সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুমি হত্যাকান্ড ॥ এখনও কেও গ্রেফতার হয়নি ॥ চুরির ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করছে পুলিশ!

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ সাংবাদিকরা দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য সব সময় যে ভূমিকা রেখে চলেছেন তা বিবেকবান কারো কাছেই অজানা নয়। অথচ সেই সাংবাদিককে বার বার নির্যাতিত হতে হচ্ছে। সেই সাংবাদিকদের আজ জীবন দিয়ে মাশুল দিতে হচ্ছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে সাংবাদিকদের। পেশাদার খুনিদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা সব সময় লিখছে। সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজিদের বিরুদ্ধেও সাংবাদিকরা সব সময় লিখছে। মন্ত্রী-মিনিষ্টার থেকে শুরু করে কাওকেই ছাড় দিচ্ছেন না সাংবাদিকরা। ইরাকে গিয়ে যুদ্ধের মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন আমাদের এদেশের অকুতভয় সাংবাদিক। আমাদের দেশের সাংবাদিকরা সাধারণ মানুষের কথা বলছেন, বুক ফুলিয়ে। অথচ সেই সাংবাদিকরা যখন নির্যাতিত হচ্ছেন-খুন হচ্ছেন তখন তারাও পার পেয়ে যাচ্ছেন কতিপয় স্বার্থান্বেষীদের কারণে! এটা কি মেনে নেওয়া যায়? এই সভ্য সমাজের মানুষ হিসেবে আমরা তা মেনে নিতে পারি না।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনী হত্যাকাণ্ড তদন্তে ইউটার্ন নিয়েছে পুলিশ। তারা এখন এটাকে চুরির ঘটনা হিসেবে চালানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। তারা বলছে খুনিরা অপেশাদার হলেও ধুরন্দর প্রকৃতির। হত্যাকাণ্ড শেষে সব আলামতই তারা নষ্ট করে ফেলেছে। খবর দৈনিক যুগান্তরের।

হত্যার পর পালিয়ে যাওয়ার আগেই পরিকল্পিতভাবে তারা হাত ও পায়ের ছাপ নষ্ট করে দিয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে পাউডার জাতীয় পদার্থ ফেলে নষ্ট করে দেয় আলামত। এ কারণে ঘটনাস্থলে উদ্ধারকৃত ফুট ও ফিঙ্গার প্রিন্ট তেমন একটা কাজে আসেনি। ঘটনাস্থল থেকে যে আলামত উদ্ধার করা হয়েছে তাতে ঘাতকদের চিহ্নিত করা খুবই কঠিন। সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতকরা রক্তমাখা পোশাক পরিবর্তন করে পালিয়ে গেলেও আলামতগুলো তারা সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এর ফলে ঘাতকদের অপেশাদার হিসেবে মনে করলেও তারা ‘ধুরন্ধর’ প্রকৃতির বলে মনে হচ্ছে। সিআইডি কর্মকর্তারা বলেছেন, হত্যা-পরবর্তী তদন্ত সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা থাকার কারণেই পরিকল্পিতভাবে তারা এ কাজটি করেছে।

