গাড়ির বাজার মন্দা: ক্রেতা কমেছে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, প্রাডো

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ বিলাসবহুলসহ সব ধরনের গাড়ির বাজারে ক্রেতা কমে গেছে। বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ, প্রাডোর মতো নামী-দামি গাড়ি বিক্রি গত বছরের তুলনায় অর্ধেকও হয়নি এ বছর। বাজারে নেই পুরনো গাড়ির ক্রেতাও। খারাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এ জন্য দায়ী- ব্যবসায়ীরা এমনটাই মনে করছেন।

অন্যান্যবার দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বেচা-কেনায় মন্দাভাব দেখা গেলেও এবার ঠিক উল্টো। এবার হরহাল-ধর্মঘট নেই দেশের পরিস্থিতি বর্তমানে মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে তারপরও গাড়ির বাজারে কেনো এতো মন্দাভাব সে বিষয়ে গাড়ি কেনাবেচার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যবসায়ী বলেছেন, বাজেটে শুল্ক বৃদ্ধি, ডলারের দাম বেড়ে টাকার মূল্য কমে যাওয়ায়, ব্যাংক ঋণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরুৎসাহিত ও ঋণে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে এই করুণ পরিস্থিতি। গাড়ির শুল্ক বাড়ানো ও ব্যাংক ঋণ কমানোর ফলে উচ্চ ও মধ্যবিত্তের গাড়ি কেনার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। গত বছরের তুলনায় অর্ধেক পরিমাণ গাড়ি বিক্রয় না হওয়া হতাশ ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জার্মানির তৈরী বিএমডব্লিউ নভেম্বর পর্যন্ত ৫০টি গাড়ি বিক্রি হয়েছে। সেই ২০১২ সালের পর হতে এ পর্যন্ত গড়ে প্রতি মাসে ৫টি বিএমডব্লিউ ব্র্যান্ডের গাড়ি বেচতে হিমশিম খাচ্ছেন আমদানিকারকরা। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ১৩০টি গাড়ি। তাতে প্রতি মাসে ১১ টি গাড়ি বিক্রি হয়েছে। বাংলাদেশে বিএমডব্লিউ’র ৫ সিরিজের মডেলের গাড়িগুলো ক্রেতারা বেশ ভাল পছন্দ করেন। দাম ১ কোটি ৫৫ লাখের টাকার মতো। এই সিরিজে ৫২০ডি ও ৫২০আই মডেলের গাড়ি রয়েছে। বললেন এক্সিকিউটিভ মোটর্সের মার্কেটিং ম্যানেজার আসিফ সুলতান। তাদের শো-রুমে সর্বনিম্ন ৯৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি রয়েছে। ৩ সিরিজের নতুন মডেলের রয়েছে (৩২০আই ও ৩২৮আই) গাড়ি। যেগুলো অক্টেনে চলে। ৭ সিরিজের গাড়ি (৭৩০এল ও ৭৩০আই) মডেলের। এগুলো বাংলাদেশে চলে না। দাম পড়বে ৪ কোটি টাকা।

বাজেটে শুল্ক বৃদ্ধি, ডলারে দাম ও ব্যাংক ঋণে নিরুৎসাহিত করার কারণে গাড়ি বিক্রিতে ধস বলে তিনি মন্তব্য করেন। ২০০০ সিসি’র গাড়ির শুল্ক ২৯০ শতাংশ। ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার দামের উপরে গাড়ি কিনতে ব্যাংকের ঋণ পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়াকড়ি রয়েছে। মার্সিডিজ বেঞ্জ এই পর্যন্ত ৬টি গাড়ি বিক্রি করেছে। চলতি বছরে প্রায় দু’মাসে এই ব্র্যান্ডের গড়ে একটি গাড়ি বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এই ব্র্যান্ডের ২৫টি গাড়ি বিক্রি করেছিল। গড়ে প্রতি মাসে ২টি করে জানান, মার্সিডিজ বেঞ্জ আমদানিকারক স্থানীয় প্রতিনিধি রেনকন মোটর্সের ডেপুটি মার্কেটিং ম্যানেজার সাকিব।

