্রতি কেজি ৩০ টাকা হিসেবে ২৪ কেজির দাম ৭২০ টাকা
এমওপি প্রতি কেজি ১৬ টাকা হিসেবে সাড়ে ১৩ কেজির দাম ২০৮ টাকা
জিংক সালফেট প্রতি কেজির দাম ১৫০ টাকা হিসেবে দেড় কেজির দাম ২২৫ টাকা
জিপসাম ১০ টাকা কেজি হিসেবে ১৫ কেজির দাম ১৫০ টাকা
কীটনাশক দেওয়া লাগবে ২ অথবা ৩ বার সেই হিসেবে দাম পড়বে ৩,০০০ টাকা
এছাড়াও বীজতলা তৈরিতে শ্রমিক লাগবে প্রতি বিঘাতে ৮০০ টাকা
চারা রোপণে প্রতি বিঘায় খরচ হবে ১,০০০ টাকা
পরে নিড়ানোর জন্য শ্রমিক লাগবে ৩ বার, ২৫০ হিসেবে ১২ জনের ৩,০০০ টাকা
এছাড়াও যদি কেও লিজ নিয়ে জমি চাষাবাদ করে তাহলে
তাকে লিজ বাবদ প্রতি বিঘায় এক সিজেনে দিতে হবে আড়াই থেকে ৩,০০০ টাকা
মোট ঃ ৯,৩০৩ টাকা

কর্তন ও মাড়াই

সেচ খরচ ধানের এক চতুথাংশ বহন করতে হয়। কর্তন ও মাড়াইয়ে ২০ মন ধানের আড়াই থেকে ৩ মন কর্তন ও মাড়াই খরচ হয়। এ হিসেবে বিঘা প্রতি কৃষক পায় ১২ থেকে ১৪ মন ধান। তবে যে সব স্থানে সরকারি গভীর নলকূপ আছে সেখানে সেচ খরচ কিছুটা কম হয়। সেখানে প্রতি বিঘায় খরচ হয় ১ হাজার টাকা। সেই হিসেবে ১৪ মন ধানের দাম ৬০০ টাকা মন হিসেবে ৮,৪০০ টাকা। এখানে দেখা যাচ্ছে একজন কৃষককে বিঘা প্রতি ৯০৩ টাকা করে লোকসান দিতে হবে।

ঈশ্বরদীতে জমি আছে এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হয়। ওই এলাকার একজন হোমিও প্যাথি ডাক্তার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, বর্তমান সিজেনে অর্থাৎ এই বোরো মৌসুমে তাকে বিঘা প্রতি দেড় দুই হাজার টাকা লোকসান দিতে হবে। তিনি জানান, বর্তমানে চাষাবাদের বড় সমস্যা হলো শ্রমিক সমস্যা। টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায় না। তাছাড়া সারের দাম সরকার নির্ধারণ করে দিলেও অনেক বেশি দামে তা কিনতে হচ্ছে। এছাড়াও বাজারে যেসব সার ও কীটনাশক পাওয়া যায় সেগুলোও ভেজালের কারণে ব্যবহার করেও কোন ফল পাওয়া যায় না অর্থাৎ আশানুরূপ উৎপাদন হচ্ছে না। যে কারণে কৃষকরা লোকসান গুনছেন। ডাঃ আনোয়ারুল ইসলাম আরও জানান, যে সব কোম্পানীর অনুমোদন নাই, সেসব কোম্পানীর ভেজাল বা নিম্নমানের কীটনাশক অনেক অশিক্ষিত কৃষকরা ব্যবহার করছে। যে কারণে তাদের ফসলে রোগ-বালাই লেগেই থাকে। চোরাই পথে আসা ভারতীয় এসএসপি (সিঙ্গেল সুপার ফসফেট) সারকে টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) হিসেবে কতিপয় ব্যবসায়ীরা দেদারসে বিক্রি করছে। ডাঃ আনোয়ারুল ইসলাম আরও বলেন, মানুষ যখন বেইমানী ও মুনাফেকী করছেন তখন প্রকৃতির কাছেও কৃষকরা অনেক সময় লাঞ্চিত হচ্ছেন। কারণ এতো টাকা-পয়সা খরচ করে যখন ফসল ঘরে তোলার সময় হয় তখন শিলা বৃষ্টি, কাল বৈশাখী বা নানা দুর্যোগের কারণে কৃষকরা অনেক সময় ফসল ঘরে তুলতে পারেন না। তখন তার কি অবস্থা হয় একবার ভাবুন। তিনি বলেন, সরকার মুখে কৃষকদের কথা বললেও বাস্তবে কতখানি এর প্রতিফলন ঘটে তা ভাববার বিষয়।

আমরা আশা করি সরকারের কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকবে। আজ কৃষকরা যদি নিগৃহিত হয় এবং তারা যদি উৎপাদনে অনীহা প্রকাশ করে তাহলে দেশে খাদ্য উৎপাদন বাধাগ্রস্থ হবে। আশা করি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কৃষকদের সমস্যা সমাধান করে কৃষি উৎপাদনকে তরান্বিত করবেন।

Advertisements
Loading...