সংসদে রুলিং ॥ ব্যবস্থা নেবেন প্রধান বিচারপতি ॥ এদেশ পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ -স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ

ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ বেশ কয়েকদিন ধরেই আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে স্পিকার ও বিচারপতির বক্তব্য নিয়ে। এ বিষয়ে গতকাল ১৮ জুন বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক জাতীয় সংসদের আলোচ্য বিষয় নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে সংবিধানের ৭৮(১) অনুচ্ছেদ লংঘন করেছেন বলে রুলিং দিয়েছেন স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুুল হামিদ।

ইলেকট্রিক মিডিয়া ও সংবাদপত্র সূত্রে বলা হয়েছে, তবে একজন বিচারকের অশোভন আচরণ রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ককে ব্যাহত করতে পারে না বলে মন্তব্য করে স্পিকার আবদুল হামিদ বলেছেন, এদেশ পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ। স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ এ ঘটনাকে দুঃখজনক, অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও ব্যক্তিগত আক্রমণপ্রসূত বলে দাবি করে বলেন, ওই বিচারপতি সংসদ ও আমার সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন তা কোনো বিবেকবান মানুষ উচ্চারণ করতে পারেন কি না সন্দেহ রয়েছে। প্রত্যাশা ছিল তিনি (এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক) সব বিষয় হূদয়ঙ্গম করবেন এবং মাত্রা অতিক্রমকারী বক্তব্য পরিহারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। ১৮ জুন জাতীয় সংসদে দিনের কার্যসূচির শুরুতে দেয়া রুলিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে অপসারণ সংক্রান্ত জাতীয় সংসদের প্রস্তাবের সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করলেও বৃহত্তর স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখে স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ এই প্রস্তাব প্রত্যাহারের জন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পুরো বিষয়টি প্রধান বিচারপতির এখতিয়ারে ছেড়ে দিয়ে তাকেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানান স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, সুুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ সমীচীন হবে না। অবশ্য একজন বিচারকের এ ধরনের আচরণে করণীয় সম্পর্কে প্রধান বিচারপতি যে ব্যবস্থা নেবেন তাতে জাতীয় সংসদের সমর্থন থাকবে বলে জানান স্পিকার। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা এ সময় অনুপস্থিত ছিলেন।

