The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা ঃ অর্থবছরের শেষে কোটি কোটি টাকা খরচ আর লুটপাটের মহোৎসব

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতি যখন সোচ্চার ঠিক সেই মুহূর্তে স্বাস্থ্য সেক্টরে চলতি অর্থবছরের সমাপ্তি তথা ‘জুন ফাইনাল’কে সামনে রেখে সুকৌশলে সরকারি কোটি কোটি টাকা অপচয় ও লুটপাটের মহোৎসব চলছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা ঃ অর্থবছরের শেষে কোটি কোটি টাকা খরচ আর লুটপাটের মহোৎসব 1
প্রকাশিত খবরে বলা হয়, লাখ লাখ রোগীর সুচিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের নামে রাজধানীসহ সারাদেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তড়িঘড়ি করে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, ওষুধপত্র ও এমএসআর সামগ্রী কেনার ধুম লেগেছে এ সময়ের মধ্যে। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একশ্রেণীর অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে প্রায় সবরকম মালামাল সরবরাহের বৈধ কার্যাদেশ বাগিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ ঠিকাদার চক্র। বরাদ্দের টাকা ৩০ জুনের মধ্যে খরচ করতে না পারলে টাকা ফেরত যাবে- এমন অজুহাত দাঁড় করিয়ে প্রতি বছর এ ঘটনা ঘটছে অনেক দিন থেকে।

২৯ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক এডিপি সভায় উত্থাপিত নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, বিগত ১০ মাসে (২০১১-২০১২) অর্থবছরে বরাদ্দকৃত মোট অর্থের ৫০ শতাংশেরও কম খরচ হয়েছে। এইচপিএনএসডিপি কর্মসূচির বরাদ্দসহ মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অর্থবছরের ১০ মাস অর্থাৎ ১ জুলাই ২০১১ থেকে এপ্রিল ২০১২ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৪১৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। মোট বরাদ্দের ৫০ শতাংশেরও কম মাত্র ৪৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। তন্মধ্যে জিওবি ৮৩৩ কোটি ৪৮ লাখ, প্রকল্প সাহায্য ৫৮৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা রয়েছে। এ হিসাবে মে ও জুন মাসে ৫০ শতাংশ ও টাকার অংকে দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, চিকিৎসক ও রাজনৈতিক নেতা পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মন্ত্রী, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, মহাপরিচালক, পরিচালক ও বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যান (ওপি) পরিচালকদের কাছে সশরীরে উপস্থিত হয়ে, লোক পাঠিয়ে কিংবা মোবাইল ফোনে তদবির করছেন। কেও কেও তার পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ না দিলে শান্তিতে চাকরি করতে দেয়া হবে না, এমনকি পরিণতি ভালো হবে না বলেও শাসাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তদবিরের ভয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের বেশ কিছুসংখ্যক পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর অফিসে কাজ করতে পারছেন না। অনেকে ঝামেলা এড়াতে অফিসে থেকেও বাইরে আছেন বলতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কারও কারও বিরুদ্ধে মোটা অংকের টাকা গ্রহণের মাধ্যমে মঞ্জুরাদেশ দেয়ারও গুঞ্জন রয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াও স্পট কোটেশনের মাধ্যমেও মালামাল কেনা হচ্ছে। জানা গেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জরুরি প্রয়োজনে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া নিজেরাই খরচ করতে পারে। গত ২-১ বছরের তুলনায় এবার স্পট কোটেশনে ক্রয় বেড়েছে বলে জানা গেছে। টাকা ফেরত যাবে- এমন আশংকার দোহাই দিয়ে প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পণ্যের গুণগতমান যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করেই বাজারমূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি দামে কেনাকাটার কার্যাদেশ দেয়ার অহরহ ঘটনা ঘটছে। মালামালের গুণগতমান নিশ্চিত করতে কার্যাদেশে যেসব অত্যাবশ্যক শর্ত থাকা প্রয়োজন, সুকৌশলে তা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। চীন ও ভারতের নিম্নমানের কোম্পানির মালামালে ইউরোপ ও আমেরিকার আদলে নকল মোড়ক লাগিয়ে গছিয়ে দেয়া হচ্ছে। শুধু কেনাকাটাই নয়, অর্থবছরের শেষ সময়ে চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ, বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যানের আলোচনা সভা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের নামেও টাকার শ্রাদ্ধ চলছে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের নামে খরচ হলেও তার সুফল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পিয়ন-চাপরাশি-সবাই টাকা খরচের মহোৎসবে ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে যেসব দামি যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, সেগুলো ওয়ারেন্টি পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই ত্রুটি ধরা পড়ছে। ইউরোপ-আমেরিকার কোম্পানির মালামাল সরবরাহ দেয়ার কথা থাকলেও সংঘবদ্ধ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চীন-ভারতের মালামালকে বিদেশী বলে চালিয়ে দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন জাতীয় কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব যুগান্তরকে বলেছেন, বছরের শেষ সময়ে এসে কোটি কোটি টাকা খরচের যে প্রথা চলছে, সে প্রথা বন্ধ করা না গেলে দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাট বন্ধ করা যাবে না। জুন ফাইনালকে সামনে রেখে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার ব্যবসা বাগিয়ে নেয়ার একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে।

এদিকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, মহাখালীস্থ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপন প্রদান করে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্র-পত্রিকায়। জানা গেছে, এসব বিজ্ঞাপন নিয়ম অনুযায়ী প্রদান করা হলেও বিজ্ঞাপন প্রকাশের দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও কোনও বিল প্রদান করা হচ্ছে না। একটি সূত্রে জানা গেছে, এখানে প্রায় ৮ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন প্রদান করা হয়েছে অথচ পত্রিকার মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে বিলের জন্য ধর্না দিচ্ছেন। এত বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপন কেনই বা দেওয়া হলো এবং তার বিল নিয়ে গড়িমসিই বা কেনো করা হচ্ছে তার কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

বরাদ্দ : ২০১১-২০১২ সালের আরএডিপিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প ও ৩টি কারিগরি প্রকল্প এবং ২টি জেডিসিএফ- অর্থায়নপুষ্ট প্রকল্পসহ মোট ২৪টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হয়। ২৪টি প্রকল্পের অনুকূলে চলতি আরএডিপিতে মোট বরাদ্দ ৭৬৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এ টাকার মধ্যে ৭২৫ কোটি ৮৫ লাখ জিওবি ও ৩৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা প্রকল্প সাহায্য। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের এইচপিএন এসডিপি কর্মসূচির অনুকূলে ২০১১-২০১২ অর্থবছরের আরএডিপির বরাদ্দ ২ হাজার ২৭০ কোটি ১ লাখ টাকা। তন্মধ্যে জিওবি ৭৯০ কোটি ৯১ লাখ টাকা ও প্রকল্প সাহায্য ১ হাজার ৪৭৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। সর্বোপরি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৩ হাজার ৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

অবমুক্তি : এপ্রিল ২০১২ পর্যন্ত মোট অবমুক্ত টাকার পরিমাণ ১ হাজার ৯৫৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তন্মধ্যে জিওবি ১ হাজার ২শ’ কোটি ৫৪ লাখ ও ৭৫৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা প্রকল্প সাহায্য।
ব্যয় : এপ্রিল ২০১২ পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৪১৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৪৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
Loading...