নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করলেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে

অভয় প্রকাশ চাকমা ॥ বর্তমান সরকারের সবচেয়ে আলোচনার বিষয় পদ্মা সেতু। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থাকায় সরকার গঠনের পর পরই প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু নির্মাণের তহবিল জোগাড়ে মনোনিবেশ করেন। বিশ্বব্যাংকসহ চারটি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে ২০১১ সালে সরকার সেতু নির্মাণের জন্য ঋণচুক্তি করে। লিড ডোনার বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগে চুক্তি স্থগিত করলে সৃষ্টি হয় সমস্যা। শেষ পর্যন্ত ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক চুক্তি বাতিল করায় দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় বয়ে চলেছে।

গত ৮ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশনের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী তার সমাপনী বক্তব্যে পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। তিনি পদ্মা সেতুর বিষয়ে কোন দুর্নীতি হয়নি দাবি করে প্রকারান্তরে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ করেন। অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন নয়।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, তাদের হাতে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক বিষয় হচ্ছে সেই প্রমাণ তারা প্রকাশ করেনি। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বিশ্বব্যাংক সাবেক প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষের একদিন আগে অপ্রত্যাশিতভাবে চুক্তি বাতিল করেছে। চুক্তির বর্ধিত মেয়াদ ছিল ২৮ জুলাই পর্যন্ত। চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা না করে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে চুক্তি বাতিল করায় বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাছাড়া অন্য আরও তিন উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে কোন আলোচনা ব্যতিরেকে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে চুক্তি বাতিল করাও সমীচীন হয়নি। আর বিশ্বব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন খতিয়ে না দেখে সরকার কিভাবে পদক্ষেপ নেবে? প্রতিবেদনের বিষয়ে দুদক কর্তৃক তদন্তকালীন সরকারকে না জানিয়ে হঠাৎ চুক্তি বাতিল করায় বিশ্বব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যেখানে কোন টাকা দেয়া হয়নি সেখানে দুর্নীতি হয় কিভাবে? তবে বিশ্বব্যাংক টাকা খাওয়ার কোন অভিযোগ করেনি, করেছে ঘুষ চাওয়ার। ঘুষ চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই, উভয়ই দুর্নীতি। তদন্ত করতে হবে এই প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট কেউ আসলেই ঘুষ চেয়েছে কিনা। বিশ্বব্যাংক যেভাবে প্রমাণ পেয়েছে তা খতিয়ে দেখা দরকার এবং সত্যি হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আর সত্য না হলে তখন বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে।

বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে দেখা গেছে, কোন কেলেংকারির অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত ব্যক্তি পদত্যাগ করেন। অপরাধ না করে থাকলে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে স্বমহিমায় ফিরে আসেন। কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকলে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নেয়া হয়, বিচারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুসারে শাস্তি দেয়া হয়। নাশকতা ঘটানোর আগে যেমন পরিকল্পনাকারীদের পাকড়াও করা হয়, তেমনি দুর্নীতি করার পরিকল্পনার প্রমাণ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দুর্নীতি হতো, তা নিশ্চিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের, বিশেষ করে মন্ত্রীর উচিত ছিল পদত্যাগ করা। কিন্তু তিনি নিজেকে ‘আই আ্যাম টোটালি অনেস্ট’ ঘোষণা করে পদ ছাড়েননি। তাকে সরালেও আরেকটি মন্ত্রণালয়ে নেয়া হয়েছে, তাও বেশ দেরিতে। বিরোধী দল তো বটেই, সাধারণ মানুষ থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কারও কাছ থেকে মন্ত্রী আবুল হোসেনের বর্তমান অবস্থানকে সমর্থন করতে শোনা যায় না। বোঝা যায় তার খুঁটির জোর বেশ শক্ত। দেশের প্রায় সবাই বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতু নির্মাণের ঋণচুক্তি বাতিল হওয়ায় তাকে এবং তার মালিকানাধীন ‘সাকো ইন্টারন্যাশনাল’ সংস্থাকে দায়ী করে থাকেন। খুঁটির জোর শক্ত হলেও বৃহত্তর স্বার্থে তার মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করা উচিত বলে সবাই মনে করেন।

বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন গত এপ্রিলে এক বিবৃতি দিয়েছিলেন। বিবৃতিতে জানা যায়, তারা সেপ্টেম্বর থেকে দুর্নীতির তথ্য সরকারকে সরবরাহ করে আসছে। বলা হয়েছে, সাকোকে নির্দিষ্ট কমিশন দেয়া হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি পাইয়ে দেয়ার ব্যাপারে সৈয়দ আবুল হোসেন সাহায্য করবেন। নাম গোপন রাখার শর্তে সাকোরই এক প্রতিনিধি বিশ্বব্যাংককে জানিয়েছেন, সেতুর মূল অংশের যে চুক্তিমূল্য হবে তার একটি নির্দিষ্ট অংশ সাকোর জন্য রাখার ব্যাপারে সৈয়দ আবুল হোসেনের নির্দেশনা ছিল। অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর।
অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা হোক, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে পদ্মা সেতু নির্মাণ নিশ্চিত করতে বৃহত্তর স্বার্থে অভিযুক্ত সৈয়দ আবুল হোসেনের তৎক্ষণাৎ পদত্যাগ করা উচিত ছিল। তখন তিনি পদত্যাগ করলে অভিযোগ আমলে নেয়ায় বিশ্বব্যাংকের ক্ষোভ প্রশমিত হতো এবং আর অভিযোগ করতে পারত না। এর দায় মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এড়াবেন কী করে জানি না। সামান্য ৭০ লাখ টাকার কেলেংকারিতে তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পদত্যাগ করতে পারলে আবুল হোসেন কেন পারলেন না, বোধগম্য নয়।

