মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছে উদ্বেগজনকভাবে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভিমত অনুযায়ী নেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন চেষ্টাই কাজে আসছে না। দিনের পর দিন ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে মূল্যস্ফীতির হার। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বড়ই করুণ অবস্থায় দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সোনার দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, খাদ্যশস্যের দাম বৃদ্ধি, ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধিসহ বিবিধ কারণে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই করুণ অবস্থায় রয়েছে। তারওপর সামপ্রতিক সময়ে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এমতাবস্থায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
সর্বশেষ তথ্য মতে, ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে ফের বেড়েছে মূল্যস্ফীতির পারদ। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১১.৫৯ শতাংশ। ডিসেম্বরে তা ছিল ১০.৬৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সমপ্রতি এক সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য প্রকাশ করে। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শাহজাহান আলী মোল্লা বলেন, প্রধানত চাল, ডাল, ডিম, মাছ, ফল, ভোজ্যতেল ও প্যাকেটজাত দুধের দাম বৃদ্ধি খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে। আর খাদ্য বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে বাড়ি ভাড়া, পরিবহন ব্যয়, পরিধেয় বস্ত্র এবং গৃহস্থালী ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে শনাক্ত করেছে বিবিএস।
এদিকে মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নাভিশ্বাস বাড়লেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আশানুরূপ পদক্ষেপ না থাকায় সমস্যায় পড়েছে সাধারণ মানুষ। নিম্নবিত্তের কোটা ছাড়িয়ে তা মধ্যবিত্তের আঘাত হানতে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, তৈরি হচ্ছে শ্রেণী-বৈষম্য। ক্ষোভ বাড়ছে মানুষের।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, সরকারের নানামুখী ভুল সিদ্ধান্তগুলো মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এসব ভুলের খেসারত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। পরিস্থিতি এমন পর্যায় চলে যাচ্ছে যে, অসহায় মানুষ মূল্যস্ফীতির ভার আর সইতে পারছে না। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছে উদ্বেগজনকভাবে। আর্থিক ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর কোন পদক্ষেপ না থাকায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে।
বিবিএস আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, জানুয়ারিতে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০.৯০ শতাংশ এবং খাদ্য বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতির হার ১৩.১৬ শতাংশ। জানুয়ারিতে গ্রামে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১১.১৫ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ছিল ১৩ .২৫ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে জানুয়ারিতে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০.১৮ শতাংশ এবং খাদ্য বহির্ভূত খাতে ১৩.২৩ শতাংশ। জানুয়ারিতে শহরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১২.৭৩ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে ছিল ১১.৬২ শতাংশ। শহরে জানুয়ারিতে খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার ১২.৫৬ শতাংশ এবং খাদ্য বহির্ভূত খাতে তা ১২.৯৭ শতাংশ। গত এক বছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০.৯১ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি অনেক দিন ধরেই দুই অঙ্কের কোটায় রয়েছে। দেশের অর্থনীতি সঙ্কটে নেই বলে অর্থমন্ত্রী দাবি করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাটাকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন তিনিও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অধিকাংশ পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে ডলারের দাম সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাবে ডলারের দাম কমছে না। আর এর নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। পরিসংখ্যান মতে, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে অব্যাহতভাবে ডলারের দাম বেড়েই চলেছে, মনে হচ্ছে নিয়ন্ত্রণের কেও নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ। এতে আমদানিকৃত সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদিত পণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। নিম্নবিত্তের কোটা ছাড়িয়ে তা মধ্যবিত্তে আঘাত হানতে শুরু করেছে। তৈরি হচ্ছে শ্রেণীবৈষম্য। ক্ষোভ বাড়ছে সব পেশাজীবী মানুষের।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে দুটো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কারণ একদিকে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি, অপরদিকে কমে যাচ্ছে জিডিপির প্রবৃদ্ধি। তিনি এর সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরি বলে মত দেন। তিনি বলেন, এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। ডলারের দাম বৃদ্ধির ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, ফলে এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। বিশেষ করে আমদানি পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, ডলারের দাম বাড়ছে বলেই আমদানি ব্যয় বাড়ছে। আর আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আর জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষকে বেশি কষ্ট পোহাতে হচ্ছে।
জানা গেছে, জিনিসপত্রের দাম উর্ধ্বমুখী হওয়ায় সীমিত আয়ের অনেকে প্রয়োজনীয় পণ্য তালিকা থেকে কিছু কিছু পণ্য কেনা বাদ দিচ্ছেন। এরই মধ্যে অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে বাজার। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাড়ছে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা। এ অবস্থায় স্বল্প আয়ের মানুষও ক্রমান্বয়ে শংকিত হয়ে পড়ছে।
ভোক্তা সংরক্ষণ সংস্থা ক্যাবের তথ্য মতে, ২০১১ সালের বছরজুড়ে নিত্যপণ্যসহ সব ধরনের বাজার ছিল বেসামাল। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক বছরে ২৬টিরও বেশি পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, টানা ১১ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের নানামুখী ভুল সিদ্ধান্তগুলো মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এসব ভুলের খেসারত সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। পরিস্থিতি এমন পর্যায় চলে গেছে যে, অসহায় মানুষ মূল্যস্ফীতির ভার আর সইতে পারছে না। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছে উদ্বেগজনকভাবে। আর্থিক ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর কোন পদক্ষেপ না থাকায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করছে। এমনকি সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার সবার উপরে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে গড় মূল্যস্ফীতি ১১.৫৯ শতাংশ, পাকিস্তানে এ হার ১০.২০ শতাংশ, ভারতে মূল্যস্ফীতির হার গড়ে ৯.৩৪ শতাংশ, শ্রীলংকার গড় মূল্যস্ফীতি ৬.৯০ শতাংশ, চীনে ৪.২০ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ৩ শতাংশ। নেপালে ৮ শতাংশ, ভুটানের মূল্যস্ফীতি ৭.১৪ শতাংশ, আফগানিস্তানে ৪ শতাংশ, মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ। (তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর) #

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...