দীর্ঘ ছয় পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যে স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ বলেন, রাষ্ট্রের ভিত্তি সংবিধান। সংবিধানের মূল স্তম্ভ সংসদ। এই সংসদই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেন। এই পদ্ধতিতেই জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সংবিধান আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সংবিধানকে সমুন্নত রাখব দেশবাসী এটাই প্রত্যাশা করে। স্পিকার বলেন, আমার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই আশাকরি এ সংক্রান্ত বিতর্কের অবসান ঘটবে। পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিয়ে অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ বলেন, ২৯ মে মহান জাতীয় সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি কিছু কথা বলেছিলাম। আমার বক্তব্যের বিষয় ছিল মূলত সংসদ, আদালত ও নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক এবং তাদের কল্যাণ সাধন। সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই তাৎক্ষণিকভাবে কিছু সাধারণ মন্তব্য করা হয়েছিল। পরবর্তীতে গত ৫ জুন ইন্টারনেট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এ নিয়ে সংবাদ পরিবেশিত হয় যে, হাইকোর্ট বেঞ্চের একজন বিচারপতি আমার বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল বলে মন্তব্য করেছেন এবং আমার ও জাতীয় সংসদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ ও অনাকাংখিত মন্তব্য করেছেন। ওই দিনই সংসদ চলাকালীন সময়ে আপনাদের মধ্যে সিনিয়র কয়েকজন সদস্য পয়েন্ট অব অর্ডারে এ বিষয়ে সংসদের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে ওই মাননীয় বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, এমনকি সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনপূর্বক অপসারণের দাবি জানিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। উপস্থিত সব সদস্য এ বক্তব্য সমর্থন করেন যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। ওই দিন স্পিকারের দায়িত্ব পালনরত ডেপুটি স্পিকার এ বিষয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান। তিনি বলেন, স্পিকার তথা সংসদকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের ৭৮(১) অনুচ্ছেদ লংঘন না করা, সংসদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সংসদকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য সেদিন আপনারা এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এবং বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করেছিলেন। বস্তুত সেই মুহূর্তে সেটাই স্বাভাবিক ছিল। আপনাদের এ সেন্টিমেন্টকে আমি শ্রদ্ধা করি, আপনাদের প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ বলেন, এটা প্রণিধানযোগ্য যে, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক ও সমন্বয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, যথাযথ চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স গড়ে তোলার জন্য পৃথিবীর অনেক দেশ শত শত বছর নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। কারণ আমরা সবাই অবগত যে ডেমোক্রেসি ইজ নট এ সিস্টেম অনলি, ইট ইজ এ কালচার টু। আমরাও এই মহান সংসদে সেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি অর্জনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তিনি বলেন, আর তাই কিছুদিন আগে আমাদের দেশের একজন অধ্যাপক, বরেণ্য শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ্‌ আবু সায়ীদ-এর বিষয়ে সংসদে কিছু আলোচনা হয়েছিল। যখনই সংসদের কাছে তার বক্তব্য সম্পর্কিত সঠিক ব্যাখ্যা গোচরীভূত হয়, তখনই সংসদ এ ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেছে। অপ্রয়োজনীয় অংশ এক্সপাঞ্জ করেছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল ওই বিচারপতি সব বিষয় হূদয়ঙ্গম করবেন এবং মাত্রা অতিক্রমকারী বক্তব্য পরিহারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ বলেন, আমার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মহামান্য হাইকোর্টের বিচারপতি যে বিষয়গুলোর অবতারণা করেছেন এবং পরবর্তীতে এ নিয়ে যে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে তা সত্যিই দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম এ বিষয়ে কোন বক্তব্য দেব না বা মন্তব্য করব না। সবাই স্বীয় বিবেচনায় বিষয়টি অনুধাবন করবেন। কিন্তু পরে দেখলাম এটির সঙ্গে আমার এবং মহান সংসদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। আমার অবস্থান স্পষ্ট না করলে মহান সংসদ এবং আমার সম্পর্কে অনেকেরই ভুল ধারণা থেকে যেতে পারে। এ প্রসংগে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি দিয়ে তিনি বলেন ‘যেটা নিয়ে অন্যের সংগে ব্যবহার চলছে, যার প্রয়োজন এবং মূল্য সত্যভাবে স্থির হওয়া উচিত, সেটা নিয়ে কোন যাচনদার যদি এমন কিছু বলেন যা আমার মতে সংগত নয়, তবে চুপ করে গেলে নিতান্ত অবিনয় হবে।’ শেষে ঠিক করেছি- এ বিষয়ে আমি আমার বক্তব্য স্পষ্ট করব। স্পিকার বলেন, সেদিন অর্থাৎ গত ২৯ মে সংসদ সদস্য শাহরিয়ার আলম সংসদে সড়ক বিভাগের অফিস অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য সময় বৃদ্ধির বিষয়টি আইনমন্ত্রীর নজরে আনার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, আইনমন্ত্রী নেই, থাকলে হয়তো তিনি ব্যাপারটি দেখতেন। এরপর আমি যে কথাগুলো বলেছি তার সারমর্ম হচ্ছে মহামান্য আদালতের প্রতি আমাদের সবার শ্রদ্ধা আছে। আদালত সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। সড়ক ভবনের বিষয়টি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। রাষ্ট্রের তিনটি অংগ আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ একে অপরের পরিপূরক। এগুলো একটি আরেকটিকে সহযোগিতার জন্য রয়েছে। হঠাৎ এ ভবনকে সরিয়ে নিলে এর কার্যক্রম প্যারালাইজড হয়ে যাবে, যা সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ বিষয়গুলো যেন মহামান্য আদালত বিচার বিবেচনা করেন, সে অনুরোধটুকু সেদিন করেছিলাম। প্রয়োজনে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের আলোচনার মাধ্যমে তা সুরাহ হলে সুন্দর হয় বলেও উল্লেখ করেছিলাম। শেষে রাষ্ট্রের সব অঙ্গের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব রাখার কথা বলে এ পর্যায়ে আমার বক্তব্য শেষ করি। স্পিকার বলেন, ওই দিন পরবর্তীতে সংসদ সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদল আদালত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য রাখলে আমি হাস্যচ্ছলে বলেছি, আমার স্পিকারশিপের মেয়াদ শেষ হলে আমাকে আবার কালো কোট পরে কোর্টে যেতে হবে। সুতরাং হিসাব করে কথা বলতে হয়। আবার কোন সমস্যায় পড়ে যাই। মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে রিলিফ নাও পেতে পারি। এরপর গণমানুষের কাছে সবার জবাবদিহিতার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে বলেছিলাম সংসদে সংসদ সদস্যরা যে আইনগুলো পাস করেন সেগুলো যদি জনগণের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত জনগণ আমাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। কোর্টের বিচারে যদি দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয় তাহলে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে মানুষ একদিন হয়তো রুখে দাঁড়াতে পারে। একইভাবে যদি কোন সরকার স্বৈরাচারী আচরণ করে সে ক্ষেত্রে জনগণের রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাস আছে। সবাইকে চিন্তা-ভাবনা করে চলা প্রয়োজন। আত্মঅহমিকা বিসর্জন দিয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার কথা বলেছি। কোন আদালত বা কোন মামলা বা কোন বিচারপতিকে উদ্দেশ করে কোন কথা বলা হয়নি। মূলত রাষ্ট্রের তিনটি অংগের কাজে কোন ব্যত্যয় ঘটলে কি হতে পারে তারই একটা ধারণার কথা বলেছি।

