জয়পুরহাটের চাঞ্চল্যকর কিডনি বেচা-কেনা ॥ জামিনে মুক্ত দালালরা ফের সক্রিয় কিডনি ব্যবসায়!

ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ জয়পুরহাটের কালাইয়ে চাঞ্চল্যকর কিডনি মামলার তদন্ত দীর্ঘ এক বছরেও শেষ হয়নি। উল্টো মামলায় গ্রেফতার হওয়া সংঘবদ্ধ দালালরা আইনের ফাঁক-ফোকরে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও নব উদ্যোমে কিডনি বেচাকেনায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, পত্র পত্রিকা ও ইলেট্রিক মিডিয়াতে ব্যাপক আকারে সংবাদ প্রচারের পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। তারপরও ওই চক্রের লোভনীয় প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হয়ে উপজেলার হতদরিদ্র মানুষেরা কিডনি বিক্রি করতে এখনও প্রতিদিনই এলাকা ছাড়ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে কাংক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে সমাজের বোঝা হয়ে পড়েছেন অতীতে কিডনি বিক্রি করা লোকজন। এমনকি তারা প্রশাসনের প্রতিশ্রুত কোন প্রকার সাহায্য-সহযোগিতাও পাচ্ছেন না। স্থানীয় প্রশাসনের শিথিলতায় ঝিমিয়ে পড়েছে এসব মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি চিকিৎসা সেবা দেয়ার উদ্যোগও। সরেজমিনে কালাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে কথা বললে, তারা এসব তথ্য জানিয়ে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

উল্লেখ্য, গত বছর এ সময় উপজেলার ভেরেন্ডি, বহুতি, জয়পুর বহুতি, দুর্গাপুর, রাঘবপুর, বোড়াই, বামনগ্রাম, কুশুমসাড়া, ইন্দাহার, বিনইলসহ অন্তত ২০ গ্রামের দুই শতাধিক অভাবি মানুষ দালাল চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে তাদের কিডনি বিক্রি করেন। এই চাঞ্চল্যকর সংবাদ গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হলে নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে মাঠে নামে পুলিশ। দ্রুত গ্রেফতার করা হয় কিডনি চক্রের মূল হোতা ঢাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী, নাফিজ মাহমুদ, মাহমুদ ওরফে সুজন, বাগেরহাটের সাইফুল ইসলাম দাউদ ও স্থানীয় দালাল বহুতি গ্রামের আব্দুস ছাত্তারসহ ১০ জনকে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ৬জন এই চক্রের সাথে নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে। এদের মধ্যে কেও কেও আবার এই চক্রের সাথে ঢাকার নামকরা একাধিক হাসপাতাল ও স্বনামধন্য চিকিৎসকদের জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করে। পুলিশ প্রশাসন দ্রুত গতিতে এই মামলার তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিলেও অদৃশ্য কারণে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কালাই থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ ফজলুল করিমকে হঠাৎ এক মাসের মাথায় বদলি করা হয়। ফলে মামলার কার্যক্রম কার্যত থমকে যায়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আটক দালালরা মামলার মাত্র ৫ মাসের মাথায় জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে কিডনি বেচা-কেনায়। অভিযোগ রয়েছে, কিডনি চক্রের রাঘব-বোয়ালদের বাঁচাতেই মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

