রাজধানীতে বাহারি ইফতারি ॥ এবারের নতুন আইটেম ‘আনাম খাসি’ টারকি বিফ

ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ ‘ইফতারের সময় চোখ পড়ে থাকত সিতারা মসজিদের বারান্দায়। শুধু মনে হতো ওই মুড়ি, ফুল্লুরি, দোভাজা, ছোলা আর বেগুনি মেশানো খাবারটা যেন রূপকথার দেশ থেকে এসেছে।’ কবি শামসুর রাহমানের বর্ণনার সেই দৃশ্য শুধু পুরনো ঢাকার সিতারা মসজিদেই সীমাবদ্ধ নয়, ঢাকার প্রতিটি অলিগলিতে ফুটে উঠেছে একই চিত্র। মুড়ি, ফুল্লুরি, দোভাজা, ছোলা, বেগুনির সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে আনাম খাসি, টারকি বিফ, কাশ্মীরি শরবত, অ্যারাবিয়ান কাবাবসহ আরও কত কি!

প্রতিবছরের মতো এবারের রমজানেও দুপুরের পর থেকেই ইফতারকে ঘিরে সরগরম হয়ে উঠছে ঢাকা মহানগরী। মাথায় টুপি লাগিয়ে ইফতার বিক্রেতারা পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। বেলা যতই গড়ায়, ততই বাড়ে ক্রেতার সমাগম। কি ফুটপাত, কি পাঁচতারা রেস্টুরেন্ট, পাড়া-মহল্লার গলিপথেও ইফতারির ছোট-বড় দোকান। কোথাও কোথাও রাস্তা দখল করে বসানো হয়েছে ইফতারির দোকান। বিভিন্ন রঙের সামিয়ানা, বাঁশ আর টেবিল বসিয়ে পুরো ফুটপাত দখলে নিয়েছে ব্যবসায়ীরা। সর্বত্রই ক্রেতাদের আকর্ষণে চলছে বাহারি রঙ, আর স্বাদের ইফতারি আইটেম তৈরির প্রতিযোগিতা। দুপুর থেকে ইফতারির আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পুরো রাজধানী এক ব্যস্ত ইফতারের নগরীতে পরিণত হয়।

দুপুরের পর চকবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বেলা ৩টা থেকেই জমে উঠেছে চকবাজারের ইফতারি বাজার। পুরান ঢাকার বাহারি ইফতারের গন্ধ যেন ক্রেতাদের আরও বেশি করে ইফতারের আইটেম কিনতে বাধ্য করছে। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে ছুটে এসেছেন ভোজন রসিকরা। উত্তরা, ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকা অনেকেই ইফতারি কিনতে। তারা জানালেন টানা কয়েক বছর ধরে প্রথম রোজাসহ প্রায় রোজাতে চকবাজার থেকে ইফতার কিনে নিয়ে যান। চকের ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’, দই বড়াসহ অনেক খাবারের লোভেই নতুন ঢাকার খাদ্য রসিকরাও ছুটে আসেন পুরান ঢাকার ইফতারি বাজারে। মিরপুর থেকে আসা এক ব্যাংকের কর্মকর্তা এ খাবারটি কেনার পর বলেন, ‘শখের দাম আশি তোলা! দাম যাই হোক, বিষয় না।’ চকের ইফতারের মধ্যে সেলিম বাবুর্চির রয়েছে দীর্ঘদিনের সুনাম। দূর-দূরান্ত থেকে সেলিম বাবুর্চির ইফতার নিতে ছুটে আসেন ক্রেতারা। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। সেলিম বাবুর্চি জানান, এবার নতুন আইটেম হিসেবে তিনি এনেছেন বড় সাইজের আস্ত মুরগির রোস্ট। এর প্রতিটির দাম রাখা হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা।এছাড়া তার আরেকটি নতুন মুঘল আইটেম ‘আনাম খাসি’ ছোট আকারের আস্ত খাসির রোস্ট। দাম সাড়ে ৪ হাজার টাকা। অন্যান্য আইটেমের মধ্যে তিনি বিক্রি করছেন কোয়েল পাখির রোস্ট প্রতি পিস ৮০-১০০ টাকা এবং চিংড়ি প্রতি পিস ২০০-২৫০ টাকা।

