মেয়াদোত্তীর্ণ নৌযান চলছে ঝুঁকি নিয়ে ॥ ঈদে যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে পারবে এসব নৌযান?

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ সামনেই ঈদ। মানুষের প্রচন্ড চাপের কারণে ঘটবে লঞ্চডুবির ঘটনা। অথচ তারপরও ঝুঁকি নিয়ে চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ নৌযান । অনেক সময় মাঝপথে গিয়ে হচ্ছে বিকল। কিন্তু তারপরও দেখার কেও নেই।

ঈদ আসলে ঘটে লঞ্চডুবির ঘটনা। তখন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি বলে, লঞ্চের মেয়াদ ছিলনা, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝায় করা হয়েছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তারপরও নৌপথে দেদারসে চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ নৌযান। ঘটছে দুর্ঘটনা। কিন্তু এর স্থায়ী কোন প্রতিকার হচ্ছে না।

জানা যায়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) নিয়ন্ত্রণাধীন নৌযান সার্ভিসের বেহাল দশা। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর অব্যবস্থাপনায় সরকারি এ সংস্থাটির সেবার মান একেবারেই শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। ১৯৭টি নৌযানের (যাত্রীবাহী, পণ্যবাহী ও ফেরি) প্রায় সবই মেয়াদোত্তীর্ণ। মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এসব নৌযানের মধ্যে ঢাকা-বরিশাল রুটে চারটিসহ ১৫৭টি নৌযান উপকূলীয় এলাকাসহ বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। ৪০টি গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ঘাটে বাঁধা রয়েছে। ঢাকা-বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী নৌযানগুলো প্রায়ই গন্তব্যের মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ছে। ফলে উপকূলীয় এলাকায় চলাচলরত নৌযানে যাত্রীর সংখ্যা একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-বরিশাল-খুলনা রুট লাভজনক হলেও বেসরকারি জাহাজ মালিকদের সঙ্গে কারসাজি করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে কয়েক বছর আগে। ঢাকা-বরিশাল-খুলনা রুটও সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে দুই বছর আগে। সংকুচিত ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলরত বিআইডব্লিউটিসির জনপ্রিয় স্টিমার সার্ভিসে যাত্রীসংখ্যা ও পণ্য পরিবহন বাড়লেও প্রতিটি জাহাজে ট্রিপে ট্রিপে লোকসান দেখানো হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা-বরিশাল রুটে জোড়াতালি দিয়ে চলছে চারটি স্টিমার। এ স্টিমার চারটিও যত্রতত্র বিকল হয়ে পড়ছে। এসব জাহাজ মেরামতের নামে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদেশবলে দি ইস্ট পাকিস্তান শিপিং কর্পোরেশন ও ৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৬০৮টি নৌযান নিয়ে বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) গঠন করা হয়। ১৯৭২-৭৩ সালে তৎকালীন সরকার আরও ২৬১টি নৌযান সংগ্রহ করে। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ক্ষমতার শেষ সময়ে ৪টি সি ট্রাক, ২টি রো রো ফেরি এবং একটি উপকূলীয় যাত্রীবাহী জাহাজ সংগ্রহ করে। এরপর থেকে ২০০৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে ৬৪৮টি নৌযান বিক্রি করে দেয়া হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীবাহী নৌযানের সংখ্যা কমে যায়। বন্ধ করে দেয়া হয় অনেক রুট। বিআইডব্লিউটিসি’র নৌযান বহরের সবচেয়ে বড় রুট হচ্ছে ঢাকা-বরিশাল রুট। এই রুটে চারটি স্টিমার চলাচল করছে। প্রায় ৮০ বছরের পুরনো এ স্টিমার চারটি আধুনিকায়ন না করায় প্রায়ই গন্তব্যের মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ে। অতি পুরনো এ স্টিমারগুলো প্রায়ই পথিমধ্যে অকেজো হয়ে পড়ছে। ফলে যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া এসব স্টিমারে আধুনিক ও দ্রুতগতির জলযানের দাপটে এখন অচল প্রায়। অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে ঢাকা- বরিশাল রুটের এ স্টিমারগুলো লোকসান গুনতে গুনতে এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জানা গেছে, এসব স্টিমারে নেই কোন নিরাপত্তা সরঞ্জাম। লাখ লাখ টাকা খরচ করে রেডিও টেলিফোন (আরটি) বসানো হলেও বেশিরভাগ সময় তা অচল থাকে। রাডার জিপিএস ও ইকো-সাউন্ডিং না থাকায় স্টিমার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের এসব নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। সূত্রমতে, ব্রিটিশ শাসনামলে এ চারটি রকেট স্টিমার ভারতের আসাম, হলদিয়া ও দৌলতদিয়া রুটে চলাচল করত। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর স্টিমারগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় পাকিস্তান রিভার স্টিমার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার পর এগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে বিআইডব্লিউটিসি। ১৯৭২ থেকে স্টিমার চারটি ঢাকা-বরিশাল-খুলনা রুটে চলাচল করে আসছে। বেলজিয়াম থেকে আনা শক্তিশালী ইঞ্জিন থাকার কারণে স্টিমার চারটি একটানা ২৭ ঘণ্টা চলতে পারে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও দুই নম্বর সংকেতের মধ্যেও এগুলো চলাচল করতে পারে। একমাত্র যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া স্টিমারগুলোর দুর্ঘটনায় পড়ার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই। স্টিমার চারটির মধ্যে পিএস মাহমুদ ও পিএস অস্ট্রিচ তৈরি হয় ১৯২৯ সালে। পিএস লেপচা, পিএস টার্ন নির্মিত হয় যথাক্রমে ১৯৩৮ ও ১৯৫০ সালে। এগুলো নির্মাণ করা হয় কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে। স্টিমারগুলো শুরুতে কয়লা ও বাষ্পীয় ইঞ্জিনে চালানো হতো। পরে এগুলোতে ডিজেল ইঞ্জিন বসানো হয়।

বিআইডব্লিউটিসি’র একটি সূত্র জানায়, যে কোন জাহাজের সামান্যতম মেরামতের প্রয়োজন হলেও সেটি নারায়ণগঞ্জ ডকে নিয়ে আসতে হয়। নির্দেশ রয়েছে নারায়ণগঞ্জ ডকে না আসা পর্যন্ত জাহাজের মেরামত করা যাবে না। ফলে সামান্যতম ক্ষতি হলে তা মেরামত করতে এক মাসেরও বেশি সময় লেগে যায় এবং খরচও বেশি হয়।

আর এভাবেই জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে স্টীমারগুলো। বেসরকারি পর্যায়ে যে সব লঞ্চ চলছে সেগুলোও নিয়ন্ত্রণ ঠিকমতো হচ্ছে না বলে জানা গেছে। কারণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও কেনো এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখা দরকার। যাতে করে আর কোন সাধারণ মানুষের জীবন সংহার করতে না পারে সে জন্য জরুরি ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞ মহলের মত।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...