স্পিকার আবদুল হামিদ বলেন, গত ২৯ মে সংসদে আমার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ জুন হাইকোর্টের একজন বিচারপতি সংবিধানের ৭৮(১) অনুচ্ছেদ লংঘন করে সংসদ সম্পর্কে, আমার সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন তা কোন বিবেকবান মানুষ উচ্চারণ করতে পারেন কি-না আমার সন্দেহ রয়েছে। প্রথমেই তিনি বলেছেন, আমার বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। আমার উপরোক্ত কথাগুলোর কোনটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে তা আমার বোধগম্য নয়। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ উত্থাপনের আগে রাষ্ট্রদ্রোহিতা কি, কোন কাজ রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিষয়টি কে নির্ধারণ করতে পারেন এসব বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করলে বিজ্ঞ বিচারপতি তার বিজ্ঞতার পরিচয় দিতেন। অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ বলেন, পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি, ওই দিন আদালতের বিচারক বলেছেন, ‘আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করছে। বিচার বিভাগের কাজে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের কোন চাপ নেই। অথচ স্পিকার সংসদে বলেছেন, আইনমন্ত্রী উপস্থিত থাকলে সড়ক ভবনের সম্পত্তির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তাকে বলা যেত। তাহলে কি স্পিকার মনে করেন আইনমন্ত্রীর নির্দেশে বিচার বিভাগ চলে?’ তিনি বলেন, বিজ্ঞ বিচারপতি আমার বক্তব্য ভালভাবে না শুনে না পড়ে যে মন্তব্য করেছেন তাতে তিনি তার বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে সমর্থ হননি মর্মে অনুমিত হয়। আসলে ওই দিন সংসদ সদস্য স্পিকারের মাধ্যমে আইনমন্ত্রীর কাছে সড়ক ভবন সরিয়ে নেয়ার জন্য সময় প্রদানের বিষয়টি উত্থাপন করতে চেয়েছিলেন। আইনমন্ত্রী তখন সংসদে উপস্থিত না থাকায় আমি বিষয়টি সংসদকে অবহিত করি এবং বলি, ‘থাকলে হয়তো তিনি ব্যাপারটা দেখতেন। এটুকুই বলেছি। এখানে আইনমন্ত্রীকে সড়ক ভবনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেছি- এ ধরনের কোন কথা বলিনি।

