কোচিং বন্ধের নীতিমালা না মানলে ছয় মাসের জেল : শিক্ষা আইন-২০১২-এর খসড়া চূড়ান্ত

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ প্রাইভেট টিউশন বা কোচিংয়ের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক জারিকৃত নীতিমালা বা পরিপত্র অমান্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি বা বেসরকারি স্কুল-কলেজের কোনো শিক্ষক নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। তবে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জনকে পড়াতে পারবেন। এই নীতিমালা অমান্য করার অপরাধে অভিযুক্তরা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এমনই কঠোর বিধান রেখে ‘শিক্ষা আইন-২০১২’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

নীতমালার মধ্যে রয়েছেঃ

# বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতির পরিপন্থি কার্যক্রম পরিচালনা করা দন্ডনীয় অপরাধ।
# নিবন্ধন ছাড়া কোনো স্তরেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যাবে না।
# শিক্ষা জীবন শুরু হবে চার বছর বয়সে।

শুধু তাই নয় শ্রেণিকক্ষে অননুমোদিত বই পাঠ্য করা, নোট-গাইড বিক্রয়, অনুমোদন ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একই সাথে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কীভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে তার বিধান রয়েছে এ আইনে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমতি ছাড়া শিক্ষাক্রমে অতিরিক্ত হিসেবে কোনো বিষয় বা পুস্তক অন্তর্ভুক্ত করলে কিংবা স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাঙালি সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর নিজ সংস্কৃতির পরিপন্থি কার্যক্রম পরিচালনা করলে অনধিক দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা ৬ মাসের জেল দেয়া হবে।

সরকারিভাবে নিষিদ্ধ গাইড বই বা নোট বই প্রকাশ, পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তি নোট বা গাইড বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার, বিক্রয় বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে মজুদ বা গাইড বা নোট বই ক্রয়ে শিক্ষার্থীদের প্ররোচিত বা বাধ্য করলে সর্বোচ্চ দুই লাখ বা ৬ মাসের জেল দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য। গত বছরের ১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১১ সদস্যের ‘শিক্ষা আইন খসড়া প্রণয়ন’ কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান হিসেবে কাজ করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব (অডিট ও আইন) মো. রফিকুজ্জামান। কমিটিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সচিব. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালকরাও রয়েছেন।

খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্তরে বেসরকারি বিদ্যালয় নিবন্ধন না করলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা ৬ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। বেসরকারি মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় নিবন্ধন না করে পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা এক বছর কারাদণ্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অনুমোদনবিহীন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার বা টিউটোরিয়াল কেন্দ্র পরিচালনা করলেও একই শাস্তি পেতে হবে।

খসড়ায় বলা হয়, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে নিবন্ধন ছাড়া কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা করা যাবে না। খসড়া আইনের প্রথম অধ্যায়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কীভাবে চলবে তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এই অধ্যায়ে প্রাথমিক স্তরের জন্য শিক্ষক নির্বাচন গঠনের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা ও জীবনব্যাপী শিক্ষা, তৃতীয় অধ্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষা, চতুর্থ অধ্যায়ে উচ্চ শিক্ষার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

খসড়ায় বলা হয়, শিক্ষা জীবন শুরু হবে ৪ বছর বয়সে প্রাক-প্রাথমিক স্তর দিয়ে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক স্তর চালু করা হবে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে পরিচালিত হবে।
খসড়ায় আরও বলা হয়, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি ফি এবং যাচাই পরীক্ষা গ্রহণ করা যাবে না। ভর্তির ক্ষেত্রে কোন শিশুর প্রতি কোন প্রকার বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না। পরীক্ষার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক লটারির ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।

মাধ্যমিক শিক্ষা তদারকির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক মান ও শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ব্যয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমমান ইত্যাদি বিষয়ে জাতীয় সংসদ ও সরকারকে রিপোর্ট প্রদানের জন্য ‘প্রধান শিক্ষা পরিদর্শক’-এর কার্যালয় স্থাপন করা হবে। এছাড়া কৃষি শিক্ষার জন্য ‘সমন্বিত মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি’ থাকবে। খসড়ায় প্রাথমিকের মত মাধ্যমিকেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘পরিচালনা পরিষদ’ ও ‘অভিভাবক-শিক্ষক পরিষদ’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

মাধ্যমিক মাদ্রাসার প্রশাসনিক কাজ সুষ্ঠুভাবে করার জন্য ‘মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং কওমি মাদ্রাসা যুগোপযোগী করার জন্য ‘কওমি মাদ্রাসা কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খসড়া নিয়ে সভা-সেমিনার করে মতামত নেয়া হবে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও শিক্ষা আইন প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। এটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হবে। ধারণা করা হচ্ছে এটি পাস হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা দূর হবে।

Advertisements
Loading...