মুরসি মিসরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কিন্তু ক্ষমতা কার হাতে?

এম আবদুল হাফিজ ॥ শুরুতে বিভ্রান্তি থাকলেও দেড় বছর আগে কায়রোর তাহরির স্কয়ারে বিস্ফোরিত মিসরীয় বিপ্লবকে পরবর্তী বাস্তবতার নিরিখে দেখলে বড়জোর ক্ষমতার অন্দরমহলে সংঘটিত একটি প্রাসাদ অভ্যুত্থানের অধিক কিছু মনে হবে না। বিপ্লবকালীন মোবারক বিতাড়নকে তখন গণতন্ত্রের বিজয় বলে অভিহিত করে অব্যাহত গণরোষ প্রশমন করা গিয়েছিল। ক্ষমতার বলয়ে লুকিয়ে থেকে মিলিটারির একটি চতুর নেতৃত্ব কৌশলে বিপ্লবীদের সন্দেহের অন্তরালে এবং লোকচক্ষুকে এড়িয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করে আসলে তাদেরই নিয়ন্ত্রণকে দীর্ঘায়িত করতে প্রয়োজনীয় সময় নিশ্চিত করছিল। ইতিমধ্যে জেনারেলরাই ইসলামিক এবং সেক্যুলার প্রশ্নে উভয়ের মধ্যে একটি দ্বন্দ্বও বাধিয়ে দিচ্ছিল। জেনারেলরা এসবই করেছিল অত্যন্ত সন্তর্পণে। তবে তার কিছু আভাস মিসরীয়রা আঁচ করতে পারছিল।

স্কাফ (ঝপধভ) বা সুপ্রিম কাউন্সিল অব আর্‌মড ফোর্সেসের ক্যু দ্য গ্রেস-টি প্রকাশ পেল মিসরের ঐতিহাসিক প্রথম একজন বেসামরিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়। যে সব আভাস এতদিন হাওয়ায় ভাসছিল, ভোট গ্রহণের মাত্র তিনদিন আগে তা রূপ পরিগ্রহ করল। নাটকীয়ভাবে দেশের সাংবিধানিক কোর্ট মাত্র ছ’মাস আগে নির্বাচিত মিসরীয় পার্লামেন্টকে ভেঙে দিল। বলাবাহুল্য ওই পার্লামেন্টে ইসলামী দলগুলোর প্রাধান্য ছিল। ভোট গণনা তখনও চলছিল যখন স্কাফের ঘোষণা এলো যে, ওই দেশের আইনি নিয়ন্ত্রণ ও দেশের নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি নিয়োগের অধিকারও স্কাফেরই থাকবে।

মোবারক আমলে নিয়োগ ও আনুকূল্যপ্রাপ্ত ফিল্ড মার্শাল তানতাবির অধীনে এই কাউন্সিল আরও ঘোষণা দিল যে, অতঃপর নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নয় বরং স্কাফই শুধু সামরিক বাহিনীর নয়, নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব বিষয়- এমনকি বাজেট তৈরির দায়িত্বও পালন করবে। উদারপন্থী বিশ্লেষকরা এতে কিছুটা অবজ্ঞামিশ্রিত সমালোচনায় এমন কথা না বলে পারেনি যে, সেক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বড়জোর ব্রিটেনের রানীর ক্ষমতাই উপভোগ করবে। আসল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আগের মতো সামরিক নেতৃত্বের হাতেই থাকবে।

নির্বাচনের ফলাফল পর্যবেক্ষকরা আগেই জানতেন। তাদের অর্থাৎ পর্যবেক্ষকদের অনুমান অনুযায়ী মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মুরসি বিপুল সংখ্যাধিক্যে জিতবেন। তাদের সেই অনুমিত এবং প্রত্যাশিত ফলাফল সত্য হয়েছিল মুরসির বিপুল ভোটপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী মোবারক শাসনামলের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী ও একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা আহমদ শফিকের সঙ্গে ১.২ মিলিয়ন ভোটে এগিয়ে থাকার ভেতর দিয়ে মিসরীয় জনগণের কাছে মুরসির গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা প্রমাণিত হয়েছিল। যদিও শফিক এই ফলাফলের সত্যতা মানতে চাননি। ইত্যবসরে সামরিক জান্তা খোশ মেজাজে জুলাই নাগাদ বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমতা অর্পণের পূর্বঘোষিত উক্তি পুনর্ব্যক্ত করে।