আত্মপক্ষ সমর্থন করে স্পিকার বলেন, আমার জ্ঞান, মেধা, যোগ্যতা ও আইনজীবী হিসেবে আমার সনদ নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে। আমি প্রায়ই বলি, আমি কম লেখাপড়া জানা মানুষ। ষাটের দশকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে, তার সান্নিধ্যে এসে ছাত্রাবস্থায় এ দেশের মানুষের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছিলাম। রাজনীতির পাশাপাশি আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘ ৩৭ বছর কাজ করেছি। সুপ্রিমকোর্ট বার-এর সদস্য হিসেবে হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেছি। সাবেক প্রধান বিচারপতি এমএম রুহুল আমিন, এবিএম খায়রুল হক ও বর্তমান প্রধান বিচারপতির আদালতে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বড় বড় বই হয়তো পড়িনি কিন্তু সাধারণ মানুষের মনের কথাটি বিগত ৫৪ বছর ধরে পড়ে আসছি। অক্ষর জ্ঞানহীন মানুষের কাছ থেকেও আমি সারাজীবন অনেক কিছু শিখেছি। তাদের মনের কথাটি পড়তে পারি বলেই হয়তো তাদের মনে ঠাঁই পেয়েছি। জনগণ আমাকে সত্তরের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। গণমানুষের কল্যাণে জনগণের নেয়া নির্বাচনী পরীক্ষায় বার বার উত্তীর্ণ হয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। তিনি বলেন, দ্বিতীয়বার স্পিকার হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব পেয়েছি। তবে স্পিকার হিসেবে আমি একক কোন সত্তা নই। এ সংসদের অনেক সদস্য আছেন যারা লেখাপড়ায় উচ্চ শিক্ষিত, জ্ঞান-গরিমায় আমার চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ। তারপরও সরকারি দল, বিরোধী দল ও অন্যান্য দল আমাকে সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার নির্বাচিত করেছেন। আমার জ্ঞান, যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তা সংসদের সব সদস্যের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ধরনের উক্তি করার আগে বিজ্ঞ বিচারক আরও গভীরভাবে চিন্তা করলে ভালো করতেন। বিজ্ঞ বিচারক আরও অনেক বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন যা আমি এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি না। অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ বলেন, আদালতের বিচারকের মন্তব্যের সূত্র ধরে অনেকেই বিশেষ করে পত্র-পত্রিকাগুলো একে সংসদের সঙ্গে বিচার বিভাগকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে মর্মে উল্লেখ করেছেন। সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে আসলে এটি কোন বৈরিতা নয়। এটি সংসদ সম্পর্কে জনৈক বিচারপতির কিছু অসৌজন্যমূলক মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ-প্রসূত উক্তি। পুরো বিচার বিভাগকে এর সঙ্গে জড়ানো ঠিক হবে না। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে বর্তমানে এদেশ পাকিস্তান নয়- বাংলাদেশ। আবারও বলছি, বাংলাদেশ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রের তিনটি অংগের মধ্যে রয়েছে ৪০ বছর ধরে গড়ে ওঠা গভীর সম্প্রীতি ও আস্থার সম্পর্ক। পারস্পরিক এ সুসম্পর্কের কারণেই অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এদেশটি আজ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি একজন সংসদ সদস্য হিসেবে এবং স্পিকার হিসেবে সবসময় বিশ্বাস করি রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ- আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ একে অপরের পরিপূরক এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীন। এক্ষেত্রে কর্মপদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে কিন্তু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক এবং তা হলো সর্বাবস্থায় জনগণের কল্যাণ সাধন। দেশ ও জাতির কল্যাণে এ সম্পর্ক আরও অটুট হোক- এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। তিনি বলেন, ৫ জুন সংসদ সদস্যরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশের একপর্যায়ে সুুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনপূর্বক ওই বিচারপতিকে অপসারণের দাবি জানিয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে একটি রেজুলেশন গ্রহণ করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বরাবর প্রেরণের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন।

