বোরো ধান-চাল সংগ্রহের নীতিমালা ঘোষণা ঃ কৃষকের স্বার্থ রক্ষা হল কি?

মোঃ আবদুল লতিফ মণ্ডল ॥ গত ৩০ এপ্রিল সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বোরো ধান-চাল সংগ্রহের নীতিমালা ঘোষণা করেছে। এ নীতিমালার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হল- (ক) সরকার চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ১০ লাখ টন চাল সংগ্রহ করবে, যার মধ্যে ৯ লাখ টন চাল এবং দেড় লাখ টন ধান, যা থেকে ১ লাখ টন চাল পাওয়া যাবে; (খ) প্রতিকেজি ধান ও চালের সংগ্রহমূল্য হবে যথাক্রমে ১৮ এবং ২৮ টাকা; (গ) সরকার প্রাক্কলিত ধান উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৫ দশমিক ৭৬ টাকা ও চাল তৈরি খরচ প্রতিকেজি ২৪ দশমিক ২৭ টাকা এবং (ঘ) সংগ্রহ অভিযান ৩ মে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।

বোরো আমাদের সর্বোচ্চ চাল উৎপাদনকারী ফসল। বোরোর পরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী যথাক্রমে আমন ও আউশ। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত চালের প্রায় ৬০ শতাংশ পাওয়া যায় বোরো থেকে।

এ বছর বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ১ কোটি ৮৭ লাখ টন। অনুকূল আবহাওয়া, অবকাঠামোগত সুবিধাদি লভ্যতা, হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা, উপকূল অঞ্চলে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের অনুপস্থিতি প্রভৃতি কারণে এ বছরের বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে সরকারি ও অন্যান্য সূত্রে বলা হচ্ছে। এ কারণে চলতি বোরো মৌসুমে সরকার কর্তৃক অধিক পরিমাণে ধান-চাল সংগ্রহের গুরুত্ব বেড়ে গেছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, বোরো সংগ্রহ নীতিমালায় কৃষকের স্বার্থ রক্ষা হল কি?

যেসব বিষয় সরকারকে অনেক বছর ধরে ধান-চাল সংগ্রহ এবং দাম নির্ধারণে প্রভাবিত করে আসছে সেগুলো হল- (ক) ধান কাটা ও ঘরে তোলার মৌসুমে বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখা, যাতে ধানচাষীরা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং অধিক পরিমাণে ধান উৎপাদনে উৎসাহিত হন; (খ) খাদ্যের নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তোলা; (গ) বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পেলে সরকারি মজুদ থেকে খোলাবাজারে ও ন্যায্যমূল্যের দোকানে চাল বিক্রির মাধ্যমে দাম স্থিতিশীল রাখা; (ঘ) লক্ষ্যমুখী খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন এবং (ঙ) কৃষক পর্যায়ে ধান উৎপাদন খরচ।

অন্যান্য বছরের মতো চলতি বোরো মৌসুমেও ধান-চালের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণে যা সরকারকে প্রভাবিত করেছে তা হল- কৃষক পর্যায়ে ধানের উৎপাদন খরচ এবং চালকল মালিক পর্যায়ে চাল উৎপাদন খরচ। সরকারের প্রাক্কলন অনুযায়ী এ বছর কৃষক পর্যায়ে প্রতিকেজি বোরো ধান উৎপাদনের খরচ ১৫ দশমিক ৭৬ টাকা। গত বছর সরকারের প্রাক্কলন মোতাবেক তা ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ টাকা। এ বছর কেজিপ্রতি বোরো ধান উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ১ দশমিক ১১ টাকা। এর অর্থ, সরকারের মতে, বোরো ধানের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু সরকারের এ প্রাক্কলন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