পত্রিকাটি আরও বলেছে, ঘটনার রাতে সাংবাদিক দম্পতির ফ্ল্যাটে চোর ঢুকেছিল বলে প্রমাণের চেষ্টায় রয়েছে তারা। ঘটনার রাতে ওই ফ্ল্যাটে কিভাবে চোর ঢুকেছিল তার একটি ‘রিহার্সেল’ দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এদিকে বৃহস্পতিবার বিকালে সাগর-রুনী হত্যা মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে গোয়েন্দা সংস্থা ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন ইন্সপেক্টর মোঃ রবিউল ইসলাম। শেরে বাংলানগর থানা পুলিশ মামলার ডকেট ডিবিকে বুঝিয়ে দিয়েছে। হস্তান্তর করা হয়েছে সিজার লিস্ট অনুযায়ী আলামতসহ জব্দকৃত অন্য জিনিসপত্র। যদিও শুরু থেকেই এ মামলা ডিবি তদন্ত করে আসছিল। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পাওয়ার পর এর গতি আরও বাড়বে বলে ডিবি কর্তৃপক্ষ দাবি করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেছেন, ঘটনার পর ওই ফ্ল্যাট থেকে হাত ও পায়ের বেশকিছু ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষাগারে নিয়ে ছাপগুলো স্পষ্ট করা যায়নি। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত ধারালো বটিটিও রক্তে ভিজিয়ে দেয়া হয়েছিল। ফলে সেখানে হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর পুলিশ আসার আগেই সাদা পাওডার জাতীয় পদার্থ ফেলে রাখায় পায়ের ছাপগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে যে কাপড় দিয়ে সাংবাদিক সাগর সরোয়ারের হাত ও পা বাঁধা হয়েছিল সে লাল কাপড়ে হাতের চিহ্ন। ঘটনার পর সিআইডি পুলিশ ওই ফ্ল্যাট থেকে ১৫ ধরনের আলামত উদ্ধার করে। আলামতগুলো পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর সিআইডি বুধবার রিপোর্ট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে পাঠিয়েছে। সিআইডির ওই কর্মকর্তা জানান, আলামতগুলো পৃথক-পৃথকভাবে বিভিন্ন ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু কোন আলামত থেকেই খুনিদের চিহ্নিত করার মতো তথ্য উদ্ধার করা যায়নি। এ কারণেই দ্বিতীয় দফা আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।

পত্রিকার সংবাদে আরও বলা হয়, এদিকে ঘটনার ৫ দিন পর ৬/৭ বছরের একটি রোগা শিশুকে ৫ তলায় ওই ফ্ল্যাটে বারান্দার কাটা গ্রিলের ফোকর দিয়ে বুধবার ভেতরে প্রবেশ করানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ডিবির একাধিক টিম পশ্চিম রাজাবাজারের রশিদ লজে যান। ওই বাড়ির পঞ্চম তলায় সাগর-রুনী দম্পতির ফ্ল্যাটের পাশের ভবন বেয়ে কেউ পঞ্চম তলায় উঠতে পারে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখেন। একজনকে ‘চোর’ সাজিয়ে পাশের ভবন থেকে রশিদ লজের পঞ্চম তলার পেছনে রান্নাঘরের বারান্দার গ্রিলের ভাঙা অংশ দিয়ে ভেতরে ঢোকানো হয়। ওই ভাঙা অংশ দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসা সম্ভব তাও নিশ্চিত হন গোয়েন্দারা।

এর পরপরই শুরু হয় ‘চোর’ নাটকের প্লট তৈরির কাজ। ১৫ ফেব্রুয়ারি একাধিক ভিডিও ও স্টিল ক্যামেরা নিয়ে রশিদ লজে হাজির হন গোয়েন্দারা। একজন যুবককে অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের অংশে নিয়ে তাকে দিয়ে দেয়াল বেয়ে পঞ্চমতলায় সাগর-রুনীর ফ্ল্যাটে ঢোকা ও বের হওয়ার শুটিং করানো হয়। গোটা চিত্র ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করার পাশাপাশি বেশকিছু স্টিল ছবিও তোলেন গোয়েন্দারা। এরপর এ ভিডিও ফুটেজ কৌশলে পৃথকভাবে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে দেখানো হয়। ‘এ ভিডিও শুধু আপনাকেই দেখালাম, কারও সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করবেন না’- এমন কথা বলা হয় প্রত্যেককেই।

