উচ্চ সুদে ঋণ নেয়ার কারণে অধিকাংশ উদ্যোক্তা হয়ে যাচ্ছেন ঋণখেলাপি ॥ নিজেদের বেঁধে দেয়া সুদারোপ মানছে না অধিকাংশ ব্যাংক

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা স্থিমিত হয়ে পড়ছে তা ব্যাংকগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যাবে। ব্যাংকগুলো যেনো তাদের ইচ্ছা মতো সুদ কষছেন। এমন অবস্থা এর আগে আর দেখা যায়নি। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্বে যেভাবে সুদের হার নির্ধারণ করে দিতো তফসিলি ব্যাংগুলো তা মানতে বাধ্য থাকতো। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে এই নিয়মের ব্যতিক্রম করে ব্যাংকগুলোকে সুদের হার নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়ার ফলে এই ধরণের অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণভাবে এগুলো মনিটরিংও করে থাকে। কিন্তু তারপরও কেনো ব্যাংকগুলোতে এই অবস্থা চলছে অর্থনীতিবিদরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত রিপোর্টে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

গোলাম মওলা ওই রিপোর্টটিতে লিখেছেন, সুদারোপের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কোন নিয়মনীতি মানছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতার সুযোগে ব্যাংকগুলো লাগামহীনভাবে সুদের হার নির্ধারণ করছে। এমনকি ঋণ বিতরণে নিজেদের বেঁধে দেয়া সুদ হার সাড়ে ১৫ শতাংশের মধ্যেও থাকছে না অধিকাংশ ব্যাংক। দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে অধিকাংশ ব্যাংকের সুদ হার ধরা হয়েছে ১৭ থেকে ১৯ শতাংশ। জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে সুদ হার ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে ২৫টি ব্যাংক। এর বাইরে ডজনখানেক ব্যাংক আগে থেকেই সুদের হার বৃদ্ধি করে রেখেছে। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শিল্পায়ন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, শিল্প মালিকরা দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন, স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে আর্থিক খাত। এতে ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। জানুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় সব ব্যাংক ঋণে সুদ হার ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে কোন কোন ব্যাংক ঋণ ও আমানতে সুদ হারের ব্যবধান ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। উচ্চ সুদ হারের সঙ্গে আরও যোগ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সাভির্স চার্জ। ফলে শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। দেশের বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়ে গেলে ব্যবসায় ব্যয় বেড়ে যায়। এতে বাড়ে পণ্যের উৎপাদন খরচ। এ অবস্থায় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঋণের উচ্চ সুদের কারণে আগামীতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এ বিষয়ে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। এছাড়া শিল্প-প্রতিষ্ঠানে খরচও বেড়ে যাবে। ফলে জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যাবে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাড়ে ১৫ শতাংশ বলা হলেও আসলে সুদারোপ করা হচ্ছে ১৭ থেকে ২০ শতাংশ, যা সুদ-আসলে চক্রাকারে ২৫ থেকে ২৬ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ঋণ ও আমানতের সুদ হার ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হলেও ঋণের সুদ ৩ মাস পরপর চক্রাকারে কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এর ব্যবধান আর ৫ শতাংশ না থেকে ১০ থেকে ১২ শতাংশে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক খাতকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুযোগে ব্যাংকগুলো বেপরোয়া সুদারোপ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, পুরনো ঋণে হঠাৎ করে সুদ হার বাড়ানোর ফলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া উচ্চ সুদ হার নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর সুদ হারের সীমা নির্ধারণ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোন ব্যাংকই সুদের হার কমায়নি। বরং বৃদ্ধি করেছে। ফজলুল হক আরও বলেন, ব্যাংকগুলোকে সুদ হারের সীমা নির্ধারণ করার সুযোগ করে দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হয়নি। এতে দেশের শিল্প খাতকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর হাতে সুদ হার নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়ার মধ্য দিয়ে শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো সুযোগ পেয়ে হঠাৎ করে ৩-৪ শতাংশ সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উৎপাদনের ওপর। উদ্যোক্তাদের দু’মাস আগে যে খরচ হতো, বর্তমানে তার চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি খরচ হচ্ছে। তিনি বলেন, সুদের হার বৃদ্ধির ফলে অনেক ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন না। ফলে একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অপরদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে সোনালী ব্যাংক ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করলেও ফেব্রুয়ারিতে সুদ হার নির্ধারণ করেছে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ। জানুয়ারিতে জনতা ব্যাংক ১৪ শতাংশে ঋণ বিতরণ করলেও ফেব্রুয়ারিতে ১৮ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। একইভাবে চলতি ফেব্রুয়ারিতে অগ্রণী ব্যাংক ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। জানুয়ারিতে রূপালী ব্যাংক ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করলেও ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকটি সুদ হার নির্ধারণ করেছে ১৬ শতাংশ। বিডিবিএল জানুয়ারিতে ১৪ শতাংশে ঋণ বিতরণ করলেও ফেব্রুয়ারিতে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংক সাড়ে ১৭ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে। দ্য সিটিব্যাংক ১৮ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে। ইউনাইটেট কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল) ফেব্রুয়ারিতে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। আইসিবি ইসলামী ব্যাংক করেছে ১৭ শতাংশ সুদে। এনসিসি ব্যাংক করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে সাড়ে ১৮ শতাংশ সুদে। ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা ব্যাংক করেছে সাড়ে ১৯ শতাংশ সুদে। মার্কেন্টাইল ব্যাংক করেছে ১৬ শতাংশ সুদে। ওয়ান ব্যাংক করেছে ১৭ শতাংশ সুদে। এক্সিম ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদে। মিউচ্যুয়াল ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদে। বিসিবিএল, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক করেছে ১৭ শতাংশ সুদে। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক করেছে সাড়ে ১৭ শতাংশ সুদে। ব্র্যাক ব্যাংক করেছে সোয়া ১৭ শতাংশ সুদে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে সাড়ে ১৮ শতাংশ সুদে। আল ফালাহ করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদে, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া করেছে ১৭ শতাংশ সুদে, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদে। এছাড়া অধিকাংশ ব্যাংক কৃষি খাতে ঋণ বিতরণেও সুদের হার বৃদ্ধি করেছে। এদিকে সুদের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ঋণ না পাওয়ার কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন।