১৯ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধির কারণে এ বছর বোরো উৎপাদনের খরচ বাড়বে। ২৪ জানুয়ারি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে গভীর নলকূপের মালিকরা সেচের পানির দাম বাড়িয়েছে। এ ছাড়া গত বছর যখন এক বস্তা (৫০ কেজি) ইউরিয়া সারের দাম ছিল ৬০০ টাকা, এ বছর তা ১০০০ টাকা। সংক্ষেপে এক হেক্টর জমিতে বোরো আবাদে এ বছর খরচ হবে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা, যার পরিমাণ গত বছর ছিল ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সারের দাম বাড়ার কারণে এ বছর বোরো আবাদে কৃষকের খরচ বাড়বে মর্মে আরও অনেক তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট, নিবন্ধ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
তাই প্রতিকেজি ধানের সংগ্রহমূল্য কেজিপ্রতি কমপক্ষে ২০ টাকা নির্ধারণ করা উচিত ছিল বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করেন।

কৃষকের কাছ থেকে সরকার যে ধান কিনবে তার পরিমাণ মাত্র ১ দশমিক ৫ লাখ টন। এ সিদ্ধান্তের সমর্থনে খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ধান গুদামে রাখার জন্য যে পরিমাণ শুষ্ক থাকা উচিত, সেভাবে কৃষকরা ধান সরবরাহ করতে পারেন না। এটি কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহে একটি বড় বাধা। এ প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য হচ্ছে, বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে সহজে সমাধানযোগ্য। প্রায় এক দশক আগে আমার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালনকালে বেশ কয়েকটি খাদ্যশস্য সংগ্রহ (ধান ও গম) অভিযান পরিচালিত হয়। ওই সময়ে বোরো ধান সংগ্রহের নীতিমালা অনুযায়ী কৃষক কর্তৃক শুষ্ক ধান না সরবরাহের বিচ্ছিন্ন দু-চারটি ঘটনা আমার নজরে আনা হয়। আমার নিজের উপস্থিতিতে অথবা খাদ্য অধিদফতরের সিনিয়র কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ধান সরবরাহকারী কৃষকদের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে এরূপ সমস্যার সমাধান করা হয়। তাই কৃষকের স্বার্থ রক্ষার্থে সরকারের উচিত অনেক বেশি পরিমাণে বোরো ধান তাদের কাছ থেকে সরাসরি কেনা। কৃষকের সুবিধার্থে সরকার উপজেলা খাদ্য অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদ অফিস প্রাঙ্গণসহ সুবিধাজনক অন্যান্য স্থানে ধান ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করতে পারে।

বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ৩ মে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা আসলে শুরু হয়নি। বর্তমানে ধানের বাজার চালকল মালিক, মজুদদার এবং দালাল-ফড়িয়াদের নিয়ন্ত্রণে এবং দাম সরকার নির্ধারিত দামের অনেক নিচে। ধানের দাম কমায় তারা বেজায় খুশি। ১৪ মে একটি বাংলা দৈনিকে (দৈনিক ইত্তেফাক) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটের হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের বাজারমূল্য প্রতিমণ ৪০০-৪৮০ টাকা। বগুড়ার সারিয়াকান্দি, ফুলবাড়ি, কড়িতলাসহ অন্যান্য স্থানে সদ্য মাড়াই করা বোরো ধান সাড়ে ৪০০ থেকে ৫২০ টাকা মণ দরে বেচাকেনা হচ্ছে। ১০ মে অন্য একটি বাংলা দৈনিকে (বণিক বার্তা) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহের স্থানীয় হাটবাজারে প্রতিমণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৪৫০-৫০০ টাকায়। রাজশাহীর বিভিন্ন বাজারে প্রতিমণ ধান ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কৃষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ কৃষক সমিতি’ দাবি করেছে, সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে ধান ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে আরও বেশি দামে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করুক। সংগঠনটি বলেছে, কৃষকরা চাল বিক্রি করে না, তারা বিক্রি করে ধান। সংগ্রহ অভিযান প্রায় পুরোটাই চালকল মালিক নির্ভরশীল হওয়ায় একমাত্র তারাই লাভবান হবেন।