তিনি আরও জানান, তাদের কোম্পানিতে বাংলাদেশে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দামের গাড়ি বিক্রি হচ্ছে। প্রাডো গাড়ির আমদানিকারক স্থানীয় এজেন্ট নাভানা লিমিটেডের সহকারী মার্কেটিং ম্যানেজার লুৎফুল করিম জানান, গত বছর তারা ৩১টি গাড়ি বিক্রি করেছিলেন। গড়ে প্রতি মাসে দু’টির বেশি গাড়ি বিক্রি হয়েছিল। এবার এই পর্যন্ত মাত্র ৯টি গাড়ি বিক্রি হয়েছে। যা গড় করলে মাসে একটিও পড়ে না। ক্রেতা নেই বললেই চলে। যে সব ব্যক্তি কম সিসি’র রিকন্ডিশন গাড়ি কেনার কথা ভেবেছিলেন তারা এখন আর পারছেন না। রিকন্ডিশন গাড়ি গত বছরে ১০০ টি বিক্রি হলে সেটা এখন ৪০-এ দাঁড়িয়েছে। বললেন রাজধানীর নয়াপল্টনের রিকন্ডিশন গাড়ির বড় শো-রুম অটো মিউজিয়ামের ম্যানেজার সাইফুদ্দিন ভূঁইয়া। এখন মাসে ৪টি গাড়ি বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হয়। তাদের তিনটি শো-রুমে সর্বনিম্ম ১৫ এবং সর্বোচ্চ ২৮ লাখ টাকার গাড়ি আছে। জাপানি টয়োটা বিক্রি হয় বেশি।

আগে গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার ছিল ১২ শতাংশ। ক্রেতাকে ৮০ শতাংশ আর্থিক সহযোগিতা দিতো ব্যাংক। কিন্তু সেই সুদের হার এখন ১৯ শতাংশ এবং সাপোর্ট দিচ্ছে মাত্র ২০ শতাংশ। সূত্র জানায়, আগে ৫ বছর মেয়াদি ৬০ থেকে ৭০ কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে যারা গাড়ি কিনছেন তাদের ব্যাংককে ১০ থেকে ১৭ ভাগ লাভ দিতে হতো। এভাবেই বেশির ভাগ গাড়ি বেচা-কেনা হতো। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে ১০০টি বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে এগুলো পড়ে আছে চট্টগ্রাম বন্দরে। এর সব ক’টির মূল্যই কোটি টাকার বেশি। দেশের বাইরে থেকে কোনটি আনা হয়েছিল শুল্কমুক্ত সুবিধায়। পরে বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। আবার কোনটি মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করার সময় আটক হয়েছে। বর্তমানে এসব গাড়ির খোঁজ নেই বেশির ভাগ মালিকের। আসল মালিকদের অনেকে দুদকের ভয়ে সেগুলো ছাড়িয়ে নিতে আসছেন না। কেও কেও জাল কাগজপত্র দিয়ে সেগুলো ছাড়িয়ে নিতে গিয়েও ধরা পড়েছেন। পুরনো ঢাকার রফিক নামের এক ব্যবসায়ী গাড়ি কিনতে আসেন নয়াপল্টনের শো-রুমে। তিনি রিকন্ডিশনড টয়োটা গাড়ি কিনতে আগ্রহী। কিন্তু দাম শুনেই থমকে গেলেন। বললেন, তার নিজস্ব বাজেটের মধ্যে না পড়লে গাড়ি কেনা থেকে বিরত থাকবেন।

অপরদিকে নয়াপল্টনের একটি শো-রুমের রনি নামে একজন ব্রোকার জানান, তিনি প্রায় ১২-১৩ বছর যাবত এই গাড়ির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তিনি বলেন, গাড়ির ব্যবসায় এতো মন্দাভাব এর আগে কখনও তিনি দেখেননি। এবার বাজার এতোটায় খারাপ যে, গাড়ির সঙ্গে পেশার সম্পৃক্ততার জন্য তিনি বড়ই সমস্যায় আছেন। তিনি বলেন, যেহেতু দেশের পরিস্থিতি এখন মোটামুটি ভালো তারপরও বাজার পরিস্থিতি এতো খারাপ। যদি সামনে হরতাল-ধর্মঘটের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্যে কি অবস্থা দাঁড়াবে তা নিয়ে তিনি বেশ শঙ্কিত।

Advertisements
Loading...