কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি’র চির বিদায়

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে গেলেন কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিনয় করে দর্শকনন্দিত হয়েছিলেন তিনি।
১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টায় ধানমন্ডিস্থ বাসায় ইন্তেকাল করেন বরেণ্য এই অভিনেতা। টিভি নাটক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের বিশাল এক খল নায়কে পরিণত হন তিনি। তার অসামান্য অভিনয় দেশ বিদেশের অগণিত দর্শকদের মন জয় করে। তিনি মানুষের প্রিয় অভিনয় ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। মুহূর্তের মধ্যে হুমায়ুন ফরিদীর মৃত্যু খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।
হুমায়ুন ফরীদি দীর্ঘদিন ধরেই শ্বাসজনিত ও ডায়াবেটিস রোগে ভুগছিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে হঠাৎ করেই তিনি অসুস্থ হয়ে যান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউ) তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। চিকিৎসকের পরামর্শানুযায়ী ১১ ফেব্রুয়ারি তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। তিনি বাসায় এসে মুঠোফোনে তার সব বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে কথাও বলেন। আবার প্রিয় অভিনয়স্থলে কাজ শুরু করার পরিকল্পনাও করেন। কিন্তু হঠাৎ করেই সবাইকে তিনি না জানিয়ে চিরবিদায় নিলেন।
হুমায়ুন ফরীদির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা ধানমন্ডির বাসায় ছুটে যান। ফরীদিকে একনজর দেখার জন্য ফরিদুর রেজা সাগর, সাইখ সিরাজ, হাসান ইমাম, রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশিদ, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. ইনামুল হক, সাংবাদিক আবেদ খান, আবুল হায়াত, বিপাশা হায়াত, তৌকির আহমেদ, শিমুল ইউসুফ, খায়রুল আলম সবুজ, শহীদুজ্জামান সেলিম, রোজী সিদ্দিক, আবুল কালাম আজাদ, পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন, চিত্রনায়ক আলমগীর, রুবেল, নাট্যপরিচালক এসএ হক অলিক, এজাজ মুন্না, সুইটি, সুমাইয়া শিমু, বন্যা মির্জা, লিটু আনাম, পল্লব, শহীদ, অন্তু করিম, শাহেদ, শোয়েব, সাজ্জাদ সুমন, আফরোজা বানু, আনিসুর রহমান মিলন, মীর সাব্বির, নাজনীন চুমকী, মৌ, তারিক আনাম খান, নিমা রহমান, তমালিকা কর্মকার, সাবেরী আলাম, শর্মিলা আহমেদসহ আরও অনেকে।
বেলা ১১টায় ফরীদিকে গোসল করিয়ে নিজ বাসভবনে জানাজা পড়ানো হয়। জানাজা শেষে মরদেহ বাসভবনে রাখা হয় প্রিয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের জন্য। সেখানে এক হূদয়বিদারক দৃশ্যর অবতারণা হয়। সবাই হুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন। কেউবা আড়ালে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। ঘটনাস্থলে অনেকক্ষণ ধরেই শোনা যাচ্ছিল সুবর্ণা মুস্তাফা আসবেন ফরীদিকে শেষবারের মতো দেখতে। অধীর আগ্রহ নিয়ে সেখানে অপেক্ষা করছিলেন অনেক সাংস্কৃতিককর্মী। অবশেষে সুবর্ণা মুস্তাফা তার স্বামী বদরুল আনাম সৌদকে নিয়ে ফরীদির বাসায় আসেন। ততক্ষণে ফরীদির মরদেহ বিটিভিতে পাঠানো হয়েছে।
অনেকটা আক্ষেপ করে সুর্বণা মুস্তাফা বলেন, ‘আমি তোমাদের কতবার ফোন করে বলেছি আত্মীয়স্বজনরা না আসা পর্যন্ত ফরীদিকে কোথাও নিয়ে যাবে না। কেন তোমরা আমাকে ফরীদিকে একবার দেখতে দিলে না।’ তারপর তিনি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলেন বিটিভির উদ্দেশে। সেখানে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা ফরীদির মৃতদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বিটিভি থেকে বিকাল ৫টায় ফরীদির মরদেহ এফডিসিতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাকে এক নজর দেখার জন্য ছুটে আসেন এফডিসির এমডি ম. হামিদ, নায়ক রাজ রাজ্জাক, ইলিয়াস কাঞ্চন, শাহনূর, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, চাষী নজরুল ইসলাম, মিশা সওদাগর, মনির খান, রবি চৌধুরী, খোরশেদ আলম খসরু, ডন, ড্যানি সিডাকসহ আরও অনেক চলচ্চিত্রকর্মী। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ফরীদির মরদেহ বারডেম হিমাগারে রাখা হয়েছে। সর্বস্তরের মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আজ সকাল ১০টায় শহীদ মিনারে তার মরদেহ আনা হবে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে তার জানাজা হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। তার দাফন কোথায় সম্পন্ন হবে তা এখন কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না।
গেল বছর ২৯ মে ষাটের কোঠায় পা দিয়েছিলেন অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সহযোদ্ধাদের আবদার ফেলতে পারেননি বলেই ‘বালাইষাট’ সংস্কৃতি কর্মীদের নিয়ে উদযাপন করেছিলেন তিনি।
১৯৫২ সালে ঢাকায় জন্ম এ কিংবদন্তি অভিনেতার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়াকালীন সময়ে নাট্যাচার্য সেলিম আলদীনের অন্যতম সহযোগী হয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নাট্য উৎসবের আয়োজন করেন। ১৯৭৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে। সেলিম আলদীনের নাটক শকুন্তলা দিয়ে প্রথম মঞ্চনাটকে অভিষিক্ত হন তিনি। তারপর একে একে ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘ক্যারামত মঙ্গল’সহ নাটকে। ‘ভূত’ নামের একটি নাটক নির্দেশনাও দিয়েছিলেন সফলতার সঙ্গে। শেষ নব্বইতে ‘ধূর্ত উই’ নাটকের মাধ্যমে মঞ্চ থেকে বিদায় নেন তিনি। অভিনেতার পাশাপাশি তিনি একজন আবৃত্তি শিল্পীও। টেলিভিশন নাটক ‘ভবের হাট’, ‘শৃংখল’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘সংশপ্তক’সহ অজস নাটকে হুমায়ুন ফরিদীর অনবদ্য অভিনয় তাকে পৌঁছে দিয়েছিল দর্শক মনোরঞ্জনের মণিকোঠায়। বিশেষ করে ‘সংশপ্তক’ নাটকের কানকাটা রমজানের চরিত্রে তার অসাধারণ অভিনয়নৈপুণ্য আজও দর্শকের স্মৃতিতে অটুট। সিনেমাতেও সমানভাবে তুলে ধরেন নিজেকে। বাংলা সিনেমার তথাকথিত খলচরিত্রের মোড়ক ছিঁড়ে জন্ম দেন নতুন মাত্রার। ‘একাত্তরের যীশু’র মতো বিকল্প ধারা সিনেমা থেকে শুরু করে ‘বিশ্বপ্রেমিক’ এর মতো পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক ছবিতে নিজেকে যুক্ত করে মানুষকে করেছিলেন হলমুখী।
২০০৮ সালে দীর্ঘদিনের সংসারে বিচ্ছেদ হয় দ্বিতীয় স্ত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে।
অসংখ্য ভক্ত অনুরাগীকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। ফরীদি আছেন, থাকবেন দর্শক হূদয়ের মাঝে আজীবন।
এদিকে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় হুমায়ুন ফরিদীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়। সেখানে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সর্বস্তরের জনগণ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

Advertisements
Loading...