সারের জন্য কৃষকরা যখন দিশেহারা তখন চট্টগ্রামে দুটি জেটি ঘাটে এক বছর ধরে পড়ে আছে ৩৫০ কোটি টাকার সার!

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ সারের অভাবে আমাদের দেশের কৃষকরা যখন ফসল উৎপাদন করতে পারছেন না, ঠিক তখন সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকার সার বছর ধরে পড়ে আছে এমন খবরও আমাদের পড়তে হয়!

আমাদের দেশের ফসল উৎপাদনে মূল চালিকাশক্তি এই সার। কৃষকরা সব সময় অভিযোগ করে আসছে তারা সার পাচ্ছে না। যদিওবা সার পাচ্ছে সরকারি দরের ডবল দাম দিয়ে তা কিনতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জানা গেলো, সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার সার চট্টগ্রাম জেটি ঘাটে পচে নষ্ট হচ্ছে। জানা গেছে, নিম্নমানের সার আমদানি করে ফেঁসে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)। ভিয়েতনাম ও কাতার থেকে আমদানি করা ৮৯ হাজার ৭৪ টন নিম্নমানের সার বিসিআইসি না পারছে গ্রহণ করতে, না পারছে ফেরত পাঠাতে। বিপুল পরিমাণ এই সার প্রায় এক বছর ধরে পড়ে আছে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউএফএল) জেটি ঘাট এবং টিএসপি জেটি ঘাটে। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা লাখ লাখ বস্তাভর্তি সার রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে। ইতিমধ্যে এসব সারের গুণগতমান বিনষ্ট হয়ে গেছে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নিম্নমানের এসব সার আমদানি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড় চলছে। অভিযোগ রয়েছে, এর পেছনে সংঘবদ্ধ একটি দুর্নীতিবাজ চক্র জড়িত। আমদানি করা নিম্নমানের এসব সার পরীক্ষার জন্য গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। এ ব্যাপারে কমিটির রিপোর্ট প্রদানের তিন মাস পরও আজ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা এসব সার বিসিআইসি গ্রহণও করেনি, ফেরত পাঠানো বা ক্ষতিপূরণ আদায়েরও কোন উদ্যোগ নেয়নি। সারের ঘাপলা ধরা পড়ার পর এখন বিসিআইসির কর্মকর্তারাও দায়দায়িত্ব নিতে নারাজ। ফলে সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার সার মিশে যেতে বসেছে কর্নফুলী নদীর পানিতে।

প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, চট্টগ্রামের সিইউএফএল জেটি ঘাটে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে ২৪ হাজার ৫৭৪ টন ইউরিয়া সার। প্রতি টন ৪০ হাজার টাকা করে যার মোট মূল্য ৯৮ কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ২০১১ সালের ২৭ নভেম্বর এমভি মিং ইয়ুন জাহাজযোগে চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে পৌঁছে। এক পর্যায়ে এসব সার নিম্নমানের বলে অভিযোগ উঠলে খালাস ও ডেলিভারি বন্ধ হয়ে যায়। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি এসব সার সিইউএফএল জেটি ঘাটে ডাম্পিং করে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করে। জানা গেছে, ভিয়েতনাম থেকে এসব সার সরবরাহ করেছে ভারতের আদিত্য বিড়লা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সুইস সিঙ্গাপুর। এ চালানের স্থানীয় শিপিং এজেন্ট নগরীর আগ্রাবাদের ভিক্টোরি শিপিং।

২০১১ সালের ২৭ এপ্রিল কাতার থেকে এমভি মারিয়া এনএম জাহাজযোগে আসে ৩১ হাজার ৫শ’ টন ইউরিয়া সার। কাতার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় এসব সার আনা হয়, যার মূল্য ১২৬ কোটি টাকা। বন্দরে পৌঁছার পর সারের বস্তা খুলে নিম্নমানের প্রমাণিত হওয়ায় যথারীতি এগুলোও খালাস এবং ডেলিভারিও বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালের ৩ জুন সিইউএফএল জেটি ঘাটে বিপুল পরিমাণ এই সার ডাম্পিং করে জাহাজটি বন্দর ত্যাগ করে। এ চালানের স্থানীয় শিপিং এজেন্ট নগরীর আগ্রাবাদের হাই শিপিং।

