সন্ত্রাসীদের ছাড় দিলে পুরো জাতিকেই এর মাশুল গুণতে হবে ॥ জামিনে মুক্তি পেয়েই কার্যক্রম চালাচ্ছে হিজবুত সদস্যরা!

ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হিজবুত সদস্যরা জামিনে মুক্তি পেয়েই আবার তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। অথচ এসব সন্ত্রাসীদের ছাড় দিলে পুরো জাতিকেই এর মাশুল গুণতে হবে।

আইন তার নিজ গতিতেই চলবে, আর এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু যখন বড় বড় সন্ত্রাসীরা আইনের ফাঁক-ফোঁকর গলিয়ে বেরিয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ চিন্তিত না হয়ে পারে না। অনেক সন্ত্রাসীই পুলিশের কাছে ধরা পড়ছে কিন্তু আদালতে গিয়ে কৌশলে জামিন নিয়ে আবারও জড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। সম্প্রতি বেশ কিছু নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে জামিনে বেরিয়েই ঠিকানা পরিবর্তন করে নতুন উদ্যমে সংগঠনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে হিজবুত তাহরির সদস্যরা।

অপর দিকে অন্য ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েও কেও কেও নিজের পরিচয় বদলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু গোপনে তারা হিজবুত তাহরিরের পক্ষেই প্রচারণা চালাচ্ছে। এ নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থা ১০৯ জনের তালিকা দিয়ে তাদের স্থায়ী ঠিকানায় যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলেও প্রতিবেদন দিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাটি প্রতিবেদন দেয়ার পরই আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা নড়েচড়ে উঠেছে। নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরির সম্পর্কে তৎপর হতে নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিটগুলোকেও নির্দেশ দিয়েছে তারা। এরপরই ১৩ আগস্ট রাজধানীর পান্থপথের আসিয়ানা নামের একটি রেস্তোরাঁ থেকে গোপন শলাপরামর্শ করার অভিযোগে হিজবুত তাহরির সদস্য সন্দেহে ৩৫ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে সংগঠনটির বিপুল পরিমাণ বই ও লিফলেটসহ কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের বেশির ভাগই ছাত্র। এ ছাড়াও পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দারা হিজবুত তাহরিরের শতাধিক মহিলা সদস্যকে গ্রেফতারের জন্য খুঁজছে। তারাও শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাদের গ্রেফতার অভিযানে সময় নিচ্ছেন আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েই তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

গোয়েন্দারা জানান, রাজধানীর কমপক্ষে ২৫টি স্থানে বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় কিছু সময়ের জন্য মিলিত হয়ে শলাপরামর্শ করে দ্রুত সটকে পড়েন হিজবুত তাহরির সদস্যরা। গ্রেফতার হওয়া হিজবুত তাহরিরের অনেক সদস্য পুলিশ ও র‌্যাবকে এমনই তথ্য দিয়েছে। সংগঠন পরিচালনায় জড়িত কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নামও জানিয়েছে তারা। ইদানীং তারা খুব ঘন ঘন তাদের স্থান পরিবর্তন করছে। যাতে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের চোখকে ফাঁকি দেয়া যায়।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক এম সোহায়েল বলেন, বর্তমানে ভর্তি পরীক্ষার মৌসুম চলছে। অনেক শিক্ষার্থী কোচিং করতে ঢাকায় আসছেন। বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হিজবুত তাহরিরের সদস্যরা তাদের দলে ভিড়তে ওইসব শিক্ষার্থীকে উদ্বুদ্ধ করে। অথচ তাদের অনেকেরই বাবা-মা জানেন না, ছেলে নিষিদ্ধ সংগঠনে জড়িয়ে পড়ছে। ২০০৯ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর থেকে হিজবুত তাহরির সংগঠনটির সদস্যদের গ্রেফতার অব্যাহত থাকলেও তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায়নি বলেও গোয়েন্দারা স্বীকার করেন।

ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার টানকাতলা গ্রামের সেন ফকিরবাড়ির মোহাম্মদ আলীর ছেলে আনিছুর রহমান সাকির থাকতেন রাজধানীর দক্ষিণখান ২৯৫ মধ্যফায়দাবাদ মোকাররম মসজিদ রোড হাজী আলী হোসেনের বাড়িতে। একই সঙ্গে থাকত একই এলাকার এবিএম রায়হান সরকার, টাঙ্গাইল ঘাটাইলের মোঃ মোস্তফা মিয়া ও রাজবাড়ির ভবানীপুরের ইসমাইল শেখের ছেলে রাজু আহম্মেদ। ২০০৯ সালে গ্রেফতারের পর ২০১১ সালের শেষের দিকে জামিনে মুক্তি পায় তারা। এরপর তাদের আর কোন হদিস জানে না গোয়েন্দারা। তারা আগের মতোই নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত কিনা সেই তথ্যও নেই তাদের হাতে। একইভাবে চুয়াডাঙ্গার এমরানুল হক ওরফে রাজীব ওরফে মাইনুল, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর আবু বকর সিদ্দিক ওরফে আবু হানিফ থাকত ১১/সি রোড-১১, লেন-১৩, বাসা-০৬ পল্লবীর ঠিকানায়। গ্রেফতারের পর তারাও একই সময়ে জামিনে মুক্তি পেলেও ওই ঠিকানায় আর থাকছেন না। জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের সৈয়দ জিয়াউল ইসলাম সাতটি নামে পরিচিত গোয়েন্দা ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছে। একেক সময় একেক নাম ধারণ করে সংগঠনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। লিয়ন, রোকন, জিতু, উজ্জ্বল, হিমুসহ তার আরও নাম আছে। তার বাবার নাম আবদুর রহিম। রাজধানীর জুরাইন মিস্টার দোকান রোড সংলগ্ন আসাদ কাজলের বাড়িতে জিয়াউল থাকত। এখন সেখানে নেই। হিজবুত তাহরির ছাড়াও জিয়াউল, এমরান ও আবু বকর সিদ্দিক আগে জেএমবির সঙ্গে জড়িত ছিল। পরে হিজবুত তাহরিরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে বলেও গোয়েন্দারা জানান।
বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের আশিফ রহমান, চাঁদপুরের শেখ ওমর শরীফ রাসেল, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর আমিনুল ইসলাম বকুল ও আফজাল হোসেন, আবুল কাশেম, ভৈরবের সাইদুর রহমান রাজীব, কুষ্টিয়ার আনিছুর রহমান রুহুল, রাজধানীর বাড্ডার রাজীব, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর মাহবুবুল আলম, খুলনার আছাবুর রহমান রানা, ময়মনসিংহের ফুলপুরের সালাহ উদ্দিন, নান্দাইলের মোফাজ্জল হোসাইন, কোতোয়ালির আসওয়াদ উজ্জামান, নরসিংদীর শিবপুরের সাব্বির আহম্মেদ ভূঁইয়া ও মোঃ রোমান মিয়া, গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার এসএম আরাফাত, সিরাজগঞ্জের আসিফ ইকবাল, রাজধানীর উত্তরার একে ওয়ায়েজ মাহমুদ, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের তৌহিদুল আলম, চট্টগ্রামের সন্দীপের নূর উদ্দিন শিমুল, কুষ্টিয়া দৌলতপুরের ইফতেখারুল করিম, গোপালগঞ্জের এমএ সাইফুল ইসলাম, কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের মোঃ মহসিন হোসেন, পাবনার ঈশ্বরদীর জাকিরুল ইসলাম পরশ, ঝিনাইদহের ফাহাদ বিন রশিদ নয়ন, বি.বাড়িয়ার নবীনগরের মোঃ আবদুল হাই রাজু, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের এএইচএম শামসুদ্দোহা, রাজধানীর সূত্রাপুরের এহসান আহম্মেদ, সিরাজগঞ্জের চৌহালীর আনোয়ার হোসেন ওরফে বাতেন, লক্ষ্মীপুরের শরীফ শাহ মিরাজ, রামপঞ্জের মাহফুজুর রহমান, মোঃ মারুফ ইসলাম নাদিম ওরফে মোঃ ফারুক ইসলাম নাদিম, আবদুল্লাহ আল বারী, গাজীপুরের শ্রীপুরের মহিউদ্দিন আহম্মেদ রয়েল, বরিশালের হিজলার মাসুদ আলম, শরীয়তপুরের নড়িয়ার ফিরোজ আলম, টাঙ্গাইলের গোপালপুরের তৌহিদুর রহমান, হাজারীবাগের শিহাব, মিরপুরের নেয়ামত, আবদুল গণি, রাজশাহীর শামীম তালুকদার, বি.বাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের ফয়জুর রহমান টিপু, নবীনগরের বাকিবিল্লাহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের জামিলুর রহমান, ফেনীর সোনাগাজীর ফেরদৌস ওয়াহেদ প্রিন্স, সাতক্ষীরার দেবহাটের সালাহ উদ্দিন গাজী, কুমিল্লার দেবিদ্বারের সালাহউদ্দিন গাজী ও ফাহিম, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এসএম শামসুদ্দোহা, কুমিল্লার দাউদকান্দির নাজমুল হক, নরসিংদীর মনোহরদীর আলমগীর, তাজুল ইসলাম, খুলনার কয়রার ওবায়দুল্লাহ, বরিশালের হিজলার কামরুল ইসলাম, কালিহাতীর আমিরুল ইসলাম, বাগেরহাটের রামপালের সিরাজুল ইসলাম, কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের ইসমাইল, দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মোঃ রুস্তম আলী, টাঙ্গাইলের মধুপুরের হাবিবুর রহমান হাবিব, রাজধানীর দক্ষিণখানের জাকির হোসেন জিহাদী, নাজমুল হাসান সরকার তৌফিক, রাজবাড়ীর মোঃ রাকিব, মোঃ নুরুল ইসলাম, নীলফামারীর ডিমলার তানভীর আহম্মেদ, রাজধানীর আদাবরের মোঃ সোলায়মান, রাদি শফিক, মুন্সীগঞ্জের শহিদুল আমীন চৌধুরী, বগুড়ার সরিয়াকান্দির মোঃ রিশাদ খান, পিরোজপুরের জিয়ানগরের মুশফিকুল ইসলাম লিংকন, বরিশালের কোতোয়ালির আহম্মেদ হোসেন সাদী, মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ড. শেখ তৌফিক, বছিলার মাওলানা মোঃ ইদ্রিস আলী, রাজশাহীর চারঘাটের গোলাম মর্তুজা, মাগুরার শালিখার কাজী মোর্শেদুল হক প্লাবন, মাদারীপুরের রাজৈরের ফয়সাল, চুয়াডাঙ্গার শাহ আলিফ প্রিন্স ওরফে মঞ্জু, কুষ্টিয়ার তারেক আজিজ, ঠাকুরগাঁওয়ের সাইয়েদ পারভেজ সাঈদ, ঝালকাঠির সালাউদ্দিন খান পান্না, মুন্সীগঞ্জের জাহিদ হোসেন, মোঃ মহাসিন, মোঃ ইমান ইসলাম ওরফে মোঃ ইসনাত ইসলাম ওরফে শাহারুল ইসলাম, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের শাহাদাত হোসেন সায়মন, নেত্রকোনার মোঃ তাহমির আশরাফ, মাদারীপুরের মোঃ মাসুদ খান, শরীয়তপুরের ডামুড্ডার মোঃ আশিকুর রহমান আশিক, কুমিল্লার কোতোয়ালির আহম্মেদ হাসান ওরফে মজিদ, রাজধানীর লালবাগের আশিকুর রহমান, মগবাজারের সৈয়দ ইমদাদুল হক সৈকত, মতিঝিলের রাসেল, সবুজবাগের মোঃ জনি, ধানমণ্ডির মাহমুদুল বারি, রাজশাহীর রাজপাড়ার রাশেদুল ইসলাম রানা, ঝালকাঠির এম সায়েদুল ইসলাম, মানিকগঞ্জের তৌফিক আহাম্মদ ওরফে হাসান ওরফে রিফাদ, দিনাজপুরের কোতোয়ালির মাহামুদুল বারী, এসএম আশরাফুজ্জামান, নোয়াখালীর সেনবাগের মোঃ সাব্বির আহাম্মদ আকাশ, গাজীপুরের শ্রীপুরের এসএম আল আমিন ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার খালেদ জোবায়ের সিদ্দিক। তাদের নামের তালিকা দিয়ে তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ড ও অবস্থান নিশ্চিত হয়ে তাদের ওপর নজরদারির সুপারিশ করে গোয়েন্দা সংস্থাটি। গোপনে তারা কোন নাশকতার সঙ্গে জড়িত কিনা সেসবও খতিয়ে দেখতে বলেছে সংস্থাটি। তথ্য: দৈনিক যুগান্তর।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...