ভূমি রাজস্বে অনিয়ম ॥ আদায়কারীদের পকেটে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা!

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বলা হয়েছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া হবে। এর বেশকিছু কাজও এগিয়েছে। ইতিমধ্যে টেন্ডারসহ কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের কাজ-কর্মে স্বচ্ছতা আনার জন্য এই ডিজিটাল পদ্ধতির অধীনে আনা হয়েছে। কিন্তু ভূমি ব্যবস্থায় এখনও তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। যে কারণে আদায়কারীরা ভূমি রাজস্ব থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে বেহাল দশা চলছে দীর্ঘদিন থেকে। তহশিলদার ও নাজিররা আদায় হওয়া ভূমি উন্নয়ন কর নিজেদের পকেটে ভরছেন। বিষয়টি উদ্‌ঘাটনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং কানুনগোদের নিবিড় তদারকির নিয়ম থাকলেও তা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার ভূমি রাজস্ব অডিট বিভাগের অডিট সুপার ও অডিটররা আত্মসাতের বিষয়টি অদৃশ্য কারণে উদ্‌ঘাটন করছেন না। ফলে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা বছর বছর যেমন অনুদ্‌ঘাটিত থেকে যাচ্ছে, তেমনি আত্মসাৎ হওয়া ভূমি রাজস্ব আর ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।

ভূমি প্রশাসন সূত্র জানায়, নিয়ম মতো তহশিলদার ও নাজিররা ভূমি উন্নয়ন করের সঠিক দাবি ভূমি মালিকদের কাছে পেশ করবেন। সঠিক পরিমাণ ভূমি উন্নয়ন কর যথাসময়ে আদায় করবেন এবং আদায়ী রাজস্ব ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চালানের মাধ্যমে সরকারের নির্দিষ্ট কোডে জমা দেবেন। মাঠপর্যায়ে তহশিলদার ও নাজিররা সঠিক সময়ে ভূমি মালিকদের কাছে নোটিশ দিচ্ছেন কি না, ভূমি রাজস্ব আদায় করে তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চালানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোডে জমা দিচ্ছেন কি না, বিষয়টি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করবেন এডিসি রেভিনিও, এসিল্যান্ড ও কানুনগোরা। উল্লিখিত কর্মকর্তাদের কেও কেও তদারকি করছেন না বলেই নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীরা সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ পাচ্ছেন। ভূমি রাজস্ব দফতরের অডিট টিম মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায় পরিদর্শনে গিয়ে এসব অনিয়ম ধরলেও তা কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করছেন না। বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে তারা আদায়ী ভূমি রাজস্ব আত্মসাতের ঘটনা ধামাচাপা দিচ্ছেন। সেই ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে আত্মসাতের ঘটনাটি বরাবরের মতো সবার অজানা থেকে যাচ্ছে। কারণ মাঠপর্যায়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয় কিংবা ভূমি রাজস্ব দফতরের কাওকে জানানো হচ্ছে না।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীর ডেমরা সার্কেলে ভূমি উন্নয়ন করের ২ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। অডিটর নিরীক্ষা করেও ঘটনাটি গোপন রেখে অডিট রিপোর্ট জমা দেন। বিষয়টি ফাঁস হলে অডিটরের বিরুদ্ধে ভূমি রাজস্ব দফতর থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তহশিলদার ও নাজিররা আদায় হওয়া রাজস্ব চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চালানের মাধ্যম জমা না দিয়ে তা নিজেদের জিম্মায় রাখেন। ব্যবসায় খাটান। অর্থবছর শেষে ৩০ জুন তারা সরকারি ফান্ডে তা জমা দিচ্ছেন এমন অভিযোগও রয়েছে।

জানা যায়, নিয়ম অনুসারে মহানগরীর ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের রসিদে (দাখিলায়) হোল্ডিং নাম্বার থাকার কথা। তহশিলদার ও নাজিররা তা উল্লেখ করেন না। মান্ধাতা আমলের মৌজা নং, দাগ নং উল্লেখ করে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করেন। এখানে বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। হোল্ডিং নাম্বার থাকলে তা সহজেই বোঝা যায়, ওই হোল্ডিংয়ে কত তলা কতটি ভবন আছে। কিন্তু হোল্ডিং নং না দেয়া থাকায় দশ তলা ভবনের ভূমি উন্নয়ন কর মাত্র ২ টাকা ৭৫ পয়সা আদায় করা হচ্ছে- এমন অভিযোগও রয়েছে

আবার আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার খাজনার মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। বাণিজ্যিক এলাকার খাজনা আদায় করে তা আবাসিক এলাকার খাজনা হিসেবে সরকারি তহবিলে জমা দিচ্ছেন তহশিলদাররা। বিষয়টি সহজে ধরার কোন সুযোগ নেই। কারণ খাজনা আদায়ে দাখিলায় হোল্ডিং নাম্বার দেয়া নেই। দাগ ও খতিয়ান নাম্বার দিয়ে কেও তা ধরতে পারবে না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা আবাসিক ও বাণিজ্যিক রাজস্বের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ আদায় হচ্ছে বাণিজ্যিক রাজস্ব আর সরকারি ফান্ডে জমা হচ্ছে আবাসিক রাজস্ব হিসেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরীসহ জেলা পর্যায়ে অডিটররা বছরের পর বছর একই স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়ম অনুসারে ৩ বছর অন্তর তাদের বদলি করা সম্ভব হয় না। কারণ বদলি করতে গেলেই প্রভাবশালীরা তাদের পক্ষে তদবির শুরু করে। এ বিষয়ে ভূমি রাজস্ব দফতরের কেও কথা বলতে নারাজ। তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে অনিয়ম বিদ্যমান পদ্ধতির কারণেই হচ্ছে। বার বার বলা সত্ত্বেও দাখিলায় হোল্ডিং নাম্বার উল্লেখ করা হচ্ছে না। এ সুযোগে পোয়াবারো মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদেরও।

বিষয়গুলোর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তাছাড়া বার বার বলা সত্ত্বেও দাখিলায় হোল্ডিং নাম্বার কেনো উল্লেখ করা হচ্ছে না সে বিষয়টিও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। সব মিলিয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হলে একমাত্র কবজ হলো ডিজিটাল পদ্ধতি পুরোপুরিভাবে অতিদ্রুত চালু করা। সেক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের এই চুরি রোধ করা সম্ভব হবে।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...