একইভাবে ২০১১ সালের ১৮ মে থেকে চট্টগ্রামের টিএসপি জেটিতে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে আরও ৩৩ হাজার টন ইউরিয়া সার, যার মূল্য ১৩২ কোটি টাকা। এগুলোও কাতার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় আমদানি করা।

জানা যায়, মোট ৩৫৬ কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের সারের এই তিন চালানের ক্ষেত্রেই একই ঘাপলা ধরা পড়েছে। নিয়মানুযায়ী বস্তার গায়ে ইংরেজিতে বর্ণনা থাকার কথা থাকলেও এসব চালানের প্রতিটি বস্তার গায়েই রয়েছে চীনা ভাষায় লেখা। এছাড়া সারের মান এবং ওজনে কারচুপিরও অভিযোগ ওঠে। এসব ঘাপলা জানাজানির পর ঘটনা তদন্তে বিসিআইসি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে তদন্ত শেষে ফেব্রুয়ারিতে রিপোর্টও জমা দেয়। এরপর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রধান ঢাকার বিসিআইসি প্রধান কার্যালয়ের জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান বলেন, আমদানি করা সার কি অবস্থায় আছে তা জানানোর জন্য বলা হয়েছিল। সে অনুযায়ী রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, ‘তদন্তে দেখা গেছে সার ঠিক আছে কিন্তু সারের বস্তাগুলোর মান খুবই খারাপ।’

সংবাদে আরও বলা হয়, জাহাজ থেকে খালাস হওয়ার পর সারগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত বিসিআইসির বাফার গোডাউনে নিয়ে যায় ক্যারিং কন্ট্রাক্টররা। এজন্য বিসিআইসির নিযুক্ত ছয়টি ক্যারিং কন্ট্রাক্টর প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিপিং এজেন্টের কাছ থেকে সার বুঝে নেয়ার সময় ক্যারিং কন্ট্রাক্টররাও আমদানিকৃত সারের গুণাগুণ, বস্তার মান এবং ওজন যাচাইবাছাই করে নেয়। কারণ বাফার গুদামে তাদের কাছ থেকে এসব সার গ্রহণ করে বিসিআইসি। এক্ষেত্রে সারে কোন ঘাপলা পেলে তার দায়দায়িত্ব ক্যারিং কন্ট্রাক্টরের ওপরই বর্তায়। সিইউএফএল ও টিএসপি জেটিতে এক বছর ধরে পড়ে থাকা সার নিম্নমানের বুঝতে পেরে পরিবহনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যারিং কন্ট্রাক্টর আগ্রাবাদ এলাকার নবাব অ্যান্ড কোম্পানি এসব সার পরিবহনে রাজি হয়নি। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নবাব খান জানান, ঘাপলা আছে বলেই এসব সার পরিবহন করা হয়নি। ঘাপলা না থাকলে এসব চালান এতদিন পড়ে থাকত না। কি ঘাপলা জানতে চাইলে তিনি বিসিআইসি সব জানে বলে জানান।

সমপ্রতি সিইউএফএল জেটি ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সাদা এবং হলুদ রঙের লাখ লাখ বস্তা সার খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। কিছু ত্রিপল দিয়ে ঢাকা, কিছু সম্পূর্ণ খোলা। বৃষ্টিতে ভিজে অনেক বস্তার ভেতর সার জমাট বেঁধে পাথরের মতো হয়ে গেছে। অনেক বস্তা খুলে সার পড়ে গেছে। আশপাশের চা দোকানদার, মুদি দোকানদার, রিকশা চালক, যাত্রী, স্থানীয় অধিবাসী এবং পাশে অবস্থিত আনসার কোয়ার্টারে থাকা আনসাররা জানান, এসব সার পচে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এখানে এলে নাক চেপে রাখতে হয়। সারের বস্তা পাহারায় রয়েছে শিপিং এজেন্ট এবং বিসিআইসির নিয়োজিত প্রহরী।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রতি বছর সারের চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ টন। এর মধ্যে বিসিআইসি বছরে আমদানি করে আট লাখ টন। বাকি সার উৎপাদিত হয় দেশের বিভিন্ন সার কারখানায়। নিম্নমানের অভিযোগে পড়ে থাকার সারের তিনটি চালানের পর আরও বেশ কয়েকটি চালান চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে এবং যথারীতি খালাস ও ডেলিভারি শেষে বাফার গুদামে চলে গেছে।

Advertisements
Loading...