আইএমএফের ঋণ ॥ কঠিন শর্তের এই ঋণ অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়াবে

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ বাংলাদেশকে বেশির ভাগ সময় আইএমএফের ঋণের উপর নির্ভর করতে হয়। আর তখন আইএমএফ নানা ধরণের শর্তারোপ করে থাকে। তারপরও সেই শর্ত মেনে নিয়েই ঋণ নিতে হয়। এই সংস্থাটি সব সময় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ সুবিধা দিয়ে আসছে। কিন্তু সেই সাহায্য সব সময়ই শর্তের মধ্যে থাকে। তবে সেই শর্তও যখন লাগামহীন অবস্থায় যায় তখন হয়ে পড়ে সমস্যা। এমনই এক কঠিন শর্তের মধ্যে পড়েছে এবার বাংলাদেশ সরকার। অবস্থা বেগতিক দেখে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠিন শর্ত মেনে ১০০ কোটি ডলার ঋণ না নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। তারা মনে করছেন, শর্তযুক্ত এ ঋণ দেশের মানুষের কোন উপকারে আসবে না, বরং বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝা আরও বাড়বে। সমাজে ধনী-গরিবের বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়বে। ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে নাগরিক সংহতি ও সিএসআরএল আয়োজিত ‘আইএমএফের ঋণ, শর্ত : অর্থনীতিতে প্রভাব’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। নাগরিক সংহতি সভাপতি ড. এএসএম আতীকুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ এমএম আকাশ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমাতুল্লাহ, সমাজবিজ্ঞানী পিয়াস করিম, নাগরিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান শরিফ, গবেষক মনোয়ার মোস্তফা প্রমুখ।
সভায় জানানো হয়, বতর্মানে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথার ওপর প্রায় ১১ হাজার টাকার বৈদেশিক ঋণের বোঝা চেপে রয়েছে। আইএমএফ থেকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ নিলে মাথাপিছু ঋণ আরও বাড়বে। এছাড়া আইএমএফের ১০০ কোটি ডলার ঋণ পেতে যে ১৭টি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে তার অধিকাংশই বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকারক। সরকার ইতিমধ্যে শর্ত পূরণে উঠেপড়ে লেগেছে। সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম দু’বার বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ানো হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সুদ রেপো ও রিভার্স রেপোর সুদ হার বৃদ্ধি করা হয়েছে, ব্যাংক ঋণের সুদ হারের উচ্চসীমা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ব্যাংক ঋণের সুদ হারের সীমা প্রত্যাহার করায় শিল্পখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ার কারণে প্রত্যক্ষভাবে কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। এর ফলে শিল্প-উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। সব কিছুর ফল গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য, যাতায়াত খরচসহ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
এমএম আকাশ বলেন, দেশের ক্ষতি হয় এমন শর্তে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার দরকার আছে কি-না তা আবার ভেবে দেখতে হবে। তিনি বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে ব্যাংকিং খাত বেসরকারি মালিকানায় দিয়ে, সুদের হারের উচ্চসীমা তুলে দিয়ে, পাটকলগুলো বন্ধ করে ও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ কমিয়ে ১০০ কোটি ডলার নেয়া ঠিক হবে না।
বিডি রহমাতুল্লাহ বলেন, আরও লুটপাট ও কমিশন বাণিজ্য করার জন্য আইএমএফের ঋণ নেয়া হচ্ছে। এ ঋণ দেশের কোন উপকারে আসবে না। তিনি মনে করেন, আমাদের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সরকার আমাদের গরিব করে রেখেছে। তিনি একটি পরিস্যংখান উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের বার্ষিক আয় ২ লাখ কোটি টাকা। এ হিসেবে আইএমএফের কাছ থেকে কোন ঋণ নেয়ার প্রয়োজন নেই।
পিয়াস করিম বলেন, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র দরকার। এজন্য রাষ্ট্রের স্বার্থে সবাইকে এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে।
মনোয়ার মোস্তফা বলেন, আইএমএফের ঋণ নিলে অর্থনীতিতে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। কারণ তারা যতগুলো শর্তারোপ করেছে তার অধিকাংশই বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য আইএমএফের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক জাগরণের মাধ্যমে রুখে দাঁড়াতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আইএমএফের এই ঋণের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সকলকে এক হয়ে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানান।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...