তা সত্ত্বেও এই ঘোষিত বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সামান্যই কর্তৃত্ব ছিল। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক নাথান ব্রাউন আরব রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞ। তার মতে স্কাফের নির্বাচনোত্তর ক্ষমতা গ্রহণ স্বল্পমেয়াদে সামরিক নেতৃত্বকে বরাবরের মতো রাষ্ট্রের মঙ্গলার্থে একটি অনিচ্ছাকৃত, কিন্তু জরুরি পদক্ষেপ মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে বেসামরিক প্রেসিডেন্টের জন্য তা তাৎপর্যপূর্ণ এবং অশুভ সংকেতবহ।
দীর্ঘমেয়াদে এমন পদক্ষেপ- বিশেষ করে নতুন করে নিয়োগপ্রাপ্ত সাংবিধানিক কোর্টের বিচারক যারা প্রকারান্তরে আবার দেশকে মার্শাল ’ল-এর অধীনেই নিয়ে যাবে, যা নাকি নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তৃত্বই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবে। আশংকা যে, এই নিরাপত্তা বাহিনীই নতুন সংবিধানের প্রবর্তন পর্যন্ত বেধড়ক গ্রেফতারে লিপ্ত হবে, যেমনটি করার ক্ষমতা ও ঐতিহ্য ১৯৫২ সাল থেকেই মিসরে চলে আসছে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কোন কোন ইসলামী নেতা আজকের সমৃদ্ধ এবং তুলনামূলকভাবে গণতান্ত্রিক তুরস্ককে মিসরের জন্য অনুকরণীয় মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। উল্লেখ্য, তুরস্ককে এখন ইসলামী দলগুলোই শাসন করছে। কিন্তু কায়রোর জেনারেল এবং তাদের মিত্ররা আরেক রকমের তুর্কি মডেল অনুসরণ করছে বলে ধারণা করা হয়। তবে সেই মডেলটি তুরস্কে আর নতুন শতাব্দীতে নেই। বিগত শতাব্দীর নির্বাচনী রাজনীতির একটি সাইড শো’র (ঝরফব ঝযড়) উিদ্দেশ্য ছিল জেনারেল ও বিচারকদের কর্তৃত্বে একটি বৈধতার আবরণ পরিয়ে দেয়া। সম্মিলিতভাবে একে ‘গহিন রাষ্ট্র’ অভিহিত করা হতো। এই উববঢ় ঝঃধঃব-এ বিচরণকারীরা ছিল তুরস্কে ‘সেক্যুলারিজম’-এর অভিভাবক।
মিসরে উববঢ় ঝঃধঃব-এর প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা নেহায়েত নগণ্য সাফল্য দেখেনি এবং তা বোঝা যায় মিসরের ক্রমবর্ধমান অকার্যকর রাজনীতি, যার প্রকাশ ঘটে মোবারক-উত্তর মিসরে নৈরাজ্য এবং উদারপন্থী একটি বিক্ষোভ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এই আন্দোলনে ছিল না কোন সুসংহত নেতৃত্ব বা কৌশল। তাহরির স্কয়ারের যোদ্ধারা আশ্চর্যজনকভাবে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতায়ও উৎসাহী নয়, বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে, যদিও তা দেশের সবচেয়ে সংহত নির্বাচনী শক্তি।

একই রকম আশ্চর্যজনকভাবে ব্রাদারহুডও সেক্যুলার বিক্ষোভ-কারীদের ব্যাপারে অস্পষ্ট এবং দ্বিমুখী ধারণা পোষণ করে আসছিল। নাথান ব্রাউনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ব্রাদারহুড বজ্রকণ্ঠে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আনলেও শেষ পর্যন্ত তা কোন কার্যকর পরিণতি পর্যন্ত এগিয়ে নিতে পারে না। এক ধরনের আপসের প্রবণতা- তার কারণ যাই হোক না কেন ব্রাদারহুডের জন্য দীর্ঘদিনের কোন সাফল্য বয়ে আনেনি।

এদিকে জান্তার কাছে সাবেক এয়ারফোর্স প্রধান শফিকের জন্য স্বভাবতই খানিকটা দুর্বলতা আছে। তা সত্ত্বেও জান্তা সম্ভবত ইসলামিস্টদেরই তাদের নির্বাচনী শক্তির প্রেক্ষিতে নতুন ক্ষমতার বিন্যাসে জুনিয়র পার্টনার হিসেবে গ্রহণ করবে। বাস্তবে তো সামরিক নেতৃত্ব স্কাফই ক্ষমতার দণ্ড ধারণ করে আছে, রাজনীতিতে ব্রাদারহুডের যতই গুরুত্ব ও প্রাধান্য থাক না কেন। যদিও স্কাফ এতদিন ধরে অন্তরাল থেকেই রাষ্ট্রসম্পর্কিত সবকিছু করে এসেছে। কিন্তু জান্তার অভ্যন্তরেও সবার শীর্ষে চূড়ান্ত ক্ষমতা ধারণকারী কোন একজনকে দেখতে চেয়েছে। তালতাবি স্কাফের চেয়ারম্যান হলেও এখন ক্ষমতার খেলায় নিয়ম পরিবর্তনের একটি প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। স্কাফ এখন নতুন বাস্তবতায় যেভাবেই সিদ্ধান্ত নিক, তার পরিণতি নিয়ে তারা তাহরির স্কয়ারের কিছু বিক্ষোভকারীর সমাবেশে ভীত নয়।

ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্রাদারহুড অনেক অর্জনের পরও এবং ব্রাদারহুড মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি নির্বাচনে জিতলেও আসল ক্ষমতার দোরগোড়ায়ও এ পর্যন্ত পৌঁছায়নি ব্রাদারহুড। মিলিটারির সঙ্গে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে মুরসির দ্বন্দ্ব এখনও অব্যাহত। কোন অভ্যুত্থান বা পাল্টা অভ্যুত্থান ক্ষমতা দখলে নিয়ামক হতে পারে, কিন্তু মিসরে এটি এখনও পরিষ্কার নয়, সে অভ্যুত্থান অস্ত্রের পরিবর্তে ব্যালটেরও হতে পারে কিনা। বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার জন্য কৌতূহলী পর্যবেক্ষকদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
(মিসরের বর্তমান পরিস্থিতি কি বিশ্ববাসী তা জানতে আগ্রহী। এর কারণ মিসর বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্থান। আর তাই মিসরে কি হচ্ছে এবং হতে যাচ্ছে তা জানা প্রয়োজন। এই লেখাটি সেই বিবেচনা রেখেই পূনপ্রকাশ করা হলো)
# এম আবদুল হাফিজ : নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

Advertisements
Loading...