পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে সামপ্রতিক সময়ে বিতর্ক ॥ বাংলাদেশ কি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, নাকি পুলিশি রাষ্ট্র ॥ কারও গায়ে হাত তোলার ক্ষমতা কোন পুলিশ কর্মকর্তার নেই : ড. কামাল

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সামপ্রতিক সময়ে আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে বেশ বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পুলিশের ক্ষমতা কতখানি, কতদূর পর্যন্ত তাদের ক্ষমতা খাটাতে পারেন এসব বিষয় অনেক পুলিশ কর্মকর্তা জানেন না। ইদানিং অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়েই এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমনও শোনা যায়, অনেক পুলিশ কর্মকর্তা আইনের অর্থাৎ পুলিশ আইনের ধারা এবং এর সংজ্ঞা সম্পর্কেও তেমন একটা অবগত নন। রাজনৈতিক স্বেচ্ছা চারিতা, ব্যাক্তিগত প্রভাব এগুলোতো আছেই সব সময়। কিন্তু পেশাগত যোগ্যতা যদি না থাকে তাহলে সেটির জবাব কে দেবে? এমনই অনেক পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে পুলিশদের নিয়ে। পুলিশ আসলে জনগণের বন্ধু, শত্রু নয়। এই মনোভাবটি আসলে সমাজ থেকে একেবারেই উঠে যাচ্ছে। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথমত: রাজনৈতিক বিবেচনায় আজকাল পুলিশে নিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকেন, তখন সেই দলের লোকজন নিয়োগ পান বেশি। যে কারণে পুলিশের মধ্যে রাজনীতিকরণ থাকে বেশি। ক্ষমতাসীনদের দাপটের কারণে তখন সেই নিয়োগকৃত পুলিশের কর্মকর্তা দলের হয়ে কাজ করবেন এটাই এখন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু তা কি হওয়ার কথা? পুলিশ তো হওয়ার কথা জনগণের বন্ধু। যে যে দলের লোকই হোক না কেনো পুলিশের কাজ শুধু অপরাধিকে শাস্তি দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তার উল্টো। কখনও বিরুদ্ধ দলের কাওকে ধরে পেটানো হচ্ছে, মামলা দিয়ে জব্দ করা হচ্ছে। আবার কখনও বা নির্দোশ ব্যক্তিকেও ধরে এনে পেটানো হচ্ছে। আবার কখনও চাঞ্চল্যকর খুনিকে বাঁচানোর জন্য নির্দোশ ব্যক্তিকে আসামী বানিয়ে গ্রেফতার করে হেনস্থা করা হচ্ছে। এটা কি কারো কাছেই কাম্য।

সামপ্রতিক সময়ে পুলিশের কাজ নিয়ে আরও সন্দেহ মানুষের মনে দানা বাঁধে সাংবাদিক সাগর সারওয়ার-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে। প্রায় দেড় সপ্তাহ পার হওয়ার পরও পুলিশ কাওকে গ্রেফতার করতে পারেনি। দেশ বিদেশে আলোচিত এই জোড়া হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নাকি পুলিশ এখনও সুনির্দিষ্ট কিছু জোগাড় করতে পারেননি! এটাকি বিশ্বাস্য বিষয়? আবার ওই হত্যাকাণ্ডের পর যে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছিল, তাও নাকি সঠিকভাবে করা হয়নি অথবা জব্দকৃত আলামতও সঠিক নিয়মে সংগ্রহ করতে পারেনি পুলিশ। যদি এই অবস্থা হয় তাহলে কিভাবে সঠিক বিচার নিশ্চিত করা যাবে। কারণ পুলিশের সংগৃহিত দলিলাদিই আদালতের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। সেটির ওপর নির্ভর করেই আদালত অনেক রায় দিয়ে থাকেন অথবা রায়ে সহায়তা পান। তাহলে সেই সঠিক কাজটি যদি পুলিশ সঠিকভাবে করতে ব্যর্থ হয় তাহলে মানুষ সুবিচার পাবে কিভাবে।

পুলিশরা আমাদের দেশেরই সন্তান তাঁরা দেশের জন্য সবসময় শ্রম দিচ্ছেন। দেশের আর দশটা চাকুরীর মতো নয়। পুলিশের অন্য চাকুরির মত ছুটি নেই, বিশ্রাম নেই। কিন্তু সেই পরিশ্রমের ফসল যদি সাধারণ মানুষ না পায় তাহলে এর দায়িত্ব নেবে কে?

সামপ্রতিক সময়ে এসব বিষয়ে বেশি বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে। পুলিশের একটি আলাদা তদন্ত বিভাগ খোলা এবং তাদের তদন্তের বিষয়ে বিশেষ ট্রেনিং দেওয়া হবে। আমরা মনে করি এসব বিষয়গুলো দ্রুততার ভিত্তিতেই করা উচিৎ। জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব পুলিশের সেই পুলিশ যদি জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে জাতি হিসেবে আজ আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো?

