ময়মনসিংহের গৌরীপুরে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে এলাকার জনগণ!

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি ॥ ময়মনসিংহের গৌরীপুরে নলকূপে লাল বিপজ্জনক সংকেত থাকলেও মানছে না অসহায় মানুষ। যে কারণে অত্র এলাকায় ব্যাপক আকারে আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।

প্রকাশ থাকে যে, উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ১ হাজার ২৮৯টি নলকূপে আর্সেনিকযুক্ত হিসেবে লাল চিহ্ন দেয়া হলেও বিকল্প পানি পানের ব্যবস্থা নেই। ফলে অসহায় হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে বাধ্য হচ্ছে। যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগের নগরী ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ভাংনামারী ইউনিয়নের চরাঞ্চল। ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ অত্যন্ত দারিদ্র্যের মাঝে জীবন যাপন করছে। সামর্থ্য, জোগান, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় এরা আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে বাধ্য হচ্ছে।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরসূত্রে জানা যায়, ১০টি ইউনিয়ন ও গৌরীপুর পৌরসভায় ২০০৫ সালে জরিপে ১ হাজার ২৮৯টি নলকূপে আর্সেনিক ধরা পড়ে। মইলাকান্দা ইউনিয়নে ১২৮, গৌরীপুর সদর ইউনিয়নে ১৩৪, অচিন্তপুর ইউনিয়নে ১৭৬, মাওহা ইউনিয়নে ৯০, সহনাটী ইউনিয়নে ১৩৫, বোকাইনগর ইউনিয়নে ৮০, রামগোপালপুর ইউনিয়নে ৬৯, ডৌহাখলা ইউনিয়নে ৮০, ভাংনামারী ইউনিয়নে ১৫৯ ও সিধলা ইউনিয়নে ৮৩ এবং গৌরীপুর পৌরসভায় ১৫৫টি নলকূপে আর্সেনিকযুক্ত পানির প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতিদিন নলকূপ বাড়লেও এর পরে আর কোন জরিপ হয়নি। ভাংনামারী ইউনিয়নে প্রায় ২৬ হাজার পরিবার বাস করে। প্রতিটি পরিবারেই রয়েছে নলকূপ। আর্সেনিকযুক্ত এলাকায় বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে কেয়ার বাংলাদেশ নামক একটি এনজিও সনুফিল্টার প্রদান করলেও তা কাজে আসছে না। ১০-১২টি পরিবারের জন্য দেয়া হয়েছে মাত্র একটি ফিল্টার। নলকূল থেকে পানি এনে সনুফিল্টারে দিয়ে বিশুদ্ধ করলে ঘণ্টায় দু-তিন গ্লাস খাবার পানি পাওয়া যায়। চরাঞ্চলের শিক্ষাবঞ্চিত দরিদ্র পরিবারগুলো জেনে-শুনেও বাধ্য হয়ে আর্সেনিকযুক্ত বিষের পানি পান করছে। অত্র এলাকার সখিনা খাতুন (৫৬) জানান, ‘সনুফিল্টারের ময়লা দেখেই বমি আসে। এ পানি খাইতে ইচ্ছা করে না।’ ভাটিপাড়া গ্রামের হজরত আলী ফকির, রুক্কুন মিয়া, আবদুল কাদির মতু, রইছ উদ্দিন, নিয়াজ উদ্দিন, আবদুল মোতালেব, হাকিম উদ্দিন জানান, ‘দিন এনে দিন খাই। নলকূপ বসামো কী দিয়া? তাই লাল দাগ দেখার পরেও পানি খাইতে হচ্ছে।’

রামগোপালপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম শিকদার জানান, সরকারি সহযোগিতা ও নিজস্ব উদ্যোগে আর্সেনিকযুক্ত নলকূপ পরিবর্তনের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। মাওহা ইউপি চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ কালন জানান, আর্সেনিক এক প্রকার বিষ। বিষমুক্ত পানি পানের জন্য পাশের নলকূপ থেকে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার-নির্ধারিত ফি ১ হাজার ৫০০ টাকার বিনিময়ে আর্সেনিকমুক্ত নলকূপ ভাংনামারীতে পাঠানো হলেও এলাকার কেও আগ্রহী না হওয়ায় ইউপি চেয়ারম্যান তা ফেরত পাঠিয়েছেন বলে জানান উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপ-প্রকৌশলী আবদুল মান্নান খান। তিনি আরও জানান, আর্সেনিক একটি বিষ, যার প্রতিক্রিয়া দীর্ঘদিন পরে দেখা যায়। সনুফিল্টার দিয়ে আর্সেনিকমুক্ত সম্ভব নয়। কোনরূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই কারা সনুফিল্টার দিয়েছে তা জানা নেই। এলাকাবাসী জানান, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক নলকূপ আর্সেনিকযুক্ত প্রমাণিত হলেও এসব পরিবর্তনে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের জোরালো কোন উদ্যোগ নেই। হতদরিদ্র অর্ধ লাখ অসহায় মানুষ বাধ্য হয়েই আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে এলাকার হতদরিদ্র মানুষগুলোকে এই আর্সেনিকের হাত থেকে রক্ষা করবেন বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

Advertisements
Loading...