আপনাদের প্রস্তাবকে আমি সমর্থন করে বিনীতভাবে বলতে চাই, একজন বিচারকের অশোভন আচরণ রাষ্ট্রের তিনটি অংগের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ককে ব্যাহত করতে পারে না। এ মহান সংসদের অভিভাবক হিসেবে আরও বলতে চাই, আমরা ষোল কোটি জনগণের প্রতিনিধিরা একজন ব্যক্তিবিশেষের আচরণ দিয়ে পুরো বিচার বিভাগকে মূল্যায়ন করতে পারি না। আপনারা সবাই সিদ্ধান্ত নিলে আমার জন্য তা বাইন্ডিংগস হয়ে যায়। সার্বিক বিবেচনায় যেহেতু এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ সমীচীন হবে বলে আমি মনে করি না, তাই আমি বিনীতভাবে অনুরোধ করব সংসদে আপনাদের উত্থাপিত প্রস্তাবটি আপনারা আমার সঙ্গে একমত হয়ে প্রত্যাহার করবেন। স্পিকার বলেন, আমি আশা করব, বিচারপতির সংসদ সম্পর্কিত মন্তব্যের বিষয়ে মাননীয় সংসদ সদস্যরা বিচার বিভাগের বিচারক ও বিজ্ঞ আইনজীবীরা, নির্বাহী বিভাগের সম্মানিত সদস্যরা, সুশীল সমাজের সম্মানিত প্রতিনিধিরা, সম্মানিত বুদ্ধিজীবী, সম্মানিত সাংবাদিকসহ সব পেশার মানুষ, সর্বোপরি আমার পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় দেশের আপামর জনসাধারণ স্বীয় বিবেচনায় মূল্যায়ন করবেন। একই সঙ্গে বলব, আদালতের এ ধরনের আচরণে কি করণীয় থাকতে পারে প্রধান বিচারপতি সে বিষয়টি ভেবে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন তাতে আমাদের সমর্থন থাকবে। এর ফলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা হয়তো সম্ভব হবে।

স্পিকারের বক্তব্য অত্যন্ত শোভন ও অনুকরণীয় -অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমেদ

হাইকোর্টের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্যের জবাবে সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেটের রুলিং প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে সৃষ্ট সংকট কাটানোর ক্ষেত্রে স্পিকারের রুলিং অত্যন্ত শোভন এবং অনুকরণীয়। বিচারপতির বক্তব্যে স্পিকার এতদিন রুলিং না দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে স্পিকার শিক্ষা দিলেন রাষ্ট্রদ্রোহিতা কি।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ আইন, বিচার ও শাসন বিভাগ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দেশ শাসন করে থাকে। কিন্তু স্পিকারকে নিয়ে একজন বিচারপতির বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত। সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ সার্বভৌমত্ব। গণতন্ত্রে জনগণের প্রতিনিধি হচ্ছেন সংসদ সদস্যরা। আর সংসদ সদস্যদের অভিভাবক হচ্ছেন স্পিকার। সেই অর্থে জনগণের অভিভাবক স্পিকার। সেই স্পিকার সম্পর্কে বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন এক অর্থে তা-ই রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
অধ্যাপক এমাজউদ্দীন বলেন, স্পিকার সম্পর্কে ওই বিচারপতির বক্তব্য ছিল ভয়ংকর অশোভন। একজন বিচারপতির রুচিবোধ কি পর্যায়ে থাকলে তিনি এমন মন্তব্য করতে পারেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ের কোন বিচারক বক্তব্য দিতে পারেন সভ্য দেশে এটা কল্পনাও করা যায় না। বিচারপতির আত্মসম্মান তীব্র থাকলে অন্য জায়গায় সরে যাওয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী স্পিকারের কাছে ক্ষমা চাইবেন, না হয় অন্যখানে সরে যাবেন- এটাই আশা করি।

সেদিন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক যা বলেছিলেন..

হাইকোর্টের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ৫ জুন তীব্র ভাষায় স্পিকার আবদুল হামিদের সমালোচনা করেছিলেন। স্পিকারের বক্তব্যকে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল আখ্যায়িত করেছিলেন। এর আগে ২৯ মে সংসদে বিচার বিভাগ ও বিচারাধীন একটি মামলা সম্পর্কে স্পিকার আবদুল হামিদের দেয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ সমালোচনা করা হয়।

স্পিকার আবদুল হামিদ বলেছিলেন, আদালত নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন। কিন্তু দেশের মানুষের বিচারের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর লেগে যাবে আর নিজেদের বিষয় বলে বিচার বিভাগ ঝটপট সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবেন, এটি ভালো দেখায় না। সুপ্রিমকোর্টের জমি ছেড়ে দিতে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে দেয়া উচ্চ আদালতের আদেশ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার আবদুল হামিদ বলেছিলেন, আদালতের রায়ে ক্ষুব্ধ হলে জনগণ বিচার বিভাগের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া আইনমন্ত্রী থাকলে ব্যবস্থা নিতে বলতাম বলেও ওই দিন সংসদে মন্তব্য করা হয়।

