জাল টাকার ‘জনকের দক্ষতায়’ বিস্মিত বিশেষজ্ঞরা!

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ জাল টাকা এতোটাই সুক্ষ্মভাবে তৈরি করা হচ্ছে যে, তা দেখে বিশেষজ্ঞরাও বিস্মিত হয়েছেন। সমপ্রতি জাল টাকার এক হোতা ধরা পড়ার পর জার্মানি একটি বিশেষজ্ঞদল জালকারিদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের সরঞ্জামাদি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

‘জাল টাকা কারখানার জন্য প্রয়োজন দু’লাখ টাকার সরঞ্জামাদি। কারিগর দুইজন। আর প্রয়োজন জাল টাকা বাজারজাত করার জন্য উচ্চাকাক্সক্ষী কিছু কর্মী। জাল টাকার তৈরির অভিজ্ঞতা ১৪ বছরের । এ সময়ের মধ্যে একবারই পুলিশের হাতে গ্রেফতার। ২১ মাস জেলবাস। কথাগুলো জাল টাকার ‘জনক’ হিসেবে পরিচিত দুরুজ্জামান ওরফে মাস্টার ওরফে জামান বিশ্বাসের। আর স্রোতা জার্মানির সেন্ট্রাল ব্যাংকের টেকনিক্যাল কর্মকর্তা (ইউরোসিস্টেম এ্যাডভাইজার) জেনস ফারম্যান। গত সপ্তাহে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা দফতরে গ্রেফতার হওয়া দুরুজ্জামানের মুখোমুখি হয়েছিলেন এই জার্মান বিশেষজ্ঞ। সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের দু’জন সিনিয়র কর্মকর্তা। তিনি জালটাকার কারিগর দুরুজ্জামানের ‘দক্ষতায়’ রিতিমত বিস্ময় প্রকাশ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কথা বলেন দুরুজ্জামানের সঙ্গে। দেখেন তার জাল টাকা তৈরির কৌশল।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) রাজধানীর ডেমরা ও কামরাঙ্গিচর এলাকা থেকে গত সমপ্তাহে ১০ কোটি জাল টাকাসহ গ্রেফতার করে দুরুজ্জামানসহ ১০ জনকে। এদের মধ্যে তিনজন নারী। ডিবি পুলিশ তাদেরকে দুইটি মামলায় ৯ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

জানা গেছে, জার্মানির ইউরো মুদ্রা বিশেষজ্ঞ জেনস ফারম্যান বাংলাদেশ ব্যাংকের আমন্ত্রণে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। তার সফরের উদ্দ্যেশ বাংলাদেশের মুদ্রা টাকার মান বৃদ্ধির ব্যাপারে পরামর্শ প্রদান। জাল মুদ্রা আটক হবার পর তিনি জালটাকার কারিগরদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাকে নিয়ে মিন্টুরোডস্থ মহানগর গোয়েন্দা দফতরে হাজির হন। ডিবি এডিসি (পশ্চিম) মশিউর রহমানের রুমে তিনি কথা বলেন দুরুজ্জামানের সঙ্গে। আর দোভাষীর কাজটিও করেন এডিসি নিজেই। জেনস ফারম্যানের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে দুরুজ্জামান জাল টাকা তৈরির বিস্তারিত বর্ণনা করেন।

দুরুজ্জামান জানান, তার পৈত্রিক বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জে। বর্তমানে কুষ্টিয়ায় বাড়িঘর করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। দুরুজ্জামানের দাবি তিনিই বাংলাদেশে জাল টাকার সূচনা করেন। এসএসসি পাস করার পর রাজশাহীতে আকবর নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে একসাথে আর্ট করতেন। আকবরের বাড়ি নওগাঁয়। সময়টা ১৯৯৪ সাল। এরপর ১৯৯৮ সালের প্রথমদিকে আকবর তাকে একশত টাকার সাদাকালো ফটোকপি করা একটি নোট কালার করতে বলেন। দুরুজ্জামান তা নিখুঁতভাবে করে দেন। আর তখন থেকে তার মনে টাকা জাল তৈরির চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। এরপর ১৯৯৯ সালের প্রথম দিকে রাজশাহী থেকে ঢাকায় পাড়ি জমান। বাসা ভাড়া নেন জিগাতলায়। জালটাকা তৈরির জন্য ৮০ হাজার টাকা দিয়ে কেনেন কালার ফটোকপি মেশিন ।

দুরুজ্জামান জানান, প্রথমে কালার ফটোকপি দিয়ে নোটের উভয় দিক ফটোকপি করার পর স্কীন প্রিন্টের মাধ্যমে দেওয়া হত বাঘের মাথার জলছাপ। এরপর ফয়েল কাগজে হিট দিয়ে বসানো হতো সিকিউরিটি সূতা। ঐ সময় জাল এক লাখ টাকা (পাঁচ শতটাকা দুই বান্ডিল) বিক্রি করতেন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।

তিনি জানান, শুরুতে জাল টাকার ব্যবসা ভালই চলছিল। কিন্তু জাল টাকার কারখানা চালু করার কয়েকমাসের মধ্যেই জালটাকা বিক্রির সময় ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় তার সহযোগী হেলাল। আর হেলালের কারণেই ডিবি পুলিশ তাকে কালার ফটোকপি মেশিনসহ গ্রেফতার করে। আর গ্রেফতার হওয়ার পর ২১ মাস জেলবাস। পরে জামিনে মুক্তি মেলে। তবে ঐ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি এখনও বিচারাধীন। কিন্তু জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আবার ব্যাপকভাবে শুরু করেন জালটাকার ব্যবসা। সংগ্রহ করেন কম্পিউটার, কালার প্রিন্টার এবং বিভিন্ন রকমের কেমিক্যাল । নতুন কারখানায় শুধু জাল টাকাই নয়। ভারতীয় রুপিও তৈরি করেন। নতুনভাবে শুরু হওয়ার দশ বছরের মধ্যে পুলিশের ঝামেলা পোহাতে হয়নি।

অপর এক প্রশ্নের ব্যাপারে দুরুজ্জামান জানান, এক লাখ টাকার জাল নোট তৈরিতে খরচ পড়ে পনেরশত টাকা। আর বিক্রি করেন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়। এরপর তাদের কাছ থেকে একটি গ্রুপ কেনে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে। ঈদ ও পূজার সময়ই জাল টাকা বেশী তৈরি করা হয়। আর ভারতীয় জাল রুপি কিনে নেয় ভারতীয় বেশ কয়েকজন নাগরিক।

জার্মানির ইউরো মুদ্রা বিশেষজ্ঞ জেনস ফারমান প্রায় দুই ঘন্টা ধরে গভীর মনোযোগ দিয়ে দুরুজ্জামানের কথা শোনেন। আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নেন নানা প্রশ্নের জবাব। শেষে জাল টাকার কারিগরদের ধরার জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান ডিবি কর্মকর্তাদের।

Advertisements
Loading...