মামলায় জামিন পেয়ে এলাকার অভাবি মানুষদের কিডনি বিক্রিতে প্রলুব্ধ করতে সংগোপনে মাঠে নেমেছে দালালচক্র- এমন অভিযোগ শোনা গেছে এ অঞ্চলের মানুষদের মুখে মুখে। বিশেষ করে চক্রের মূল হোতা তারেক আজম নেপথ্যে থেকে এ অঞ্চল থেকে কিডনি সংগ্রহ করছেন বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বহুতি গ্রামের কয়েকজন অভিযোগ করেন, ‘জয়পুর বহুতি গ্রামের খোকা মিয়ার মেয়ে খোতেজা বানু কয়েকদিন আগে কিডনি বিক্রি করে বাড়ি এসেছেন, পাশের বৈরাগী বাজারের পল্লী চিকিৎসক আমিনুল ইসলাম কিডনি দেয়ার জন্য এখন সিংগাপুর অবস্থান করছেন। দুর্গাপর গ্রামের সাইদুল ইসলাম কিডনি বিক্রির জন্য ঢাকায় আছেন। এছাড়া বহুতি আদর্শ গ্রামের সৈয়দ আলী এবং তার স্ত্রী মমতাজ বেগম কিছুদিন আগে সিংগাপুর থেকে চেকিং করে দেশে ফিরেছেন। দেশে আসার পর তারা এক একর জমিও লিজ নিয়েছেন।’

তবে সৈয়দ আলীর সাথে দেখা করে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিদেশ যাওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন,‘অভাবের কারণে ঢাকায় এক মাস রিক্সা চালিয়ে আবার ফিরে এসেছি।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন,‘এ অঞ্চলের কেও বাড়ি ছেড়ে গেলেই মানুষ মনে করে তারা কিডনি বিক্রি করতে গেছে’। আর আমিনুল ইসলামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বৈরাগী বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি বেশ কিছুদিন থেকে বাজারে আর আসেন না। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি দুর্গাপুর গিয়েও কাওকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে প্রশাসনের দেয়া প্রতিশ্রুত নানা অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি কিডনি বিক্রি প্রতিরোধে বর্তমানে প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় ক্ষুব্ধ অতিতের কিডনি বিক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, আমরা না বুঝে কিডনি বিক্রি করেছি, এর জন্য প্রশাসন, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি সকলের কাছেই আমরা সে সময় অপরাধী হয়েছিলাম। আমাদের নিয়মিত ফ্রি চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও সেই সেবা প্রাপ্তিতো দূরের কথা, বিগত এক বছরে আমাদের কেও খোঁজও নেয়নি। অথচ এখন প্রতিদিনই কিডনি বিক্রির জন্য এই এলাকা থেকে মানুষ ঢাকাসহ দেশের বাইরে যাচ্ছে। এ ব্যাপারেও প্রশাসন কোন উদ্যোগই নিচ্ছে না।

স্থানীয় মাত্রাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আ.ন.ম শওকত হাবিব তালুকদার লজিক নিজেদের ব্যর্থতার কথা অকপটে স্বীকার করে বলেন, যারা কিডনি দিয়েছিলেন তাদের সুস্থ রাখার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে সেটা বাস্তবায়ন করা যায়নি। তিনি দাবি করেন, প্রশাসনের ধারাবাহিক মনিটরিং জোরদার করা ছাড়া এ এলাকায় কিডনি বিক্রি প্রতিরোধ করা কোনমতেই সম্ভব নয়।

পুলিশ সুপার হামিদুল আলম বলেন,‘ বার বার তদন্ত কর্মকর্তা বদলির কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও বর্তমানে মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরই মধ্যে এ মামলায় সংশিস্নষ্ট চিকিৎসকদের সাক্ষ্যও নেয়া হয়েছে। মোট ১৬ আসামির মধ্যে একজনের কোন ঠিকানা পাওয়া যায়নি। বাকি ১৫ জনের বিরুদ্ধে খুব শীঘ্রই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলে তিনি জানান।

ঘটনা যাই ঘটুক না কেনো একটি বিষয় নিশ্চিত আর তা হলো এলাকার অভাবি মানুষ পেটের দায়ে এহেন কর্ম করেছে। এখন তারা যখন বুঝতে পেরেছে তারা অপরাধ করেছে। তারা আজ নিঃশ্ব হয়েছে। তারা প্রতারিত হয়েছেন। তখন তাদের আইনগত সাহায্য সহযোগিতা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন।

Loading...