সুপ্রিমকোর্টের জমি ফিরিয়ে না দেয়ার অভিযোগে দায়ের করা আদালত অবমাননার মামলাটি ৫ জুন হাইকোর্টের কার্যতালিকায় আসে। শুনানির একপর্যায়ে এ মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ ৩০ মে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘বিচার বিভাগকে সতর্ক করলেন স্পিকার’, ‘সরকার ও বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে স্পিকারের সতর্কবাণী’, ‘বিচার বিভাগ যদি স্বৈরাচারী আচরণ করে তবে রুখে দাঁড়াতে পারে জনগণ’- শীর্ষক তিনটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন। মনজিল আদালতকে বলেছিলেন, পার্লামেন্টে একটি প্রিভিলেজ (সুবিধা) আছে, সেই সুবিধা নিয়ে একটি বিচারাধীন বিষয়ে সমালোচনা করেছেন। ভুল তথ্য দিয়ে এমনভাবে আলোচনা হয়েছে, তাতে মনে হয় আদালত রায় দিয়ে অন্যায় করেছেন। এ ধরনের আলোচনা করে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনগণকে উস্কে দিয়েছেন। পত্রিকার রিপোর্ট পড়ে মনে হয়, পার্লামেন্টে সমালোচনা হয়েছে। আলোচনা নয়। স্পিকার বলেছিলেন তড়িঘড়ি করে রায় দিয়েছেন।

এ সময় বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেছিলেন, স্পিকার একজন আইনজীবী। তার অ্যাডভোকেট শব্দটা থাকা উচিত নয়। আমরা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার জন্যে বার কাউন্সিলে পাঠাবো। স্পিকার বলেছেন, আমরা তড়িঘড়ি করে রায় দিয়েছি। কিন্তু এমনও অনেক বিষয় আছে তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করেছি। আর সড়ক ভবনের বিষয়টির ক্ষেত্রে রুল জারিই করা হয়েছে দেড় বছর আগে। তিনি (স্পিকার) হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেননি তাই রিট মামলার ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা নেই।

বাদী পক্ষের আইনজীবীর এক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি মানিক স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী। সুপ্রিমকোর্টের মর্যাদা মানে শুধু সুপ্রিমকোর্টের মর্যাদা নয়, এটি গোটা দেশের জনগণের মর্যাদার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুপ্রিমকোর্টকে রায় দিতে হবে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে- এ ধরনের বক্তব্যও রাষ্ট্রদ্রোহী। সুপ্রিমকোর্টকে যদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে রায় দিতে হয়। এর চেয়ে নির্লজ্জ মন্তব্য আর হতে পারে না। উনি (স্পিকার) মনে হয় ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ সম্পর্কে জানেন না।

স্পিকারের দেয়া অপর এক বক্তব্যের ব্যাপারে বিচারপতি বলেছিলেন, এই সুপ্রিমকোর্ট কি আইনমন্ত্রীর অধীনে? আইনমন্ত্রীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত? সুপ্রিমকোর্টও পার্লামেন্টের মতো একটি স্বতন্ত্র বডি (প্রতিষ্ঠান)। সুপ্রিমকোর্ট আইনমন্ত্রীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোন বডি নয়। এই জ্ঞানটুকু থাকা উচিত। এটা সাংবিধানিক বডি। আইনমন্ত্রীর কাছে নালিশ করবেন, আর আইনমন্ত্রী আমাদের সাজা দিয়ে দেবেন, চাবুক পেটাবেন। আইনমন্ত্রী কি এই কোর্ট চালান? আমরা কি আইনমন্ত্রীর চাকর (সার্ভেন্ট)?