আরেক উন্নয়ন সহযোগী জাইকা এখনও চুক্তি থেকে সরে যায়নি বটে, কিন্তু সংস্থাটির বাংলাদেশ কার্যালয়ের সিনিয়র প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দুর্নীতির বিষয়ে সরকারের কী পদক্ষেপ সেদিকে তারা গভীরভাবে নজর রাখছেন। অর্থাৎ দুর্নীতির ব্যাপারে এখনও কোন পদক্ষেপ নেয়া না হলে চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে জাইকা। দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে এ কলঙ্ক যেমন অনন্তকাল আওয়ামী লীগকে বইতে হবে, তেমনি শুধু আন্তর্জাতিক বা বিদেশি ডোনার নয়, দেশের বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও টাকা দিতে সন্দেহ বোধ থাকবে।
পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ব্যাপারে সরকার কোন ব্যবস্থা না নিলে কোন ডোনার আসবে বলে মনে হয় না। তবে কারও কাছে ধরনা না দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কেবিনেট মিটিংয়েও নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ করলেও পদ্মা সেতুর বহুল আলোচিত দুর্নীতি চাপা পড়বে না, যদি না ওই বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়।
নিজস্ব অর্থে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হলেও অসম্ভব নয় এবং তা করতেই হবে। এতে সামষ্টিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা ঠিক আছে। কিন্তু সেতু নির্মাণ হলে টোল আদায়ের মাধ্যমে তা পূরণ করা সম্ভব, আর সেতু থাকায় পরিবহন খরচ কমে গিয়ে দেশের ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোন সংস্থা থেকে ঋণ নিলে (সহজ শর্তে হলেও) সুদসহ নির্ধারিত সময়ে ফেরত দিতে হবে। দেশে অনেক অলস টাকা পড়ে থাকে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) এগার হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করবে বলেও এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মালয়েশিয়ার সঙ্গে গত ১০ এপ্রিল সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, ২৮ জুন মালয়েশিয়ার ১৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রকল্পের প্রস্তাব যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের হাতে তুলে দিয়েছে। তাদের ঋণের শর্ত কঠিন হলে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের আংশিক পরিমাণ নেয়া যায় কিনা তাও চেষ্টা করা যায়।

দুর্নীতির বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে এখনও জাইকা ও আইডিবি চুক্তি থেকে সরে যাবে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে তাদের ঋণের পরিমাণও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বাকি অর্থ নিজস্ব তহবিল গঠন করে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অনেক সহজ হবে।

জাতীয় স্বার্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল বিএনপির পারফরম্যান্স একটুও ইতিবাচক নয়। তাদের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করায় তারা খুব খুশি। সেতু নির্মাণের চেয়ে সরকারকে দুর্নীতিবাজ বলার আগ্রহ বেশি তাদের। জাতির এ সংকটে তাদের গঠনমূলক ভূমিকা দেশবাসী আশা করে।
পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার কোন কমতি নেই। কোন ডোনার এগিয়ে না এলে নিজস্ব অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। দেশবাসীও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান মেয়াদেই তিনি নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারবেন এবং আগামী মেয়াদে সরকার গঠন করতে পারলে সেতু প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন করতে পারবেন তাতে সন্দেহ নেই। তবে দেশ ও দলের স্বার্থে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে। অন্যথায় আওয়ামী লীগের এ কলংক মোচন হবে না।

# অভয় প্রকাশ চাকমা, কলাম লেখক

* (পদ্মা সেতু আমাদের জাতির একটি বড় স্বপ্ন পূরণের সেতু। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও অনেকটা নির্ভর করছে এই সেতুর ওপর। তাই এই সেতু আমাদের জন্য একটি এসেট। তাই বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করলেও সরকার এই বৃহৎ সেতু বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। আমরা এ জন্য বর্তমান সরকারকে সাধুবাদ জানাই। তবে যে অভিযোগগুলো উঠেছে তার প্রকৃত সত্যটি জনসমক্ষে আসা জরুরি। কারণ এটি যেমন দেশের মান-মর্যাদার বিষয় তেমনি বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের পেষ্টিজের বিষয়। এসব নানা বিবেচনায় দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশি অভয় প্রকাশ চাকমার এই লেখাটি প্রকাশ করা হলো।)

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...