কৈলাসটিলা ও হরিপুরে পুরনো তেল ক্ষেত্রে স্তর চিহ্নিত ॥ মজুদ রয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার তেল

ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ সিলেটের কৈলাসটিলা ও হরিপুরের পুরনো তেল ক্ষেত্রে নতুন করে তেলের স্তর চিহ্নিত করেছে পেট্রোবাংলা নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান বাপেক্স। এই তেলক্ষেত্র দুটিতে মজুদ রয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার তেল।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সিলেটের পুরনো তেল ক্ষেত্র কৈলাসটিলায় তিনটি নতুন তেলের স্তর চিহ্নিত ও পাশাপাশি হরিপুরেও তেলের মজুদ বেড়েছে। যদিও আবিষ্কারের ২৬ বছর পর আবার নতুন তেল খনি আবিষ্কার হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামী এক বছরের মধ্যে এ তেল উত্তোলন করা হবে। দুটি তেল ক্ষেত্রের মধ্যে কৈলাসটিলা থেকে ৪৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্তোলনের আশা করা হচ্ছে। তবে হরিপুর ক্ষেত্র থেকে ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উঠানো যাবে। উত্তোলিত তেলের দাম ৪২ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা হবে বলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জানান।

তবে এ দুটি ক্ষেত্রে মোট ১১টি স্তরে গ্যাসের মজুদ থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, গ্যাসের মজুদ জানা থাকলেও তথ্য-উপাত্ত আরও সংগ্রহ করতে হবে। এ ছাড়া গ্যাস ক্ষেত্রের অভ্যন্তরে প্রেসার কেমন তা জানা না থাকায় বিষয়টি পরিষ্কার নয় বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কাছে। অন্যদিকে, সম্প্রতি শেষ হওয়া ত্রিমাত্রিক জরিপে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে দুর্বলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

২০ মে বিকালে কারওয়ানবাজারে পেট্রো সেন্টারে পেট্রোবাংলা আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর, পরিচালক (প্ল্যানিং) সাইফুল আলম চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক বদরুল ইমাম, বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুর্তজা আহমেদ ফারুকী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, প্রথমবারের মতো দুটি তেল ক্ষেত্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হচ্ছে। খনি পুরনো হলেও নতুন করে মজুদ সম্পর্কে প্রমাণ মিলেছে। এ কাজের জন্য ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ পরিচালনাকারী বাপেক্সের দলকে তিনি অভিনন্দন জানান। এরই ধরাবাহিকতায় তেলের আধার খুঁজে বের করতে বড় বড় গ্যাস ক্ষেত্রে ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করা হবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আরও বলেন, এ দুটি গ্যাস ক্ষেত্রে তেল পাওয়া গেছে। যে পরিমাণ তেলের সম্ভাব্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে এর মধ্যে কৈলাশটিলায় ৮০ শতাংশ রিকভারি ফ্যাক্টর বিবেচনায় ৪৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করা সম্ভব। আর সিলেটের হরিপুর ক্ষেত্র থেকে একই প্লান্ট ফ্যাক্টর বিবেচনায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উঠানো যাবে। তিনি জানান, কৈলাশটিলায় ১২টি প্রধান স্তর বিশ্লেষণ করে সাতটি স্তরে গ্যাস, চারটি স্তরে তেল ও একটি স্তরে গ্যাস ও তেলের মজুদ যৌথভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে হরিপুরে ছয়টি প্রধান স্তর বিশ্লেষণ করে চারটি স্তরে গ্যাস ও একটি স্তরে তেলের মজুদ নিশ্চিত করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে আরও একটি স্তরে তেল থাকতে পারে বলে তিনি জানান। চেয়ারম্যান বলেন, এ দুটি ক্ষেত্রের মধ্যে কৈলাশটিলায় একটি মূল্যায়ন কূপ ও তিনটি উন্নয়ন কূপ এবং হরিপুরে একটি মূল্যায়ন কূপ ও দুটি উন্নয়ন কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।

পেট্রোবাংলা দাবি করছে, এখান থেকে ৫৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্তোলন করা সম্ভব। এখন দেশের বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৮ লাখ মেট্রিক টন। এ হিসেবে পুরো তেল তোলা সম্ভব হলে দেশের এক বছরের কিছু বেশি সময়ের চাহিদা পূরণ হবে। পেট্রোবাংলা দাবি করছে, বর্তমান বাজারদর হিসেবে এ তেলের অর্থনৈতিক মূল্য ৪২ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের মধ্যে তেল তোলা হবে বলে জানিয়ে বলা হয়, বাপেক্সের তেল তোলার অভিজ্ঞতা না থাকায় কন্ট্রাক্টর দিয়ে কাজ করানো হবে। এ সময় পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান গ্যাসপ্রমকে দিয়ে তেল উত্তোলনের ইঙ্গিত দেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে সিলেটের হরিপুরে তেলের আবিষ্কার হয়। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সেখান থেকে ১৯৬ বিসিএফ গ্যাস ও ৫ লাখ ৪৪ হাজার ব্যারেল তেল উত্তোলন করা হয়। একপর্যায়ে তেলের চাপ কমে যাওয়ায় উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ করে কূপের মুখ সিল (বন্ধ) করে দেয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরুল ইমাম সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ১৯৮৬ সালেই সিলেটের এ এলাকায় তেলের মজুদ রয়েছে বাপেক্স তা আবিষ্কার করেছিল। তবে সে সময়ের সরকারের আন্তরিকতার অভাবে বাপেক্সে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি। তখন একটি বিদেশী কোম্পানি এসে হরিপুর থেকে তেল উত্তোলন করে অল্প দিনের মধ্যে ক্ষেত্রটি নষ্ট করে ফেলে। এখন আবার সেই তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নতুন করে বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসায় বাপেক্স অভিনন্দন পাওয়ার দাবিদার। ওই এলাকায় তেল রয়েছে যা আগে থেকে প্রমাণিত। তবে মজুদ সম্পর্কে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিশ্বের তেলসমৃদ্ধ দেশের দিকে তাকালে এ তেল খুবই সামান্য। তিনি বলেন, সৌদি আরব প্রতিদিন আট মিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্তোলন করে। এ হিসেবে পেট্রোবাংলা যে মজুদ দাবি করছে তা তুলতে তাদের বড়জোর এক সপ্তাহ লাগবে। তার পরও সীমিত সম্পদ নিয়ে আমাদের খুশি থাকতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, তেল পাওয়ার পর গ্যাসের মজুদ কমেছে তা বলা যাবে না। কারণ এ দুটি গ্যাস ক্ষেত্রের অভ্যন্তরে প্রেসার বা চাপ কী হবে, তা আমাদের জানা নেই। গ্যাস উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে মজুদও বাড়তে পারে। তিনি জানান, সিলেট গ্যাস ক্ষেত্রের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে আমাদের কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। আমরা নির্দিষ্ট গভীরে সার্ভে করতে পারিনি। এ ছাড়া এ ক্ষেত্রের ওপর সেনানিবাস ও শহর থাকায় সেখান থেকে আমরা কোন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারিনি। ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার এলাকায় আমরা কোন জরিপ করতে পারিনি।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...