অপর এক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বলেছিলেন, এ ধরনের সমালোচনা করে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনগণকে উস্কে দেয়া হয়েছে। জনগণকে সুপ্রিমকোর্টের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়া রাষ্ট্রদ্রোহিতা। এ ধরনের উস্কে দেয়ার কারণে আমরা আরও অনেককে তলব করেছি। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছি। সামান্য তৃতীয় শক্তির উত্থানের ব্যাপারে কথা বলায় আমরা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছি। আর এটা তো তার চেয়ে অনেক বেশি মারাত্মক অপরাধ। স্পিকারের অপর এক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেছিলেন, স্পিকারের এত অজ্ঞতা তা আগে জানতাম না। তিনি সংসদের প্রধান ব্যক্তি, তার তো জানা উচিত বিচারকদের কোন মন্ত্রী নিয়ন্ত্রণ করেন না। তার সংবিধান সম্পর্কেও ন্যূনতম জ্ঞান নেই।
এ সময় বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী নুরুল ইসলাম সুজন এমপিকে উদ্দেশ করে বলেন, সুজন সাহেব, আইনমন্ত্রী পারে নাকি আমাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে? আদালত এক পর্যায়ে বলেন, স্পিকার বলেছেন আমি কি হনু রে- এটা কি সংসদীয় ভাষা? স্পিকার কি কোন বিতর্কে অংশ নিতে পারেন? তিনি সংসদের প্রিজাইডিং অফিসার। তিনি কোন বিতর্কে অংশ নিতে পারেন না। তিনি নিজেই পার্লামেন্টের রীতি-নীতি ভঙ্গ করেছেন। সংসদীয় সুবিধার পুরোপুরি অপব্যবহার করেছেন। পার্লামেন্টারি রীতিকে ভঙ্গ করে সংসদে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বিতর্ক করেছেন। তাকে এর আগেও অনেক বেশি আজেবাজে কথা বলতে দেখেছি। তিনি পার্লামেন্টারি প্রসিডিউর জানেন কিনা- সেটাও আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

বিচারপতি সাবেক আইনমন্ত্রী মতিন খসরুকে উদ্দেশ করে বলেন, কি মতিন সাহেব, আপনি আইনমন্ত্রী ছিলেন। হাইকোর্ট কি আপনার নিয়ন্ত্রণে ছিল? আমাদের কি ডাণ্ডাবেড়ি পরাতে বলতেন? স্পিকারের এত অজ্ঞতা কেন? সংবিধান সম্পর্কে এত অজ্ঞ রাষ্ট্রের তিন নম্বর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পরের স্থান, তার এত অজ্ঞতা কেন? তার অজ্ঞতা অমার্জনীয়। মতিন খসরু বলেন, ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রতিটা বিভাগ তার নিজ নিজ বলয়ে স্বাধীন। সুপ্রিমকোর্ট হল সংবিধানের দিক থেকে সুপ্রিম। আদালত বলেন, এই যে দ্বন্দ্বটা বসালেন পার্লামেন্ট ও সুপ্রিমকোর্টের মধ্যে- এটা উনার সৃষ্টি। এরকম দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রের জন্যে ক্ষতিকর হতে পারে- এটা তার জানা উচিত ছিল। এটা পার্লামেন্টে তোলার কি দরকার ছিল। আদালত এ সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওপর লেখা কয়েকটি বইয়ের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেন, তিনি সংসদের প্রিজাইডিং অফিসার। তিনি সংসদের ভেতরে ও বাইরে কোন বিতর্কে অংশ নিতে পারবেন না। এগুলো জানতে হলে পড়াশোনা করতে হয়।

একপর্যায়ে মতিন খসরু বলেন, আর বলবেন না। স্পিকারও একটি প্রতিষ্ঠান। আদালত বলেন, যে লোক এই পদের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন না, তার এই পদে থাকার কোন অধিকার নেই। খসরু বলেন, স্পিকার আবদুল হামিদ একজন আইনজীবী এবং অত্যন্ত সিনিয়র সংসদ সদস্য। তখন হাইকোর্ট বলেন, উনি তো বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। আইন অনুযায়ী তিনি কোন বিতর্কে অংশ নিতে পারেন না। আলোচনার সূত্রপাত তিনি করেছেন। আমরা তার বক্তব্যে হতবাক হয়েছি। দায়মুক্তির অপব্যবহার তিনি করতে পারেন না। তিনি জানেন, আমরা তাকে ডকে দাঁড় করাতে পারব না। তিনি মারাত্মকভাবে তার মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছেন। তার বক্তব্যে আমরা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেছি। এ সময় খসরু বলেন, স্পিকার সংসদের প্রতীক। হাইকোর্ট বলেন, ওই প্রতীক হতে হলে যোগ্যতা থাকতে হয়। পড়ালেখা জানতে হয়। তিনি বিচারাধীন বিষয়ে আলোচনায় শরিক হয়েছেন। তার উচিত ছিল ওই এমপিকে বসিয়ে দেয়া। তা তো তিনি করেনইনি, তিনি নিজেও আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। মতিন খসরু বলেন, আমরা যেন আর বাড়াবাড়ি না করি। সেটা রাষ্ট্র, জনগণ সবার জন্যেই মঙ্গলজনক। আদালত বলেন, উনিই তো অমঙ্গলের কাজ করেছেন।