পত্রিকাটি বলছে, গোয়েন্দারা আশা করেছিলেন, এ টোপ সহজেই গিলবে সাংবাদিকরা। গুরুত্বপূর্ণ (!) এ তথ্য হাতে পেয়ে অনেকেই তা পত্রিকায় প্রকাশ করবেন। এ নিয়ে নিহতদের স্বজন, সাংবাদিক মহল ও সাধারণ মানুষের ‘সেন্টিমেন্ট’ কোন দিকে যায় তা বিবেচনা করে পরে ‘চোর’ নাটকটি মঞ্চস্থ করবে গোয়েন্দারা। কিন্তু গোয়েন্দাদের হতাশ করে এ টোপ গেলেননি সাংবাদিকরা।
তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এরপরও ‘চোর’ নাটক মঞ্চায়ন থেকে সরে আসেননি গোয়েন্দারা। বৃহস্পতিবারও একাধিক সাংবাদিককে এ ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়েছে। তদন্তে সংশ্লিষ্ট একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কণ্ঠে অনেকটা হতাশার সুর ঝুলিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা শেষ পর্যন্ত চুরির ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে। হয়তো চুরি করতে এসেই দুর্বৃত্তরা প্রথমে রুনিকে খুন করে; পরে সাগর বাসায় ঢুকলে তাকেও খুন করা হয়।’ তবে এখনও এ ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন গোয়েন্দারা। গোয়েন্দারা জানান, ফ্ল্যাটের কার্নিশে একটি স্যান্ডেল পাওয়া গেছে। এছাড়া পায়ের ছাপও রয়েছে। ওই নমুনা সংগ্রহ করেছে সিআইডি।
খুনের পাঁচদিন পর স্যান্ডেল ও পায়ের ছাপ খুঁজে পাওয়া এবং গ্রিল দিয়ে ‘চোর’ আসা-যাওয়ার তথ্য সহজভাবে মেনে নিচ্ছেন না কেউই। সচেতন মানুষের প্রশ্ন, ঘটনার পর বাঘা বাঘা গোয়েন্দারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাগর-রুনীর ফ্ল্যাটে ও আশপাশের এলাকায় কাটিয়েছেন। অথচ তখন কেন তাদের অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের অংশ ঘুরে দেখার কথা মনে পড়ল না? তারা কেন তখন এ ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না? ঘটনার পাঁচদিন পর হঠাৎ কেন তাদের এ বিষয়টি মাথায় এল? এসব কেনর উত্তর খুঁজে ফিরছেন অনেকেই। বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এ ব্যাপারে তদন্তে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু কেউই এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, তারা সব কিছুই পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখছেন। কোন কিছুকেই সন্দেহের বাইরে রাখতে চান না।

এদিকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক অনানুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সন্দেহভাজনদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। কতজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সংখ্যাটা আমরা জানাতে চাই না। সংবাদপত্রে প্রকাশিত ৩ জনকে আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-কমিশনার বলেন, ‘আমরা কাউকে আটক করিনি।’ তিনি বলেন, পুলিশ এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। গোয়েন্দা পুলিশে উত্তর এবং দক্ষিণ দুটি বিভাগই কাজ করছে। যাদের নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে তাদের মধ্যে কোন মিডিয়াকর্মী আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সন্দেহের তালিকায় কয়েক পেশার লোক রয়েছেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপ-পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম ১৬ ফেব্রুয়ারি জানিয়েছেন, ঘটনার পর থেকেই বেশ কয়েকজন মিডিয়াকর্মীর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে রুনির কর্মস্থলের কেউ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়টি এখন আমরা বলতে চাচ্ছি না। যাদের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে তদন্ত নিয়ে পুলিশের লুকোচুরি এবং নানামুখী গল্পের প্লট সাজানোর ঘটনায় সাধারণ মানুষ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে বলে আশংকা করেছেন অভিজ্ঞজনরা। তাদের ভাষায়, পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দেয়া না গেলে সরকারকে সাংবাদিকমহলসহ সর্বস্তরের সচেতন মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়তে হতে পারে। আর এ সুযোগ নিতে পারে কোন অশুভ শক্তি।

ঘটনার ৬ দিন পরও ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। অবশ্য পুলিশ বলছে যে কোন সময় তারা খুনিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবেন। অনেকে এটিকে জজ মিয়া নাটকে পরিণত করা হতে পারে বলে আশংকা করছেন। তবে আমাদের ধারণা পুলিশ প্রকৃত অপরাধীকে অতিদ্রুত গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় এনে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটাবেন।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...