সীমাহীন দুর্ভোগে যাত্রীরা ॥ ১২ হাজার ট্যাক্সি ক্যাবের মধ্যে চলছে মাত্র ৩ হাজার ॥ কথা দিলেও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ২ হাজার নতুন ট্যাক্সি ক্যাবের অনুমতি দেয়নি

ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ২ হাজার নতুন ট্যাক্সি ক্যাবের অনুমোদনের কথা বললেও এখনও অনুমতি দেয়নি। পুরনো ১২ হাজার ট্যাক্সি ক্যাবের মধ্যে চলছে মাত্র ৩ হাজার। এমতাবস্থায় রাজধানীবাসীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এক সময় ঢাকার রাস্তায় ১২ হাজার ট্যাক্সিক্যাব চলাচল করলেও এর সংখ্যা কমে চার ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ ৩ হাজারে এসে ঠেকেছে। ক্যাব মালিকরা বলছেন, প্রশাসনিক ‘জটিলতায়’ এবং কর্তৃপক্ষের ‘উদাসিনতার’ কারণেই রাজধানীর ট্যাক্সি ক্যাব হারিয়ে যেতে বসেছে। ট্যাক্সি ক্যাবের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ টাকা গুণে তাদের গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বি আরটিএ) হিসাবে ২০০৭ সালে রাজধানীতে প্রায় ১২ হাজার ট্যাক্সি ক্যাব চলাচল করতো। এখন যেগুলো সচল রয়েছে সেগুলোর মেয়াদও ২০১৩ সালের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

বি আরটিএ এর প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক সাইফুল হক জানিয়েছেন, “মেয়াদ শেষে মালিকরা চাইলে তাদের নতুন ট্যাক্সি ক্যাবের অনুমোদন দেয়া হবে।” নতুন করে ট্যাক্সি ক্যাব আমদানি করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সরকার জনকল্যাণের কথা চিন্তা করে নতুন করে ট্যাক্সি ক্যাব আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে নৈরাজ্য ঠেকাতে নতুন নিয়মে শুধু কোনো কোম্পানির মাধ্যমেই বিদেশ থেকে ক্যাব আনা যাবে।” তিনি আরও জানান, একজন আমদানিকারককে কমপক্ষে ১ হাজার ট্যাক্সি আনতে হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রত্যেক ট্যাক্সিতে অবশ্যই জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস সংযুক্ত থাকতে হবে। ১৯৯৮ সালে ঢাকার রাস্তায় ট্যাক্সি ক্যাব সার্ভিস চালু করে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। সে সময় একজন আমদানিকারককে কমপক্ষে ২০টি ট্যাক্সি আমদানি করতে হতো। ২০১০ সালে এ সংখ্যা করা হয় ১ হাজার।

দুই বছর আগে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ট্যাক্সি ক্যাব বিষয়ক গেজেটে ‘এসি ও নন-এসি’ মিলিয়ে চার ধরনের (চার রঙয়ের) ট্যাক্সি ক্যাবের কথা বলা হয়। এর মধ্যে ১৩০০ সিসি ক্ষমতার হলুদ ট্যক্সি ক্যাব, ৮০০ সিসির নীল, সিএনজি চালিত নয়- এমন কালো ট্যাক্সি ক্যাব বর্তমানে চলতে দেখা যায়। ২০০০ সিসি ক্ষমতার ‘অপেক্ষাকৃত বড়’ সবুজ ট্যাক্সি ক্যাবের কথা গেজেটে লেখা হলেও ঢাকার রাস্তায় তা দেখা যায় না। ‘ইকোনমিক লাইফ’ হিসেবে গেজেটে প্রতিটি ট্যাক্সি ক্যাবের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ১০ বছর।

