ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তি ॥ সবকিছু ভেবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশকে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ট্রানজিট নিয়ে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের দর কষাকষি চলছে। ট্রানজিট নিয়ে দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চলছে নানা কথা। কেও এর পক্ষে আবার কেও এর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এভাবেই চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই ট্রানজিট নিয়ে বেশ অগ্রগতি হয়। কিন্তু ৫ বছর পর যখন আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসে তখন ট্রানজিট ইস্যুটি আবার থেমে যায়। আমরা বিশ্বাস করি আওয়ামীলীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো। আর তাই আওয়ামীলীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন ভারতের সঙ্গে অমিমাংসিত বিষয়গুলো স্বভাবতই সামনে চলে আসে। আমাদেরও তাই ধারণা আওয়ামীলীগ এখন ক্ষমতায় আছেন তাই ভারতের সঙ্গে যেসব অমিমাংসিত বিষয় রয়েছে সেগুলোর মিমাংসা করা জরুরি। তবে সকল বিষয়ে দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিলে হবে না। চুক্তি করতে হলে কোন কোন পক্ষকে একটু বেশি ছাড় দেওয়া লাগে এটা যেমন ঠিক, পাশাপাশি উভয় পক্ষকেই খেয়াল রাখা দরকার দুদেশ পাশাপাশি এবং বাংলাদেশের জন্মের সময় ভারতের যে প্রশংসনীয় ভূমিকা ছিল তা যেন আজও অব্যাহত থাকে। আর এই মনোভাব নিয়ে এগিয়ে গেলে অবশ্যই সমস্যার সমাধান করা কোন কঠিন কিছু নয়।

ট্রানজিট নিয়ে দৈনিক যুগান্তরে হেলাল উদ্দিন তার এক নিবন্ধে লিখেছেন, মেয়াদি না অনির্দিষ্ট মেয়াদের ট্রানজিট- এ নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চিরস্থায়ী ছাড়া নবায়নযোগ্য ট্রানজিটে প্রবল আপত্তি আছে। রাজনৈতিক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলে পরে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এ দাবি নিয়ে সরকারের প্রবল আপত্তি আছে। বিশ্বের কোথাও অনন্তকাল সময়ের জন্য ট্রানজিট ব্যবস্থা চালু নেই। দেশের সার্বভৌমত্বের জন্যও তা ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ এখনই ভারতকে এ সুযোগ দিতে চায় না। প্রথমে ৫ বা সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির পর পর্যায়ক্রমে মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা। সবকিছুই নির্ভর করছে বাংলাদেশের সমস্যা নিয়ে ভারতের আন্তরিকতা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের ওপর। তবে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান ভারতের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। এ সম্পর্কিত এক পত্রে তিনি লিখিত মত প্রকাশ করেছেন, ‘মেয়াদি ট্রানজিট অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে না এবং তা প্রয়োজনীয় বিনিয়োগেরও অনুকূল নয়’।

এদিকে ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির আসন্ন ঢাকা সফরকালে এ বিষয়টি আলোচনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ সরকারও চায় দ্রুত ট্রানজিট কার্যকর করতে। কিন্তু এজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রস্তুতি সম্পন্ন করে একটু ধীরগতিতে এগোতে চাইছেন নীতিনির্ধারকরা। এ ধরনের চুক্তিতে জনমত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে সে বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান ৭ ফেব্রুয়ারি এক প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আওতায় আশুগঞ্জ নদী বন্দর এবং আখাউড়া সীমান্তে শুল্ক ও বহিরাগমন অফিস পরিদর্শন শেষে তিনি ট্রানজিট কার্যকরের স্বার্থে বন্দর, রেল ও সড়ক- এ তিনটি খাতে একীভূত উন্নয়ন কার্যক্রম শুরুর সুপারিশ করেন। এজন্য তার প্রস্তাবে ৮ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাণিজ্য, নৌপরিবহন, রেল ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ছাড়াও কমিটিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিনিধি থাকবেন। জানা গেছে, চার মাসের মধ্যে কমিটির সুপারিশের পর ট্রানজিট সংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে সহজ সুদে অর্থ সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা করবে সরকার।