এছাড়া ডলার সংকটের কারণে শিল্প-কারখানার জন্য কাঁচামাল আমদানি কমে যাচ্ছে। ফলে শিল্প-কারখানার উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান না বেড়ে বরং বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে সরকার বিশেষ নজর না দিলে ব্যাংকগুলোতে যে কোন সময় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে একেবারে পঙ্গু করে দিতে পারে। জানা গেছে, দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে সরকারি চার ব্যাংকে অর্থ সংকট কাটছে না। পাশাপাশি কমে গেছে আমানতের পরিমাণ। ইতিমধ্যে দুটিতে মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে চরম বিশৃংখলা। এ বিষয়ে অপর এক শিল্পোদ্যোক্তা ও একটি ব্যাংকের পরিচালক জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো যে যেমন পারছে সুদ নিচ্ছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে সব ধরনের উৎপাদন ব্যয়। পাশাপাশি উচ্চ সুদে ঋণ নেয়ার কারণে অধিকাংশ উদ্যোক্তা হয়ে যাচ্ছেন ঋণখেলাপি। এ বিষয়ে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী মনে করেন, ব্যাংক ঋণে সুদের হার এভাবে বেড়ে গেলে নতুন কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এমনিতেই গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে শিল্পোদ্যোক্তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এত বেশি সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠানই আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে পারবে না। এতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। জানুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় সব ব্যাংক ঋণে সুদ হার ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করে কোন কোন ব্যাংক ঋণ ও আমানতে সুদ হারের ব্যবধান ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। উচ্চ সুদ হারের সঙ্গে আরও যোগ করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সাভির্স চার্জ। ফলে শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। দেশের বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়ে গেলে ব্যবসায় ব্যয় বেড়ে যায়। এতে বাড়ে পণ্যের উৎপাদন খরচ। এ অবস্থায় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঋণের উচ্চ সুদের কারণে আগামীতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এ বিষয়ে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, ব্যাংক ঋণে সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। এছাড়া শিল্প-প্রতিষ্ঠানে খরচও বেড়ে যাবে। ফলে জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যাবে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাড়ে ১৫ শতাংশ বলা হলেও আসলে সুদারোপ করা হচ্ছে ১৭ থেকে ২০ শতাংশ, যা সুদ-আসলে চক্রাকারে ২৫ থেকে ২৬ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ঋণ ও আমানতের সুদ হার ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হলেও ঋণের সুদ ৩ মাস পরপর চক্রাকারে কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এর ব্যবধান আর ৫ শতাংশ না থেকে ১০ থেকে ১২ শতাংশে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ব্যাংক খাতকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুযোগে ব্যাংকগুলো বেপরোয়া সুদারোপ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, পুরনো ঋণে হঠাৎ করে সুদ হার বাড়ানোর ফলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া উচ্চ সুদ হার নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর সুদ হারের সীমা নির্ধারণ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোন ব্যাংকই সুদের হার কমায়নি। বরং বৃদ্ধি করেছে। ফজলুল হক আরও বলেন, ব্যাংকগুলোকে সুদ হারের সীমা নির্ধারণ করার সুযোগ করে দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হয়নি। এতে দেশের শিল্প খাতকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর হাতে সুদ হার নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়ার মধ্য দিয়ে শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো সুযোগ পেয়ে হঠাৎ করে ৩-৪ শতাংশ সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উৎপাদনের ওপর। উদ্যোক্তাদের দু’মাস আগে যে খরচ হতো, বর্তমানে তার চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি খরচ হচ্ছে। তিনি বলেন, সুদের হার