সামপ্রতিকি ঘটনার মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের নাতি রাকিবকে পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায় বেশ আলোচনায় চলে আসে পুলিশ বাহিনী। এই নিয়ে হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। এই ঘটনায় গুলশান অঞ্চলের উপ-কমিশনার লুৎফুল কবিরকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২০ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের বেঞ্চে দিনভর শুনানি শেষে এই আদেশ দেয়া হয়। পুলিশের বাকি চার কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান অঞ্চলের সহকারী কমিশনার আশরাফুল আজিম মিয়া, গুলশান থানার ওসি শাহ আলম, উপ-পরিদর্শক সোমেন বড়-য়া ও মোস্তাফিজুর রহমানকে ২২ ফেব্রুয়ারি আবারও আদালতে আসতে হবে।

রাকিবের পরিবারের অভিযোগ, বিনা অপরাধে গুলশান এলাকায় পুলিশ তাকে ১০ ফেব্রুয়ারি তিন ঘণ্টা থানায় আটকে রেখে নির্যাতন করে। এ লেভেলের ছাত্র ১৯ বছর বয়সী রাকিব এরপর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ‘তাজউদ্দিনের নাতিকে পেটাল পুলিশ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে আইনজীবী শম রেজাউল করিম তা আদালতের নজরে আনেন। এরপর বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারির পাশাপাশি পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে তলব করেন আদালত। ২০ ফেব্রুয়ারি দিনভর শুনানিতে ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বক্তব্য রাখেন। তিন পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ। দুই উপ-পরিদর্শকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মোতাহার হোসেন।

শুনানিতে ড. কামাল হোসেন বলেন, এই মামলার সাংবিধানিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই মামলার রায়ে ফুটে উঠবে বাংলাদেশ কি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, নাকি পুলিশি রাষ্ট্র। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, এ ধরনের পুলিশি নিষ্ঠুরতার জন্য বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়নি। এটা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এর সংবিধান মানুষের অধিকার রক্ষার স্বার্থে সব ব্যবস্থাই রেখেছে, কোন ফাঁকফোকর রাখেনি। পুলিশ ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারলেও এর পেছনে যথেষ্ট যুক্তি থাকতে হবে। তবে কারও গায়ে হাত তোলার ক্ষমতা কোন পুলিশ কর্মকর্তার নেই। গ্রেফতারের পর ব্যক্তিকে অবশ্যই জানাতে হবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী। তার সঙ্গে সভ্য ও শালীন আচরণ করতে হবে। সংবিধানের অন্যতম এই প্রণেতা আরও বলেন, এই ঘটনায় পুলিশের নিষ্ঠুরতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এ সময় আদালত বলেন, কবিগুরু বহুদিন আগে আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের মূলমন্ত্র বলে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সবাই রাজা, আমাদের এই রাজার রাজত্বে/নইলে মোদের রাজার সনে মিলবো কি শর্তে’।

এ সময় ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, এই কবিতার মধ্যেই রয়েছে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলমন্ত্র। রাষ্ট্র ও জনতার সম্পর্ক এই কবিতায় নিহিত। তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অবিভাজ্য। যে রাষ্ট্রের জনগণ নিরাপদ থাকে না। সে রাষ্ট্রও নিরাপদ হতে পারে না। এ সময় আদালত বলেন, আমাদের সংবিধান ভারতের সংবিধান থেকে উন্নত। ভারত কেবল প্রজাতান্ত্রিক। আর আমাদের সংবিধানে গণপ্রজাতান্ত্রিক বলা হয়েছে। আদালত আরও বলেন, পুলিশ কোন দায়মুক্তি ভোগ করে না। বরং পুলিশের দায় অন্য ১০ জনের চেয়ে বেশি। কারণ জনগণের টাকায় জনগণের স্বার্থে তাদের নিয়োগ করা হয়েছে। তিন পুলিশ কর্মকর্তার আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ শুনানি শুরু করলে আদালত নির্যাতিত রাকিবের একটি ছবি তাকে দেখান। ছবি দেখে ব্যারিস্টার রোকন বলেন, এখানে একটি নিষ্ঠুরতা করা হয়েছে, এটা বলা ছাড়া উপায় নেই। ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেন, তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে গাড়িটি দ্রুত চালানো হচ্ছিল। কিন্তু ওই গাড়ির গতি রেকর্ড করা আছে। তাতে গাড়ির গতি দ্রুত ছিল এটা প্রমাণ করে না। তাছাড়া গাড়ির গতি দ্রুত হলে গাড়িটি জব্দ করতে পারত। কিন্তু পুলিশ গাড়ি জব্দ করেনি। এছাড়া এ ঘটনায় পুলিশ মিথ্যা মামলা করার প্রবণতা দেখিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, শম রেজাউল করিম, রাকিবের বাবা মোস্তাক হোসেন, রাকিবের মা ও তাজউদ্দিনের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

তাই পুলিশ সম্পর্কে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হলে তাদেরকে উন্নত প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য না দিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। তবেই পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে।

Advertisements
Loading...