এবার চকের ইফতারি বাজারে ‘ডিসেন্ট’ এনেছে বেশ কিছু সুস্বাদু খাবার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- শাহি হালিম যার প্রতিটি বড় হাঁড়ি ৩০০ ও ছোট হাঁড়ি ১২০ টাকা। ডিসেন্ট আরও বিক্রি করছে টারকি বিফ ২০০, কাশ্মীরি শরবত লিটার ২০০, নিমকপাড়া প্রতি পিস ২০, মুঠি কাবাব প্রতিটি ২০ ও অ্যারাবিয়ান কাবাব প্রতিটি ৮০ টাকা। চকে বিক্রি হচ্ছে আবদুল জব্বারের বিখ্যাত শাহী দইবড়া। ২০টি দইবড়ার বাটি বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।

চকবাজারের মজাদার অন্যান্য আইটেমের মধ্যে আরও রয়েছে ডিম চপ পিস ১৫, কচুরি এক কুড়ি ৩৫, ফুল্লুরি পিস ২, সমুচা পিস ৫-১০, পনির সমুচা পিস ৫, পেঁয়াজু পিস ৪-৫, আলুর চপ পিস ৫, বেগুনি পিস ৪-৫, চানাবুট কেজি ১৩০, ডাবলি কেজি ৫০, মুরগির রোস্ট পিস ১৫০-১৮০, খাসির পায়ের রোস্ট পিস ৩০০-৩৫০ ও সাসলিক পিস ৩০ টাকা। এছাড়া ইফতারের অন্যতম আইটেম খেজুরের প্রতি প্যাকেট এ বছর ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চকবাজারের পাশাপাশি ধানমণ্ডির স্টার কাবাব, লাজিজ, এইচএফসি, ফখরুদ্দীন, পিন্টু মিয়ার শাহী ইফতারি, কলাবাগানের মামা হালিম, হটহাট, অলিম্পিয়া প্যালেস, আম্বালা, খাজানাসহ অন্য রেস্তোরাঁগুলোতে জমজমাট বেচাকেনা লক্ষ্য করা যায়। মামা হালিমের স্বত্তাধিকারী মনু মিয়া জানালেন, অন্যবারের মতো এবারও মানুষে ভীড় আছে হালিম কেনার জন্য। এছাড়া বেইলি রোড, গুলশান, মিরপুরেও ইফতারির বাজার বেশ জমেছে। উচ্চবিত্তদের অনেকেই অবশ্য পাঁচ তারকা হোটেল সোনারগাঁও, রূপসী বাংলা (শেরাটন), ওয়েস্টিন ও র‌্যাডিসনের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। অন্যান্য স্থানের মতো রোজায় রাজধানী ঢাকার মসজিদগুলোর দৃশ্যপটও বদলে গেছে। দুপুরের পরই রাজধানীর মসজিদের বারান্দায় বারান্দায় ইফতারের প্রস্তুতি চলেছে। মসজিদের মুয়াজ্জিন ও সেবকদের (খাদেম) ইফতার নিয়ে ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো।

তবে ইফতারির এই দৃশ্য খুবই চমৎকার একটি দৃশ্য। মসজিদে মসজিদে সবাই একসঙ্গে ইফতারির জন্য বসেন সেই দৃশ্য দেখে সবাই মোহিত হয়। অনেক সময় বিধর্মীদের মধ্যেও বলতে শোনা যায়, ‘এতো হৃর্দ্যতা ও সৌহার্দের বন্ধন আর কোন ধর্মে নেই!’

Advertisements
Loading...