চিত্র-বিচিত্র: কয়েকটি আগুন-পাহাড়ের কাহিনী

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ অনেক ধরনের পাহাড় আমরা দেখেছি। কিন্তু আগুন বের হয় এমন পাহাড় আমরা কখনও দেখিনি। এমন কয়েকটি আগুন পাহাড়ের কাহিনী আজ তুলে ধরা হবে।

stromboli

ইতালির দক্ষিণে বড়সড় একটা দ্বীপ সিসিলি। তার পাশেই ছোট ছোট কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে এওলিয়ান দ্বীপপুঞ্জ। সাধারণ মাপের মানচিত্রে এগুলো চোখেই পড়ে না। এওলীয় দ্বীপগুলো প্রায় সবই আগ্নেয়গিরি, তার মধ্যে কয়েকটি রীতিমতো জাগ্রত। ক্যাটানিয়া বিমানবন্দর থেকে মাউন্ট এট্‌না দেখেই পর্যটকরা বুঝতে পারেন আগ্নেয়গিরির দেশে এসে পড়েছেন। প্রচণ্ড গরমেও তার চূড়ার কাছে বরফ জমে আছে। একটা শঙ্কু আকৃতির পাহাড়কে ঘিরে আছে এওলীয় দ্বীপগুলো। অনেক দ্বীপ এত ছোট যে, মনে হয় শুধু পাহাড়টাই সমুদ্রের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের চূড়ার কাছে গলগল করে সাদা ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

বিখ্যাত চারটি দ্বীপ- লিপারি, প্যানেরিয়া, ভলকানো ও স্ট্রম্বোলি। এখানকার ফেরিবোট হল হাইড্রোফয়েল। গতি বাড়লে জলের একটু ওপর দিয়ে যায়। লিপারি দ্বীপের কালো বালির সমুদ্রতট আগ্নেয়গিরির ছাই দিয়ে তৈরি। জলে পা দিলে মনে হবে পা কেটে যাচ্ছে, এত ঠাণ্ডা। সরু, অল্প খাড়াই গলি দিয়ে উঠে গেলে পাওয়া যাবে পর্যটকদের থাকার জন্য হোটেল। বারান্দা থেকে ঘন নীল টিরেনাইন সাগর দেখা যায়। ঘরের নিচে ত্রিশূল হাতে রোমান সমুদ্র দেবতা নেপচুনের মূর্তি।

ভলকানো দ্বীপ

রোমান পুরাণ মতে অগ্নিদেবতা ভলকানের কামারশালার চুল্লি হল ভলকানো পাহাড়। ভলকানো থেকে শেষ আগুন ১৮৮৮-১৮৯০ পর্যন্ত একটানা জ্বলেছিল। এর প্রধান জ্বালামুখ ‘লা ফাসা’, তার কিনারা সমুদ্রতল থেকে ৫০০ মিটার উঁচু। শান্ত ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি যে কখন জেগে উঠবে বিজ্ঞানীরা সঠিকভাবে বলতে পারছেন না। এখানে মাউন্ট এট্‌নায় অনেক বাড়িঘর আছে। বহুযুগ ধরে বিপদের ঝুঁকি নিয়েও মানুষ এসব দ্বীপে বসবাস করছেন। এখানকার উর্বর মাটিতে আঙ্গুরের চাষ করছেন। মৎস্যজীবীরা ঘরবাড়ি করে সমুদ্রে মাছ ধরছেন। এখানকার খনিজসম্পদ তুলে ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা চলছে। জ্বালামুখ দেখতে পর্যটকরা উপরের দিকে যখন উঠতে থাকেন- দু’পাশে করবী ফুলে ছাওয়া পথ, তারপর ক্রমশ বুনো ফুল, ঝোপঝাড়। একটু পরে শুধু কাঁকর আর ধুলো ঢাকা পথ। যত উপরে ওঠা যায় দূরের দৃশ্য তত আশ্চর্য সুন্দর হয়ে ওঠে। এক সময় দেখা যায় আশপাশের মাটির ভেতর থেকে সাদা ধোঁয়ার মতো বাষ্প বেরিয়ে আসছে। তখন উত্তেজনায় গায়ে কাঁটা দেয়। মনে হয়, সত্যিই তাহলে আগ্নেয়গিরির ওপর চড়ছি ডান দিকে গোল জ্বালামুখ লা ফসার ভেতর থেকে বারুদের গন্ধমাখা ধোঁয়া বেরোচ্ছে। জায়গায়-জায়গায় মাটির ওপর হলুদ রঙের গন্ধকের গুঁড়া জমে আছে। উল্টো দিকে চোখ জুড়ানো দৃশ্য। নিচে বহুদূরে নীল সমুদ্রে জেগে আছে এওলীয় দ্বীপগুলো। পালতোলা নৌকোগুলোকে দেখায় অসংখ্য সাদা ফুটকির মতো। দেখতে আশ্চর্য লাগে।

স্ট্রম্বোলি দ্বীপ

এরপর দেখা যায় স্ট্রম্বোলির প্রাকৃতিক আতশবাজি। স্ট্রম্বোলি দ্বীপ একটু দূরে প্যানেরিয়া ছাড়িয়ে। স্ট্রম্বোলিকে বলা হয় ‘এওলিয়ান দ্বীপের বাতিঘর’। এ আগ্নেয়গিরি আরও আশ্চর্যের। দু’হাজার বছর ধরে এখানে অগ্ন্যুৎপাত হয়ে চলেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই উৎসুক ভ্রমণকারীরা স্ট্রম্বোলির কাছাকাছি সমুদ্রে নৌকো নোঙর করে এ অবাক করা দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় থাকেন। ১৫-২০ মিনিট বা আধঘণ্টা পরপর পাহাড়ের মাথায় জ্বলন্ত পাথরের টুকরো ছিটকে ছড়িয়ে পড়ে। যেন কেউ পরপর বড় তুবড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

রোজ সন্ধ্যাবেলা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ‘ইভনিং শো’ হয়। সত্যিই শুরু হয় ভলকান দেবতার আতশাবাজি। এ স্ট্রম্বোলিয়ান অ্যাক্টিভিটি কিন্তু সব সময় এতটা সুনিয়ন্ত্রিত থাকে না। কখনও কখনও বিপজ্জনকভাবে বেড়ে ওঠে। এখানে রয়েছে পামিস পাথরের খনি। পামিস হল অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত ঝামা ধরনের পাথর। পামিসের ছিদ্রগুলো পাথর দিয়ে জোড়া। আগ্নেয়গিরিতেই এর উৎপত্তি। যে পাথরে পামিস তৈরি, সেই একই রাসায়নিক উপাদান সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারা নিয়েছে লিপারি দ্বীপের অন্য প্রান্তে। লিপারি দ্বীপে প্রকৃতির নিজস্ব কারখানায় আগ্নেয়গিরির চুল্লিতে তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক কাচ ‘অবসিডিয়ান’। হৃদযন্ত্রের সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারের সময়ে শল্যচিকিৎসকরা অবসিডিয়ান দিয়ে তৈরি ছুরিই ব্যবহার করেন। ঠিক অনেকটা সেরকম। তবে যাই হোক এসব আগ্নেয়গিরির কিন্তু কাছে যাওয়া চেষ্টা না করাই ভালো। তবে নিরাপদ দূর থেকে এগুলো দেখা ভাগ্যের ব্যাপার। তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...