মেঘ তার বাবা মাকে খুঁজে বেড়ায়…

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যে শিশুটির বড় হওয়ার কথা বাবা-মাকে নিয়ে, সেই শিশুটি আজ খুঁজে ফিরছে তার বাবা-মাকে। মুখে সব সময় হয়তো কিছু বলছে না, কিন্তু তার নিস্তব্ধতা সকলকেই তা মনে করিয়ে দিচ্ছে। মানুষের জীবনে এর থেকে দুর্বিষহ জীবন কি আর হতে পারে। আজ হয়তো ও চুপচাপ আছে একটি হয়তো এই বাবা-মাকে মনে করে মনের মধ্যে নিকষ এক মেঘেরই দানা বাঁধবে মেঘের মধ্যে। মাত্র ৬ বছর যার বয়স তাকে এভাবে এতিম হতে হলো যাদের দ্বারা তাদের কেও এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি। আদৌতে এর কি বিচার হবে? নাকি বিচারের বাণী চিরদিন নিরবে নিভৃতে কাঁদবে? এমন প্রশ্ন এখন সকলের মনে।

৬ বছরের শিশু মাহির সরওয়ার মেঘ বাসায় কম্পিউটারে থাকা বাবা-মায়ের ছবি বারবার দেখে তাদের খুঁজে বেড়ায়। রাতে সে ঘুমাতে গিয়ে কী জানি ভাবে। ভাবনার কারণ প্রকাশ করে না। ছোট বয়সেই ও খুবই চাপা স্বভাবের। আদর করে ও গল্প শুনিয়ে রাতে মেঘকে ঘুম পাড়ানো হচ্ছে। দিনের বেলা অন্য শিশুদের সঙ্গে কিছুটা সময় খেলাধুলা করার সময় তার মন ভালো থাকে। রাত হলে ও বিষণ্ন হয়ে পড়ে।

এই হত্যভাগ্য শিশু মেঘের চোখের সামনেই ১০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ঘাতকরা তার বাবা মাছরাঙা টেলিভিনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও মা এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনিকে নিজ বাসায় নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। শিশু মেঘের দিন-রাত্রি কিভাবে কাটছে তা জানতে চাইলে নিহত রুনীর ছোট ভাই ও চাঞ্চল্যকর এ মামলার বাদী নওশের আলম রোমান এসব কথা জানান সাংবাদিকদের।

শিশু মেঘের মামা নওশের আলম রোমান জানান, বাসার কম্পিউটারে মেঘের বাবা সাগর ও রুনীর অনেক ছবি রয়েছে। মেঘ দিন-রাত অনেক সময় কম্পিউটার চালু করে ওর বাবা মায়ের ছবিগুলো বের করে বারবার দেখতে থাকে। এ সময় তার মন বিষণ্ন থাকে। কারও কাছে কিছু বলে না। তিনি জানান, মেঘ কয়েক দিন ধরে তার সঙ্গে রাতে ঘুমায়। কিন্তু মেঘ বিছানায় শুয়ে কী জানি ভাবতে থাকে। জানতে চাইলে কিছু বলে না। পরে আমি ওকে গল্প ও কিংবা গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিই। এত ছোট বয়সেও মেঘ খুবই চাপা স্বভাবের।

মেঘের মামা রোমান আরও জানান, বিকালে আশপাশের শিশুরা ওর সঙ্গে খেলতে এলে তখন ও কিছু সময় খেলা করে। তখন বেশ কিছু সময়ের জন্য ওর মন ভালো থাকে। কিন্তু রাত হলে, বিশেষ করে ঘুমানোর সময় ও বিষণ্ন হয়ে পড়ে। তিনি আরও জানান, ওর বাবা-মায়ের খুনের পর থেকে এখনও স্কুলে যাচ্ছে না মেঘ। বাসায়ও পড়াশোনা তেমন করছে না।

রোমান জানান, ১৮ ফেব্রুয়ারি কয়েকটি টেলিভিশনে সাগরের মায়ের সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। টেলিভিশনে কান্নারত দাদিকে দেখে ফোন করে মেঘ। সালেহা মনি বলেন, মেঘ আমাকে ফোন করে বলে, দাদু তোমাকে আমি দেখেছি। তুমি টেলিভিশনে অনেক কাঁদছ। তুমি কেঁদো না দাদু। আব্বু-আম্মু ভালো আছে। আব্বু আমাকে ফোন করলে আমি বলব তুমি অনেক কাঁদছ। মামলার বাদী রোমান জানান, ছয় বছরের মেঘের ভেতর কিছুটা পুলিশ আতংকও রয়েছে। নতুন কাউকে দেখলে কোন কোন ক্ষেত্রে বলে ওঠে, ‘তুমি কি পুলিশ’। তিনি বলেন, হয়তো খুনিরা চলে যাওয়ার সময় ওকে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে বলেছে, যদি পুলিশকে কিছু বলিস তবে তোকেও মেরে ফেলব। আর সেজন্যই হয়তো মেঘ পুলিশকে এত ভয় পাচ্ছে।

একদিন সবকিছুই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ মানুষকে ভুলেও যায়, কিন্তু তারপরও অনেক কিছু ভোলা যায় না- যেমন মেঘ ভুলতে পারবে না তার বাবা-মাকে। বাবা-মায়ের স্মৃতিটুকু নিয়েই সারাটা জীবন বেঁচে থাকতে হবে তাকে।

Advertisements
Loading...