২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ২০৫ টন ফরমালিন আমদানি করা হয়েছে ॥ ফরমালিনের অবাধ আমদানি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ অবশেষে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ফরমালিনের অবাধ আমদানি নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০১২-২০১৫’-এর অন্তর্ভুক্ত করে এই নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। খবর পত্রিকা সূত্রের।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আমদানি) কমল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য গতকাল ৫ নভেম্বর বলেন, ফরমালিনের ব্যবহার অত্যন্ত মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মাছ, ফলমূল থেকে শুরু করে সবজিতেও এটা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ অবস্থায় ফরমালিন আমদানি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করার কোনো বিকল্প নেই।

আমদানি নীতি আদেশ ২০০৯-২০১২ অনুযায়ী, ফরমালিন আনার ব্যাপারে কোনো বাধা বা শর্ত নেই। যে কেও যেকোনো পরিমাণে ফরমালিন আমদানি করতে পারেন। এর ফলে এই রাসায়নিকের অপব্যবহার হচ্ছে উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা জানান, আমদানি নিষিদ্ধ করার পর লাশ সংরক্ষণসহ ল্যাবরেটরিতে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ ফরমালিন আমদানির অনুমোদন দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলো তাদের প্রয়োজন মতো ফরমালিন আমদানির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র পাওয়া সাপেক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কেস টু কেস ভিত্তিতে আমদানির অনুমোদন দেবে। আর আমদানি করা ফরমালিন কোথায়, কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সে তথ্যও সংগ্রহ করবে সরকার। এর ফলে ফরমালিনের অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী তিনি।

২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ২০৫ টন ফরমালিন আমদানি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবি আর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ২০৫ টন ফরমালিন আমদানি করা হয়েছে। দেশে দুই ধরনের ফরমালিন আমদানি হয়। ভালো ফরমালিনের দাম লিটারপ্রতি ৮০০ টাকার বেশি, যা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, রোগ নির্ধারণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হয়। আর সাধারণ ফরমালিনের দাম লিটারপ্রতি ৩০ টাকা। সেগুলো অহরহ বিভিন্ন দোকানে পাওয়া যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর বেশির ভাগই খাদ্যপণ্যে মেশানো হয়।

দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে কঠোর আইন করার দাবি জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে।

সদ্য এনবি আরের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. গোলাম হোসেন মাস কয়েক আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকাকালে ফরমালিনের অপব্যবহার সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান এভাবে, ‘একদিন দেখি আমার বাসার সামনের গলিতে কড়া রোদের মধ্যে একজন লোক কিছু ইলিশ মাছ নিয়ে বসে আছে। মাছের ফুলকা দেখিয়ে সে আমাকে বলে, স্যার তাজা মাছ আছে। আমি তাকে বলি, এত রোদের মধ্যে মাছগুলো রেখে দিয়েছো, এগুলো তো পচে যাবে। মাছ বিক্রেতা জোর গলায় বলে, পচবে না স্যার। তখন আমি বললাম, তোমার পাতিলে কি বরফ আছে সে বলল আছে। কিন্তু বিশ্বাস না হওয়ায় আমি ঢাকনা উঁচিয়ে দেখি পাতিলে কোনো বরফ নেই। পাতিলে আছে ফরমালিন মেশানো পানি। কিছুক্ষণ পরপর সেখান থেকে কিছু পানি ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে মাছের গায়ে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কমল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য জানান, এখন শাক-সবজিতেও ফরমালিন ব্যবহার করা হচ্ছে। বাজারে থাকা টমেটোগুলোতে পচন ধরছে না ফরমালিন ব্যবহারের কারণেই।

অবাধে ফরমালিন আমদানি নিষিদ্ধ হওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পেইন্ট, ডাইস ও কেমিক্যাল মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, ‘কিছু রাসায়নিক আছে, যেগুলো শিল্পের জন্য প্রয়োজন; আবার অপব্যবহার ক্ষতিকারক। কিছু এসিড বিভিন্ন সময় মানুষের খাবার তৈরিতে কাজে লাগে। কিছু এসিড ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। আবার মুখ ঝলসে দেওয়ার মতো অপরাধেও এসিড ব্যবহার করা হয়। আমরা ফরমালিনের মতো এসব রাসায়নিক ব্যবহারেরও নীতিমালা চাই।’

আবদুস সালাম বলেন, সরকার ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ফরমালিন আমদানি করতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের শিল্প বা গবেষণার কাজে প্রয়োজন হলে সেখান থেকে কিনতে পারবে। তবে টিসিবি থেকে কেনার ক্ষেত্রেও একটা নীতিমালা থাকতে হবে।

ফরমালিনমুক্ত বাজার প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বন্দুকের গুলির চেয়েও ফরমালিন খারাপ। বন্দুকের একটি গুলিতে একজন মানুষের মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু ফরমালিন পুরো জাতির স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। বন্দুকের গুলি সরকার আমদানি করে ব্যবসায়ীদের দেয় বিক্রি করার জন্য। আমরা চাই, টিসিবির মাধ্যমে আমদানি করে সরকার প্রকৃত প্রয়োজন অনুসারে ফরমালিন সরবরাহ করুক।’

উল্লেখ্য, অত্যন্ত সহজলভ্য হওয়ায় সামপ্রতিক সময়ে ফরমালিনের ব্যবহার বেড়েছে। শাক-সবজি, তরি-তরকারি ও মাছে ফরমালিন দেওয়ায় মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Advertisements
Loading...