বাজারে নতুন নোট আসার সঙ্গে সঙ্গেই জাল নোটের ছড়াছড়ি ॥ টাকা ছাপানোর কার্যক্রমের সঙ্গে সিন্ডিকেট জড়িত

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ বড় কোন টাকা যেমন ৫০০ বা ১০০০ টাকার নোট বের হলেই তার জাল হওয়া শুরু করে এটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমপ্রতি নতুন টাকার বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর জাল বের হওয়া শুরু করেছে। বিশেষ করে সমপ্রতি বের হওয়া ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোটগুলো বেশি জাল হচ্ছে বলে জানা গেছে। আর এই জাল নোটের সঙ্গে জড়িত রয়েছে দেশের একটি সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠেছে এই সিন্ডিকেট এতই প্রসার ঘটিয়েছে যে শুধু বাইরে নয়, স্বয়ং শক্তিশালী ওই সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে দেশের ‘নতুন মুদ্রা ছাপানো’ কার্যক্রম। ওই সিন্ডিকেটের কূটকৌশলে একের পর এক নিম্নমানের নোট ছাপা হচ্ছে। ব্যবহার হচ্ছে নিম্নমানের কাগজ। এতে প্রয়োজনের তুলনায় সুতার পরিমাণ কম। পলিমার বেশি। এ ছাড়াও টেন্ডার শর্তের বাইরে সেলুলার ফাইবার ব্যবহার করা হচ্ছে। আর উদ্বেগজনক হল, নোটের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী ‘সিকিউরিটি প্রিন্ট’টি প্রায় ৪০ বছর আগের প্রযুক্তির। যে কারণে সহজেই এ নোট জাল হচ্ছে। এর ফলে একদিকে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে সরকার এবং সাধারণ জনগণ আর্থিকভাবে প্রতারিত হচ্ছে। কারণ সাধারণ মানুষ এখন বুঝতেই পারছে না কোনটি জাল আর কোনটি আসল! যে কারণে সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমনকি খোদ ব্যাংকগুলোও নতুন নোট নেয়ার সময়ে বাণ্ডিলের ওপর গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট নম্বর লিখে রাখছে!
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে, এই দুর্বল নোট ছাপানোর সিন্ডিকেটে জড়িত বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি), অর্থ মন্ত্রণালয়, সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস এবং একশ্রেণীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। টাকা ছাপানোর কাগজ সংগ্রহে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিয়ম মানা হচ্ছে না। নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতেই আরোপ করা হচ্ছে নানা অনৈতিক শর্ত। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে। বাজারে জাল নোটের ছড়াছড়ি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টাকা ছাপানোর প্রক্রিয়ায় কোন অনিয়ম থাকলে তা দুঃখজনক। এ ব্যাপারে সরকারকে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি বাজারে নতুন নোট ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ বাজারে আসা এসব নতুন নোটের মধ্যে রয়েছে, ১০০০, ৫০০, ১০০, ৫ ও ২ টাকা। এগুলোর সব নোটেই বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত। প্রথম তিনটি নোট দেখতে প্রায় একই রঙের। আর প্রত্যেকটিরই নিরাপত্তা সুতা (হলোগ্রাফিক ফিচার) ও জলছাপ (ওয়াটার মার্ক) একই ধরনের। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর ১১ আগস্ট প্রথম যখন বাজারে নতুন নোট আসে, তখন এর ৪/৫ দিনের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জাল নোট ধরা পড়ে। এরপর এক এক করে এত পরিমাণে জাল নোট ধরা পড়ে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নোট নিয়ে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনও ঘটনা ঘটেছে যে, কেনাকাটার পর কেও কোথাও নতুন নোট দিলে অতি পরিচিত জন ছাড়া অন্যের নোট নিতে চায় না। আর পরিচিতজনের কাছ থেকে নোট দিলেও অনেকেই তাতে সংশ্লিষ্টের নাম লিখিয়ে নিয়েছে, যাতে নোটটি জাল হলে পরে বাহককে ধরা যায়। এমনকি ব্যাংকগুলোও টাকা নেয়ার সময় বান্ডিলের ওপর গ্রাহকের একাউন্ট নম্বর লিখে রাখছে।
এ দিকে কোটি কোটি টাকার জাল নোট উদ্ধারের ওই নেপথ্য ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায় চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। নতুন যেসব নোট বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে, তার কাগজ ও নিরাপত্তা সুতা অতি পুরনো প্রযুক্তির। ‘ওয়াটার মার্ক’ অতি পুরনো। বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশেষ করে নতুন নোটে যে নিরাপত্তা সুতা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটির নাম ‘হলোগ্রাফিক্স ফিচার’ যুক্তরাজ্যের চিন্তাবিদ ডেনিস গাবের এটি ১৯৭১ সালে আবিষ্কার করেন। এর জন্য তিনি ওই বছর নোবেল পুরস্কারও লাভ করেন। সেই থেকে এই টেকনোলজিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রথমে মুদ্রায় পরে বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহূত হচ্ছে। তবে যখন পণ্যের নিরাপত্তায় ব্যবহূত হচ্ছে, তখন থেকে উন্নত দেশগুলো এটি মুদ্রায় ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। কিন্তু এর পরিবর্তে নতুন নানা প্রযুক্তি মুদ্রার নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যবহূত হচ্ছে। ওইসব প্রযুক্তির মধ্যে ‘কালার শিফটিং’, ‘ডাবল কালার শিফটিং’, ‘কালার ব্যান্ড’, ‘মেশিন রিডেবল ম্যাগনেটিক কোড’ ইত্যাদি রয়েছে। জলছাপের ক্ষেত্রে দুই বা ততোধিক জলছাপের সমন্বয় এবং মেশিন রিডেবল জলছাপ ইত্যাদিও থাকে। এগুলো নোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ‘স্মার্ট ফোন’ দ্বারাও এসব নোটের ভেতরের সাংকেতিক চিহ্ন শনাক্ত করা যায়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন নোট প্রচলনের ক্ষেত্রে সব ধরনের মুদ্রার মোট ২৩শ’ মিলিয়ন পিসের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসকে। এর মধ্যে ২ টাকার ৫শ’, ৫ টাকার ২শ’, ১০ টাকার ৪শ’, ২০ টাকার ২শ’, ৫০ টাকার ১শ’, ১০০ টাকার ৪শ’, ৫০০ টাকার ৩শ’ ও ১ হাজার টাকার ২শ’ মিলিয়ন পিস রয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এর মধ্যে ইতিমধ্যে ২, ৫, ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার যথাক্রমে ১০০.৮০, ১১৬.৬০, ২৩.৫০, ৬৯.২৫, ৫২.৮৫ মিলিয়ন পিস বাজারে ছাড়া হয়েছে। ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট বাদে বাকি নোটের ক্ষেত্রে আরও মোট ২২২.৬০ মিলিয়ন পিস বাংলাদেশ ব্যাংকে সরবরাহের অপেক্ষায় মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ওই ৫টি নোটের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১৬২.২০, ২৩.৪০, ২১.৫০, ৯.২৫ ও ৬.২৫ মিলিয়ন পিস রয়েছে।
সূত্র জানায়, এই নোটের ক্ষেত্রে কাগজের টেন্ডারে শর্ত ছিল, ১০ ভাগ পলিমার এবং ৯০ ভাগ সুতা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্য ৫ ভাগ কমবেশি হতে পারে। কিন্তু সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের ল্যাবরেটরি এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ২০ ভাগ পলিমার আর ৬০ ভাগ সুতা ও ২০ ভাগ সেলুলার ফাইবার দেয়া হয়েছে। আর এ কারণে নোটের মানও নেমে গেছে।
বিভিন্ন ব্যাংকে সরেজমিন দেখা গেছে, আগের নোটের বান্ডিলে সুতো দিয়ে সেলাই বা পিনআপ করা হলেও নতুন নোটের নিম্নমানের কারণে ছিঁড়ে যাওয়ার আশংকায় এখন তা করা হয় না। তা ছাড়া বেশি পরিমাণে পলিমার ব্যবহার করায় তা পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর হয়েছে। অথচ বিশ্বজুড়ে নোটের কাগজের ক্ষেত্রে ১০০ ভাগই সুতা ব্যবহার দেখা যায়।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হল, বিষয়টি ধরার পর সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন বিষয়টি এক দাফতরিক নোটে অবহিত করে একই নোটে কাগজ সরবরাহকারীদের টেন্ডার বাবদ প্রাপ্ত বিলের সর্বশেষ অংশ পরিশোধের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সেই বিল পরিশোধ না করে নোটটি ফেরত পাঠিয়েছে।
সূত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নোটে যেখানে ‘সর্বশেষ প্রযুক্তি’ ব্যবহার করা হয়, বাংলাদেশের নতুন নোটে সেখানে ৪০ বছর আগের প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে। নতুন ব্যাংক নোটের ‘ওয়াটার প্রিন্ট’ আর ‘নিরাপত্তা সুতা’ অতি পুরনো প্রযুক্তির এবং নিম্নমানের। ফলে প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করতে পারছে জালকারীরা। কেননা এটা অতি পুরনো হওয়ায় সবই জালকারীদের আয়ত্তে, যা জালকারীরা খুব সহজেই জাল করতে সক্ষম হচ্ছে। ব্যাংক নোট প্রস্তুতের সময় যেসব সিকিউরিটি পেপার এর মধ্যে থাকা উচিত, তা বিদ্যমান নেই। বর্তমানে টাকায় যে ফিচার ব্যবহূত হচ্ছে, তা একই সময়ে বিভিন্ন কসমেটিক্স ও কোমলপানীয় কোম্পানি ব্যবহার করে পণ্যের হলোগ্রাফিক সিকিউরিটি হিসেবে। ফলে ব্যাংক নোটের সিকিউরিটি নকল করা সহজ হচ্ছে, যা তারা স্থানীয় বাজার থেকেও সহজেই সংগ্রহ করতে পারছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্বল ও অনেক আগের টেকনোলজি হওয়ায় বিষয়টি জালকারীদের নখদর্পণে। ওদিকে আগের নোটের সিকিউরিটি সুতায় ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ এমনভাবে লেখা থাকত যে, তা স্বচ্ছভাবে প্রতীয়মান হতো। কিন্তু নতুন নোটে সেরকম নেই। পণ্যের নিরাপত্তা-হলোগ্রামের সঙ্গে এর তেমন তফাৎ নেই।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমানে নোট তৈরিতে যেই পরিমাণ অর্থ খরচ হচ্ছে, একই খরচে জাল অযোগ্য এবং অত্যাধুনিক বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার সম্ভব। কিন্তু বিবি তা অন্তর্ভুক্ত করছে না। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পুরনো টেকনোলজির টেন্ডারদাতা এবং জাল নোট সরবরাহকারীদের একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এ কারণে তারা পুরনো দিনের প্রযুক্তি থেকে সরে আসছে না। আর এর দায়ভার নিতে হচ্ছে সরকার ও জনগণকে। একদিকে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, আরেকদিকে জাল নোটের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জনগণ। (তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর)

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...