ঢাকা মহানগর ট্যাক্সি ক্যাব (লিজ) মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক বলেন, “রাজধানীতে বর্তমানে চালু ট্যাক্সি ক্যাবের বেশির ভাগই ২০০২-২০০৩ সালে নিবন্ধিত। ফলে নিয়ম অনুযায়ী ২০১৩ সাল নাগাদ রাজধানীর প্রায় সব ট্যাক্সি ক্যাবের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাবে।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের উদাসিনতার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, “আগে ট্যাক্সি আমদানির ক্ষেত্রে অন্তত ২০টির সংখ্যা বেঁধে দেয়া থাকলেও নতুন নিয়মে অন্তত ১০০০ ট্যাক্সি আনার কথা বলা হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমদানিকারকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ কারণেই এখন পর্যন্ত বিআরটিএ কোনো কোম্পানির সাথে চুক্তি করতে পারেনি।” সমিতির পক্ষ থেকে এ সংখ্যা কমিয়ে ৫০টি করার প্রস্তাব দেয়া হলেও সরকার তা কানে তোলেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক সারোয়ার জাহান জানিয়েছেন, ট্যাক্সি ক্যাব সেবা বিলুপ্ত হয়ে গেলে মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার চাহিদা আরো বাড়বে। আর ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা যতো বাড়বে, সড়কে এর প্রভাব ততোই মারাত্মক হবে। তিনি বলেন, “সরকার ট্যাক্সি ক্যাব আমদানির বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিয়ে আগে পাবলিক ফোরামে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। যে কোনো পরিকল্পনা নেয়ার আগে চিন্তা করা প্রয়োজন- এটা আসলে সম্ভব কি না।”

মিটারে চলে না সিএনজি বা ট্যাক্সি

ট্যাক্সি ক্যাব সেবা চালুর সময়েই নিয়ম করা হয়েছিল- প্রতিটি ক্যাব মিটার অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় চলবে। কিন্তু সেই নিয়ম থেকে গেছে খাতা কলমেই। অন্যদিকে সরকারি গেজেট অনুসারে রাজধানীতে ট্যাক্সি ক্যাবের জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নির্মাণের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত তা হয়নি। এ কারণে নানা ধরনের হয়রানিতে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ মালিক-চালকদের।

ঢাকা মহানগর ট্যাক্সি ক্যাব (লিজ) মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি সারোয়ার হোসেন বলেন, “যে সময় ট্যাক্সির ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল তার তুলনায় এখন খরচ বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। আমরা কয়েক দফা ভাড়া পুনঃনির্ধারণের অনুরোধ জানালেও বি আরটিএ কিছু বলছে না।” বিআরটিএর প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক সাইফুল হক বলেন, “পার্কিংয়ের স্থান সিটি করপোরশেনের দেয়ার কথা। আমরা তাদের সাথে আলোচনা করেছি। তারা আজ দেব, কাল দেব বললেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।”

এমন নানা ধরণের সমস্যায় নিমজ্জিত হয়ে রাজধানীবাসীদের চরম দুর্ভোগের মধ্যেই পড়তে হচ্ছে। মিটিং কিন্বা আলোচনা সভায় যাত্রীদের কথা বলা হলেও তা শুধুই কাগজে কলমে রয়ে যায়। বর্তমানে সিএনজি ও ট্যাক্সি ক্যাব যেগুলো রাস্তায় চলাচল করছে সেগুলো তাদের ইচ্ছে মতো ভাড়া হাকছে। যাত্রীরা বাধ্য হয়ে কখনও কখনও ডবল ভাড়া দিয়ে চলাচল করছে। অথচ আইনগুলো যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হতো তাহলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। প্রতিটি ট্যাক্সি ক্যাব কিন্বা সিএনজির পেছনেই পুলিশ কন্ট্রোল রুমের নাম্বার দেওয়া আছে। কিন্তু সেগুলোও কাগুজে নাম্বারে পরিণত হয়েছে। কারণ ওই নাম্বারে ফোন করে আজ পর্যন্ত কেও উপকার পেয়েছেন এমন নজির নাই! আর এভাবেই চলছে রাজধানীবাসীর জীবন।

Advertisements
Loading...