সিনেমার স্টাইলে পুলিশের সামনে ছাদ থেকে লাফিয়ে যুবতীর আত্মহত্যা! তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শাস্তি দাবি

ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ একেবারে সিনেমার স্টাইল। সিনেমাতে যেমন দেখা যায়, ঠিক তেমনি ঘটনা ঘটেছে সিলেটে। মিনারা বেগম মিনারা নামে এক গৃহকর্মী মর্মান্তিক জীবনাবসান ঘটালো পুলিশ, সাংবাদিকসহ শত শত মানুষের চোখের সামনে।

ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, অনেকেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনার ভিডিও চিত্রও ধারণ করল মোবাইল ফোনে। কিন্তু কেউই বাঁচাতে পারেনি অভাগা এ যুবতীকে। দু’মুঠো ভাতের জন্য গ্রাম থেকে শহরে আসা মিনা শেষ পর্যন্ত মালিকের বহুতল ভবনের ছাদে উঠে ঝাঁপ দিয়ে তার যাপিত জীবনের অবসান ঘটালো। সোমবার সন্ধ্যায় ফিল্মি ট্র্যাজিক কাহিনীর এ ঘটনা ঘটে নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকার নিকুঞ্জ-১৩, আনোয়ারা মঞ্জিলে। ঘটনার পর থেকে মঙ্গলবার দিনভর মিনারার আত্মহননের ঘটনাটি নগরবাসীর মুখে ছিল আলোচিত বিষয়। জানা গেছে, আত্মহননকারী মিনারা সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের চাতল গ্রামের মৃত নছির উদ্দিনের মেয়ে। অভাবের তাড়নায় ছোটবেলায় মিনারাকে তুলে দেয়া হয়েছিল জকিগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামের মৃত শোয়াইবুর রহমান চৌধুরীর পুত্র মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী ওরফে সীমু চৌধুরীর কাছে। তিনি কাজের মেয়ে হিসেবে নিয়ে আসেন পাঠানটুলার বাসায়। এখানে থেকেই কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখে মিনা। কাজের মেয়ে হিসেবে থাকলেও এ জন্য কোন পারিশ্রমিক নিত না মিনারার পরিবার। তাদের প্রত্যাশা ছিল, মিনারা বড় হলে বিয়ের দায়িত্ব নেবে সীমু চৌধুরী ও তার পরিবার। কিন্তু সোমবার অজ্ঞাত কারণে মিনারা শত শত মানুষের সামনে উচ্চস্বরে ঘোষণা দিয়ে তার জীবনের অবসান ঘটায়।

মিনারার বড় বোন লিজা বেগম জানান, মাত্র ৭-৮ বছর বয়সে মিনাকে সীমু চৌধুরীর বাসায় দেয়া হয়েছিল। এরপর বেশ হাসিখুশিতেই দিন কাটছিল মিনার। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই বাসায় থাকতে অনীহা প্রকাশ করতে থাকে মিনা। গ্রামের বাড়িতে গেলে ফিরে আসতে চাইত না। তখন সীমু চৌধুরীর পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে গিয়ে বুঝিয়ে নিয়ে আসতেন। ২-৩ মাস আগে সীমুর পরিবারের লোকজন মিনার চাল-চলন ভালো না বলে মন্তব্য করেন। তারা প্রস্তাব দেয় মিনাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেয়ার। কিন্তু সীমু চৌধুরী বিনা পারিশ্রমিকে এত দিন মিনাকে খাটিয়েছেন, তাই তাকেই বিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিতে হবে এমন দাবি ছিল পরিবারের। তারা বলেন, মিনার বিয়ের দায়িত্ব নিয়ে রশি টানাটানি চলার এক পর্যায়ে সোমবার শুনতে পাই মিনা ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আহত হয়েছে। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসি। এসে জানতে পারলাম মিনা আর বেঁচে নেই। আমাদের বিশ্বাস, বিনা কারণে মিনা আত্মহত্যা করতে পারে না। আত্মহত্যার কারণ খুঁজে বের করার জন্য তারা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান।

আত্মহত্যার খবর পেয়ে সীমু চৌধুরীর বাসায় সাংবাদিকরা গেলে পরিবারের মহিলাদের কথা বলতে দেননি পুরুষরা। ধমকিয়ে সরিয়ে দেন সাংবাদিকদের সামনে থেকে। পরে সীমু চৌধুরীর পক্ষে কথা বলেন নূরুল আলম চৌধুরী। তিনি দাবি করেন. এক ছেলের সঙ্গে মিনার সম্পর্ক ছিল। আমার আত্মীয় একদিন তাদের ছাদেও পেয়েছিল। ছেলেটি তৎক্ষণাত অন্য বিল্ডিংয়ের ছাদ দিয়ে পালিয়ে যায়। তারা ছেলেটিকে চিনতে পারেননি। মিনারা প্রায়ই উল্টাপাল্টা আচরণ করত। গতকাল এক শিশুকে মারধর করেন, তখন বকাঝকা করেন নূরুল আলম চৌধুরীর মা। এরপর মিনারা ছাদে গিয়ে লাফ দেয়।

অপর একটি সূত্র জানায়, মিনারাকে কেন্দ্র করে দু-এক মাস ধরে সীমুর পরিবারে ঝগড়া-ঝাটি চলছিল। জালালাবাদ থানার ওসি গৌসুল হক জানান, মিনারা লাফ দেয়ার সময় তিনি সামনে ছিলেন। বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে পারা যায়নি। তিনি বলেন, ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়া গেলে মিনার কোন শারীরিক সমস্যা ছিল কি-না জানা যাবে। অন্যদিকে মিনারার ভাই খলিলুর রহমান জানান, ময়নাতদন্ত ও লাশ দাফনের পর তারা মামলা করবেন। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশের অপমৃত্যু মামলা ছাড়া আর কোন মামলার খবর পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে হৈচৈ শোনা যায় দু’একজনের মুখে। তার পর সবাই তাকাতে থাকে ৪ তলা ভবনের ছাদের দিকে। এক এক করে শত শত লোকজন জড়ো হতে থাকে ওই বহুতল ভবনের নিচে। খবর ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ ও সাংবাদিকরাও জড়ো হন। এর পর খবর পাঠানো হয় ফায়ার সার্ভিসে। প্রথমে মিনা ছাদে উঠে রেলিংয়ে হাত দিয়ে আকাশ পানে চেয়ে উদাস মনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর রেলিং ডিঙিয়ে বাইরে জানালার উপরের কার্নিশে চলে আসে। সেখানে দাঁড়িয়ে হুমকি দেয় নিচে ঝাঁপ দেয়ার। তখন এক যুবক সিঁড়ি বেয়ে উঠে মিনার কাছাকাছি চলে যায় এবং তাকে ফিরে আসতে বলে। পাশাপাশি ৩ তলার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সীমুর পরিবারের লোকজন তাকে বোঝাতে থাকেন। কিন্তু কোন কিছুই মিনাকে আর ফিরাতে পারেনি। বেলা আড়াইটার দিকে মিনারা ঝাঁপ দেয় ছাদ থেকে। তাকে রক্ষার জন্য নিচে পাতানো হয়েছিল সেফটি নেট, গাঢ় কাপড়ের চাদর, কিন্তু ওগুলোর বাইরে ঝাঁপ দেয় মিনা। পড়ে যায় পার্শ্ববর্তী মার্কেটের ছাদে। উদ্ধার হয় তার অজ্ঞান ও অবশ শরীর। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু ঘটে।

মিনারার আত্মীয়রা ও এলাকাবাসী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে।

আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন

Loading...