এ পর্যায়ে শুনানিতে অংশ নেন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ। বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং সংসদ। প্রত্যেক অংশকেই নিজ নিজ এখতিয়ারের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। হাইকোর্ট বলেন, উনি তো না জেনেই বক্তব্য দিয়েছেন। এরপর শুনানিতে অংশ নিয়ে অ্যাডভোকেট আনিসুল হক আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, মাই লর্ড আপনি (বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী) একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আপনার প্রতি আমার অনুরোধ এ নিয়ে আপনি অনেক বলেছেন, রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে বিষয়টি এখানেই শেষ করে দিন। একই সঙ্গে মতিন খসরু ও এমকে রহমানও দাঁড়িয়ে যান। এরপর আদেশ দেয়া শুরু করেন হাইকোর্ট।
আদেশে বলা হয়, সংসদে আলোচনার বিষয়টি প্রায় সব সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। একজন সংসদ সদস্য পয়েন্ট অব অর্ডারে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন যা আদালতে বিচারাধীন। এটা খুবই দুঃখজনক স্পিকার যিনি রাষ্ট্রের তিন নম্বর ব্যক্তি তিনি আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। রুলস অব পার্লামেন্ট অনুযায়ী কোন ধরনের বিতর্কে অংশ নেয়ার সুযোগ স্পিকারের নেই। তিনি কেবল সংসদ পরিচালনা করবেন। সারা বিশ্বের আইনে এটা প্রতিষ্ঠিত যে, বিচারাধীন বিষয়ে সংসদে কোন আলোচনা হতে পারে না। এ সময় আনিসুল হক দাঁড়িয়ে বলেন, মাই লর্ড, আমি বুঝতে পারছি আপনার মনে অনেক কষ্ট। দয়া করে বিষয়টি এখানেই শেষ করে দিন।

এরপর হাইকোর্টের আদেশে আরও বলা হয়, ওই দিন যা হয়েছে তাতে আমরা অত্যন্ত হতাশ। আমরা এটা পরিষ্কার করতে চাই যে, রাষ্ট্রের অন্য দুটি অর্গানের মতো সুপ্রিমকোর্টও সাংবিধানিক অর্গান। সুপ্রিমকোর্ট স্বাধীন। আমরা কোন মন্ত্রীর দ্বারা পরিচালিত হই না। আমরা কেবল আমাদের বিবেক এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে দায়বদ্ধ। সরকারের কাছে বা কোন মন্ত্রীর কাছে আমরা দায়বদ্ধ নই। আমরা আমাদের স্বার্থে কোন আদেশ দেই না, আমরা যে আদেশ দেই তা জনগণের স্বার্থে। সুপ্রিমকোর্টের স্থানের সংকুলান জনগণের স্বার্থেই প্রয়োজন। কারণ স্থান সংকুলান না হলে নতুন বিচারপতি নিয়োগ দেয়া সম্ভব হবে না, মামলার জটও শেষ হবে না। ১৯৬১ সালে সড়ক ভবন সুপ্রিমকোর্টেরই অংশ ছিল। ১৯৭৮ সালে সামরিক শাসনের সময়ই সেখানে সড়ক ভবন করা হয়। আদেশে বলা হয়, আমরা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে আমাদের দায়িত্ব পালন করব। সরকারের কার্যক্রম প্যারালাইজড হবে এমন কিছু আমরা করব না। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাজ সঠিকভাবে এগুবে বলে আমরা আশা করি। আমরা আশা করি, স্পিকার সুপ্রিমকোর্টের প্রতি মর্যাদা দেখাবেন।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...