বৃদ্ধির ফলে অনেক ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন না। ফলে একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অপরদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে সোনালী ব্যাংক ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করলেও ফেব্রুয়ারিতে সুদ হার নির্ধারণ করেছে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ। জানুয়ারিতে জনতা ব্যাংক ১৪ শতাংশে ঋণ বিতরণ করলেও ফেব্রুয়ারিতে ১৮ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। একইভাবে চলতি ফেব্রুয়ারিতে অগ্রণী ব্যাংক ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। জানুয়ারিতে রূপালী ব্যাংক ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করলেও ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকটি সুদ হার নির্ধারণ করেছে ১৬ শতাংশ। বিডিবিএল জানুয়ারিতে ১৪ শতাংশে ঋণ বিতরণ করলেও ফেব্রুয়ারিতে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইএফআইসি ব্যাংক সাড়ে ১৭ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে। দ্য সিটিব্যাংক ১৮ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করছে। ইউনাইটেট কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল) ফেব্রুয়ারিতে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। আইসিবি ইসলামী ব্যাংক করেছে ১৭ শতাংশ সুদে। এনসিসি ব্যাংক করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে সাড়ে ১৮ শতাংশ সুদে। ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা ব্যাংক করেছে সাড়ে ১৯ শতাংশ সুদে। মার্কেন্টাইল ব্যাংক করেছে ১৬ শতাংশ সুদে। ওয়ান ব্যাংক করেছে ১৭ শতাংশ সুদে। এক্সিম ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদে। মিউচ্যুয়াল ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদে। বিসিবিএল, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক করেছে ১৭ শতাংশ সুদে। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক করেছে সাড়ে ১৭ শতাংশ সুদে। ব্র্যাক ব্যাংক করেছে সোয়া ১৭ শতাংশ সুদে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে সাড়ে ১৮ শতাংশ সুদে। আল ফালাহ করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদে, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া করেছে ১৭ শতাংশ সুদে, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান করেছে সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদে। এছাড়া অধিকাংশ ব্যাংক কৃষি খাতে ঋণ বিতরণেও সুদের হার বৃদ্ধি করেছে। এদিকে সুদের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ঋণ না পাওয়ার কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানার উৎপাদন। এছাড়া ডলার সংকটের কারণে শিল্প-কারখানার জন্য কাঁচামাল আমদানি কমে যাচ্ছে। ফলে শিল্প-কারখানার উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান না বেড়ে বরং বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে সরকার বিশেষ নজর না দিলে ব্যাংকগুলোতে যে কোন সময় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে একেবারে পঙ্গু করে দিতে পারে। জানা গেছে, দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে সরকারি চার ব্যাংকে অর্থ সংকট কাটছে না। পাশাপাশি কমে গেছে আমানতের পরিমাণ। ইতিমধ্যে দুটিতে মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে চরম বিশৃংখলা।

এ বিষয়ে অপর এক শিল্পোদ্যোক্তা ও একটি ব্যাংকের পরিচালক জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো যে যেমন পারছে সুদ নিচ্ছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে সব ধরনের উৎপাদন ব্যয়। পাশাপাশি উচ্চ সুদে ঋণ নেয়ার কারণে অধিকাংশ উদ্যোক্তা হয়ে যাচ্ছেন ঋণখেলাপি। এ বিষয়ে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী মনে করেন, ব্যাংক ঋণে সুদের হার এভাবে বেড়ে গেলে নতুন কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না। তিনি যুগান্তরকে বলেন, এমনিতেই গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে শিল্পোদ্যোক্তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এত বেশি সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠানই আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে পারবে না। এতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।

Advertisements
Loading...