প্রতিবছরের মতো এবারও ৬০ হাজার হজযাত্রী পরিবহনে বিমানের অনিশ্চয়তা!

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ প্রতিবছরের মতো এবারও হজযাত্রী নিয়ে বিমানের সংকট দেখা দিয়েছে। এমন কোন বছর আসেনি যে এই সমস্যা হয়নি। এবারও ৬০ হাজার হজযাত্রী নিয়ে এই সংকট দেখা দিয়েছে।

হজ আসে বছরে একবার। কবে কখন হজ আসে তাও জানা আছে সরকারের সংশ্লিষ্ট এই বিভাগের। কিন্তু তারপরও প্রতিবছরই হচ্ছে সমস্যা। প্রতিবছর দেখা যাচ্ছে বিমান যাত্রী পরিবহনে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থাৎ সিডিউল কখনই ঠিক থাকছে না। অথচ সরকার কি পারে না এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের একটি পথ তৈরি করতে?

জানা গেছে, এবারও ৬০ হাজার হজযাত্রী পরিবহনে এবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বিমান। বিদেশী বিমান সংস্থা এয়ার আইসল্যান্ড উড়োজাহাজ দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় এ অনিশ্চিয়তা দেখা দেয়। বিমানের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের কারণে চূড়ান্ত চুক্তি করতে গড়িমসি করায় সবকিছু ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া সিন্ডিকেটের দুর্নীতির কারণে তিনটি উড়োজাহাজ লিজ নিতে সরকারের ১২৫ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হবে। এক বছরের পরিবর্তে তিন মাসের লিজ নিতে দরপত্র আহ্বান করায় এ অর্থ গচ্চা যাচ্ছে। এসব বিষয়ে তদন্ত করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২১ জুন এক চিঠিতে এয়ার আইসল্যান্ড উড়োজাহাজ দিতে পারবে না বলে বিমানকে জানিয়ে দেয়। চূড়ান্ত চুক্তি করতে সময়ক্ষেপণ ও নানা টালবাহানার কারণে বিমান বোর্ড সভায় এয়ার আইসল্যান্ডকে অনুমোদন দেয়া হয়। এসব কারণে চূড়ান্ত ভাড়ার চুক্তি বিমান বোর্ড সভায় অনুমোদন করলেও এয়ার আইসল্যান্ড হজযাত্রী পরিবহন করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

একটি সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, হজযাত্রী পরিবহনের জন্য এবার তিনটি উড়োজাহাজ লিজ নেয়ার কথা থাকলেও বিমানের হাতে রয়েছে মাত্র একটি। এদিকে বিমান বোর্ডের অনুমোদন পাওয়া ফ্রান্সের এভিকো এয়ারলাইন্স সংস্থারও কোন প্রতিনিধি ২২ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে আসেনি। চুক্তি করবে কিনা তাও জানায়নি। এতে দুঃশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেছে বিমানের। বোর্ড সভায় অনুমোদনের পরও শেষ মুহূর্তে চুক্তি বাতিলের কারণ সম্পর্কে তদন্ত করবে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদক থেকে ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত ফাইল চাওয়া হয়েছে বলে বিমান সূত্রে জানা গেছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হজের আগে এখন হাতে যে সময় আছে তাতে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করেও কোন লাভ হবে না। আর দরপত্র আহ্বান করলেও উড়োজাহাজ পাওয়া যাবে না। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, হজের আগে ওয়াইড বডির কিংবা বেশি আসনের উড়োজাহাজের খুবই চাহিদা বেড়ে যায়। অন্যান্য দেশের এয়ার সংস্থাগুলো হজযাত্রী পরিবহনের জন্য কমপক্ষে ৭-৮ মাস আগে এসব উড়োজাহাজ ভাড়া নেয়। কিন্তু বিমানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কমিশন বাণিজ্য আর দ্বিগুণ দামে তাদের মনোনীত উড়োজাহাজ লিজ নেয়ার জন্য প্রতি বছর শেষ মুহূর্তে এসে লিজ চুক্তি চূড়ান্ত করে।

এদিকে সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও এয়ারআইসল্যান্ড উড়োজাহাজ দিতে অপারগতা প্রকাশ করাকে রহস্যজনক বলে জানিয়েছেন বিমানের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা। তারা ধারণা করছেন, বিমানের একটি সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য আর মাসোহারা আদায় এর অন্যতম কারণ হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, দুর্নীতি দমন কমিশনকে দিয়ে এই ঘটনাটি তদন্ত করালে পুরো রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। তিনি আরও বলেন, যেখানে এভিকো এভিয়েশন প্রতি ঘণ্টা আওয়ারের জন্য দর দিয়েছে ১২ হাজার ডলার। সেখানে এয়ারআইসল্যান্ড এক বছরের জন্য তাদের দর দিয়েছিল মাত্র সাড়ে ৫ হাজার ডলার। আর হজের জন্য দর দিয়েছে ৮ হাজার ৫০০ ডলার। কিন্তু বিমানের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটটি কমিশন বাণিজ্যের জন্য তাদের এক বছরের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে তিন মাসের জন্য চূড়ান্ত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ কারণেও এয়ার আইসল্যান্ড তাদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে পারে। অভিযোগ, বিমানের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট ঘাপটি মেরে থাকে বিমানকে ডুবানোর জন্য। লিজদাতা কোম্পানিগুলো দর কম দিতে চাইলেও বিমানের সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের কারণে তারা ইচ্ছা করলেও দর কম দিতে পারে না। অভিযোগ, এ বছর হজযাত্রী পরিবহনে উড়োজাহাজ লিজ নিতে বিমানের আরএফপি (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) আহ্বানে নাকি সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আরএফপিতে হজযাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি উড়োজাহাজ এক বছরের জন্য লিজ নেয়ার কথা বলা হলে সে অনুযায়ী তারা দর দিতে পারত। আর এটা করা হলে এবার হজযাত্রী পরিবহনে বিমানের কমপক্ষে ১২৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। পাশাপাশি হজের পর সিডিউল ফ্লাইট ঠিক রাখাসহ ওমরা হজযাত্রী পরিবহনও করতে পারত বিমান। কিন্তু এমনভাবে আরএফপি তৈরি করা হয়েছে যাতে সিন্ডিকেট তাদের পছন্দের এয়ারক্রাফট লিজ নিতে পারে। একই সঙ্গে বিমানের সিডিউল যাত্রীদের বিদেশী এয়ারলাইন্সমুখী করার জন্যও চক্রটি এই ষড়যন্ত্র করতে পারে।

বিমান প্রতিবছরই হজের সময় এলে বিমানের একের পর এক সমস্যা তৈরি হয়। বেসরকারি ট্রাভের এজেন্টদের জন্য এবং সরকারি ব্যবস্থায় সবদিকেই সমস্যা তৈরি হয়ে থাকে। আমার আশা করবো অন্তত হজযাত্রীদের নিয়ে যাতে কোন সমস্যা না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দৃষ্টি দেবেন।

Advertisements
Loading...