আগেই উল্লেখ করেছি, সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য হল, ধান কাটা ও ঘরে তোলার মৌসুমে বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখা, যাতে ধানচাষীরা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং অধিক পরিমাণে ধান উৎপাদনে উৎসাহিত হন। বোরো চাষীদের বেশির ভাগই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। এসব চাষী ধার-দেনা করে বোরো ফসল ফলান। এ ছাড়া তাদের সংসারে আছে নানা অভাব-অনটন। ফলে ধান কাটার পর পরই তাদের বহু কষ্টে ফলানো ধান বিক্রি করতে বাজারে নিতে হয়। ধান বিক্রির টাকা দিয়ে তাদের পরিশোধ করতে হয় ধার-দেনা, মেটাতে হয় পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা। সুতরাং মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম নিম্নমুখী হলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং ধান উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

পাঠকরা লক্ষ্য করে থাকবেন, গত দুই সপ্তাহে ধানের দাম অনেক কমে গেলেও চালের দামে তেমন কোন হেরফের হয়নি। কোন কোন সরু চালের দাম পাইকারি বাজারে মণপ্রতি ৪০-৫০ টাকা কমলেও খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। আর মোটা চালের বাজারে দামের কোন ওঠা-নামা নেই। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ওয়েবসাইট থেকে দেখা যায়, ২ মে মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ছিল ২৮ থেকে ৩২ টাকা। ১৪ মে একই দাম। উল্লেখ্য, সরকার চালকল মালিকদের কাছ থেকে মোটা চাল সরবরাহ নেয়। ধানের দাম যত কমবে, চালকল মালিকদের লাভ তত বেশি হবে।

চাল সংগ্রহের ব্যাপারে সরকার সম্পূর্ণভাবে চালকল মালিকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং তারা এ সুযোগটির পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করে আসছে। পাঠকদের স্মরণে থাকতে পারে, ২০১০ সালে বোরো মৌসুমে চালের সংগ্রহমূল্য নির্ধারিত হয় কেজিপ্রতি ২৫ টাকা। সে পরিপ্রেক্ষিতে চাল সরবরাহের জন্য খাদ্য অধিদফতরের সঙ্গে চালকল মালিকদের চুক্তি হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের অল্পদিনের মধ্যে চুক্তিবদ্ধ চালকল মালিকরা বাজারে ধানের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে নির্ধারিত দামে চাল সরবরাহে অস্বীকৃতি জানায় এবং চালের দাম বৃদ্ধির জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সরকার তাদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে কেজিপ্রতি চালের দাম তিন টাকা বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ কেজিপ্রতি চালের সংগ্রহমূল্য পুনঃনির্ধারিত হয় ২৮ টাকা। বিষয়টি নিয়ে বাজারে তখন নানারকম রসালো গুজবের সৃষ্টি হয়।

সময় এসেছে একক উৎস অর্থাৎ শুধু চালকল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহের বিষয়টি পর্যালোচনা করার। ২০০৬ সালের জাতীয় খাদ্যনীতিতে অতিরিক্ত উৎস হিসেবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহের নির্দেশনা রয়েছে। সবশেষে বলা যায়, বর্তমান বোরো সংগ্রহ নীতিমালায় কৃষকের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। সংগ্রহ অভিযানে চালের দাম অপরিবর্তিত রেখে প্রতি কেজি ধানের দাম কমপক্ষে ২০ টাকা নির্ধারণ করা দরকার। পাঁচ লাখ টন চালের সমপরিমাণ ধান সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহের ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সরকার সংগৃহীত ধান চালের আকারে সরবরাহ করার জন্য চালকল মালিকদের দেবে। বর্তমান ধান-চাল সংগ্রহ নীতিমালায় চালকল মালিক ও মজুদদারেরা তথা মধ্যস্বত্বভোগীরা ফায়দা লুটছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকরা। তাই এ পদ্ধতির সংশোধন দরকার। (কৃষকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে লেখাটি প্রকাশ করা হলো)
# মোঃ আবদুল লতিফ মণ্ডল : সাবেক সচিব ও কলাম লেখক latifm43@gmail.com

Advertisements
Loading...