এদিকে আশুগঞ্জ বন্দর ও আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর কোন ট্রায়াল রান চালানো যাবে না- এ সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। নৌপরিবহন সচিবের সভাপতিত্বে অক্টোবরে অনুষ্ঠিত ট্রানজিট/ট্রান্সশিপমেন্ট সংক্রান্ত উচ্চ পর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সর্বসম্মতভাবে ‘ভারতীয় পণ্যবাহী যান বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আর পরীক্ষামূলকভাবে চালান যাবে না’- এ সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী এবং ড. মশিউর রহমান এ সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। আপাতত ট্রান্সশিপমেন্টের আরও দুটি ট্রায়াল হবে এবং ভারতীয় পণ্যবাহী যান দু’বার পণ্য ত্রিপুরায় পাঠাতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তারা। এরপর পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট শুরু হবে। এদিকে ট্রায়াল রান পরিচালনার অভিজ্ঞতা হতে নিয়মিত ট্রানজিট পরিচালনায় সমস্যা চিহ্নিত করা হচ্ছে। ছয় মাসের মধ্যে দু’দেশের সহায়তায় তা সমাধানের প্রক্রিয়া চলছে। দু’দেশের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকেই পুরোপুরি পণ্য পরিবহন চায় ভারত। এর আগে অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুতগতিতে শুরু হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি সূত্র জানান, দ্রুত ট্রানজিট কার্যক্রম শুরুর জন্য ভারতের পক্ষ থেকে অব্যাহত চাপ রয়েছে।

এদিকে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট নিয়ে ড. মশিউরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশুগঞ্জ নৌবন্দরের অবকাঠামো দেশী ও ভারতীয় জাহাজের নোঙর ও অন্যান্য সেবার জন্য অপর্যাপ্ত। ট্রানজিট ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হলে ভারতীয় পণ্য পরিবহন বাড়বে। পর্যায়ক্রমে অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। ট্রানজিট প্রসঙ্গে তিনি জানান, বর্তমানে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নবায়নযোগ্য ট্রানজিট চুক্তি হয়। বিভিন্ন দলীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বা নীতির পার্থক্য সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য মেয়াদি ট্রানজিট ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। এ ব্যবস্থা অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে না এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অনুকূল নয়। তাছাড়া ট্রানজিটের জন্য আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার আরও তিনটি পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এগুলো হচ্ছে ভারতীয় মালামালের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার; আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কের পরিবহন ক্ষমতা এবং চট্টগ্রাম বা মংলা থেকে ট্রেন বা নদীপথে ভারতীয় পণ্য আশুগঞ্জ বা ত্রিপুরা রাজ্যে পাঠানো।

ভারতীয় যান চলাচলের উপযুক্ত করে বাংলাদেশের সড়ক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. মশিউরের প্রস্তাব হচ্ছে- আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কটি সংকীর্ণ, ভারতীয় ভারি ট্রাক চলাচল এবং আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের জন্য খুবই অপর্যাপ্ত। সড়কটি সেতু সম্প্রসারণসহ দুই লাইনে উন্নীত করা এবং পণ্যবাহী ভারি যানের উপযোগী করে আরও মজবুত করা দরকার। চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে ভারতীয় মালামাল আনার ব্যবস্থা দরকার হবে। বিদ্যমান রেল সীমিত প্রয়োজন মেটাতে পারবে। কিন্তু ট্রানজিট বাড়লে ডাবল লাইনের প্রয়োজন হবে।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের অর্থায়ন সম্পর্কে উপদেষ্টা জানান, উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য এডিবি ও বিশ্বব্যাংক অর্থ সহায়তা দেয়। বাংলাদেশের জন্য এ দুটি সংস্থা নমনীয় শর্তে সহায়তা দেবে। ঋণের পরিমাণ বেশি হলে এডিবি অর্ডিনারি ক্যাপিটাল রিসোর্স থেকে ঋণ দেয়। যার সার্ভিস চার্জ ও সুদের হার বেশি। বিশ্বব্যাংকও উপ-আঞ্চলিক সহায়তায় অংশ নিতে আগ্রহী। কিন্তু এ পর্যন্ত কোন প্রকল্পে অংশ নেয়নি। ইআরডি উভয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রসঙ্গটি তুলতে পারে। পরবর্তীতে কমিটির রিপোর্ট বিবেচনার পর বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করা যেতে পারে।

সব কথার শেষ কথা ভারত আমাদের ট্রানজিট নিবে এটা ভালো কথা। কিন্তু ভারতের সামপ্রতিক টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে আমাদের সঙ্গে যেসব আচরণ করলো এবং ফারাক্কার পানি নিয়ে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারত যে ধরণের আচরণ করছে তাতে ট্রানজিট চুক্তি নিয়ে ভালোভাবে ভেবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাছাড়া ভারত সমপ্রতি সীমান্তে যেভাবে বাংলাদেশের নাগরিকদের হত্যা করছে তাতে ভারতের সঙ্গে কোন চুক্তি করতে হলে সববিষয়গুলোর সুরাহা আগে দরকার।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...