অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে ওষুধের দাম: সংকটে সাধারণ মানুষ

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ওষুধের দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। কারণ নিম্ন আয়ের মানুষ মাছ, মাংস বা অন্য কোন পণ্য সামগ্রীর দাম বাড়লে কৃচ্ছতা সাধনের মাধ্যমে ব্যয় সংকুলান করে থাকেন কিন্তু অসুখ হলে ওষুধের বিকল্প নেই। আর তাই দেশের স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ আজ পড়েছে বড়ই সংকটে। গত ৩ মাসে ওষুধের দাম বেড়েছে ১৫% থেকে ১০০% পর্যন্ত।

এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ওষুধের দাম বেড়েছে ১৫% থেকে ১০০% পর্যন্ত। বিশেষ করে সাধারণ ওষুধ যেমন প্যারাসিটামল, এন্টাসিড, নেট্রোমেটাজল গ্রুপের সব ওষুধ এবং জরুরি রোগীদের দেওয়া হয় স্যালাইনের দামও বেড়েছে বহুগুণ। ৫০ টাকা দামের একটি স্যালাইনের দাম বেড়ে হয়েছে ২২০ টাকা! ওষুধের গায়ে যে দাম লেখা আছে সেই দাম অনুযায়ী ওষুধ বিক্রির বিধান থাকলেও সে বিধান মানা হচ্ছে না। যে ওষুধের গায়ে লেখা আছে ১৫ টাকা তার দাম দেওয়া হচ্ছে ২৫ বা ৩০ টাকা। বিক্রেতাদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তারা অজুহাত দেখাচ্ছেন, হঠাৎ করে দাম বেড়েছে, যে কারণে কোম্পানিগুলো পূর্বের ওষুধ আমাদের বেশি দামে দিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে আমরা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। এরকম খোড়া যুক্তি দেখিয়ে বহু ওষুধের দাম রাখা হচ্ছে পূর্বের দামের থেকে বহুগুণ বেশি। অথচ দেখার কেও নেই। এ বিষয়ে জনৈক ওষুধ ব্যবসায়ী বলেন, প্রায় ওষুধের দাম বেড়েছে। তিনি জানান গ্যাসের ওষুধ রেনিটিড আগে ছিল ২০ টাকা পাতা এখন সেটি ২৫ টাকা পাতা। শিশুদের ওষুধ নাপা সিরাপ পূর্বে বিক্রি হতো ১৩ টাকায় তা এখন বিক্রি হচ্ছে ২১ টাকায়। এলাকটল ট্যাবলেট পূর্বে বিক্রি হতো ২৫ এখন ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ করে এটুকু বোঝা গেছে, ব্যবসায়ীদের লাভের কোন ফারাক হয়নি। দাম কম থাকতে যা ছিল এখনও সেই ১২ বা ১৩% লাভ দেওয়া হয়। মাঝখান থেকে ক্রেতাদের মাশুল গুণতে হচ্ছে।

এদিকে ওষুধ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এক প্রকার নীরব ভূমিকা পালন করছে। তাদের নাকের ডগায় বিক্রি হচ্ছে বর্ধিত দামে ওষুধ কিন্তু তারা নির্বিকার হয়ে তা দেখছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ওষুধ প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, আমরা জানি অনেক ওষুধের দাম বেশি রাখা হচ্ছে কিন্তু আমাদের তেমন কোন লোকবল নেই। আমরা ইচ্ছা থাকা সত্বেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছি। অথচ এই ওষুধ প্রশাসনের বেধে দেওয়া দামের বেশি কোন ওষুধ বাজারে আসার কথা নয়।

এ বিষয়ে দেশের নামি-দামি একটি ওষুধ কোম্পানির এক কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রথমে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে দাম বাড়িয়েছি। সারাবিশ্বেই সব কিছুর দাম বেড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বাজেটে সরকার ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কোন কর বৃদ্ধি করেনি। এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, কাঁচা মালের দাম না বাড়লেও পরিবহনসহ অন্যান্য কষ্ট বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত যে কারণে ওষুধের দাম বাড়ানো ছাড়া আমাদের কোন উপায় ছিল না।

অপরদিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি বেক্মিমকো ফার্মার এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমাদের কোম্পানির কোন ওষুধের দাম বাড়েনি। আমাদের অনেক ওষুধের দাম কম ছিল, সেগুলো এডজাস্ট করা হয়েছে। তাছাড়া দাম বাড়ানোর এখতিয়ার আমাদের নেই। ড্রাগ প্রশাসন এগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তারাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে।

জাতীয় ওষুধনীতি নিয়েও রয়েছে নানা সমালোচনা-নানা অভিযোগ। প্রায় ৩০ বছরের ব্যবধানে জনগণের ওষুধনীতিকে এখন ব্যবসায়ীদের ওষুধনীতি বানানো হয়েছে। অবাধে চলে ওষুধ নামক পণ্যসামগ্রীর অবাধ ও অনৈতিক বিপণন। ওষুধনীতি অনুযায়ী দেশের বাজারে নতুন কোনো ওষুধ বিপণনের অনুমতি দেওয়ার আগে যে শর্তগুলো পূরণ করতে হয়, এর একটি হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নির্ণয়ের জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করা। সেটি না করেই উন্নত কয়েকটি দেশে বিক্রি হচ্ছে এমন সার্টিফিকেট নিয়ে অবাধে আমাদের বাজারে প্রবেশ করছে বিদেশি ওষুধ। এসব ওষুধের প্রয়োজনীয়তার দিক বিবেচনা করা হয় না, এগুলোর যাচাই-বাছাই বা মান নিয়ন্ত্রণেরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। ফলে ফুড সাপ্লিমেন্ট, ভিটামিন, টনিক, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, মেদ কমানো ইত্যাদি ওষুধে আমাদের বাজার ছেয়ে গেছে। চটকদার বিজ্ঞাপনের কারণে মানুষ সেগুলো কিনছেও দেদারসে। এক শ্রেণীর দায়িত্বজ্ঞানহীন চিকিৎসকও রোগীদের এসব ওষুধ কিনতে বাধ্য করছেন। সেই সঙ্গে নিম্নমানের কিংবা ভেজাল ওষুধের কারবার তো এ দেশে অনেক দিন ধরেই চলে আসছে। পত্রপত্রিকায় আমরা প্রায়ই বাজারে ভেজাল ও নকল ওষুধ নিয়ে নানা ধরনের আতঙ্কজনক প্রতিবেদন দেখি। ইটের গুঁড়ার সঙ্গে নানা ধরনের কেমিক্যাল মিশিয়ে ওষুধের নামে জালিয়াতির ঘটনাও ঘটে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাতে সে রকম কারখানাও ধরা পড়েছে। শুধু ভেজাল নয়, বিষাক্ত ওষুধ বিপণনের মতো বেদনার্ত স্মৃতিও আমরা ধারণ করে আছি। একাধিক প্যারাসিটামল ট্র্যাজেডির দুঃসহ স্মৃতি এখনো আমাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি অতীতে এ ব্যাপারে কিছুটা সরব হলেও কার্যত অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

সভ্য দেশের দাবিদার বাংলাদেশের জনগণের স্বাস্থ্য নিয়ে এ ধরনের প্রতারণাপূর্ণ বিপণন কর্মকাণ্ড চলা উচিত নয়।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...