মিথ্যা হল মায়া ক্যালেন্ডার ॥ টিকে রইল পৃথিবী ॥ হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার দৃঢ় প্রত্যায়

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ মহাকালের পরিক্রমায় ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর পেরিয়ে আজ ২২ ডিসেম্বর। যথানিয়মেই আপন কক্ষপথে পরিক্রমণ করছে আমাদের সকলের আবাসভূমি, সৌর জগতের সবচেয়ে আদর্শ গ্রহ এই পৃথিবী। মহাপ্রলয় বা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার মতো কোনো আকস্মিক মহা দুর্যোগ হানা দেয়নি। সূর্যোদয়, বায়ু প্রবাহের নিয়মেও ঘটেনি কোনো ব্যত্যয়। প্রাণী তথা জীব-জগতেও লাগেনি আকস্মিক বৃহৎ পরিবর্তনের ছোঁয়া। আর এ সবই জোরালোভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো বহুল আলোচিত মায়া ক্যালেন্ডারের তথাকথিত ভবিষ্যত্বাণী। তবে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার দৃঢ় প্রত্যায় ব্যক্ত করেছে নতুন এই শতাব্দির সকলেই।
Maya calender-12
এ বিষয়ে কথিত ও সর্বাধিক আলোচিত ব্যাখ্যাটি ছিল, মায়া পঞ্জিকার শেষ মানে পৃথিবীর চূড়ান্ত ধ্বংসলীলা সংঘটিত হওয়ার সময় চলে এসেছে। মায়া ক্যালেন্ডারের সময়সীমা শেষ হয়েছে গতকাল (২১ ডিসেম্বর, ২০১২) মধ্যরাতে।

এ নিয়ে গতকাল ২১ ডিসেম্বর ২০১২ শুক্রবার বিশ্বের অন্তত কিছু মানুষ ছিলেন দোলাচলের মধ্যে। এ নিয়ে রীতিমতো ব্যবসাও শুরু করেছিল কেও কেও। তবে মায়া সভ্যতার বর্তমান ধারকরা জানিয়েছেন, চিরকাল মায়া পঞ্জিকার অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে কোথায় ‘ডুমস ডে’র বা পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার দিনের কথা বলা হয়নি। ২১ ডিসেম্বর ২০১২ মায়া পঞ্জিকার শেষ দিন। তবে এটি মহাবিশ্ব ধ্বংসের কোন ইংগিতবাহী নয়। বরং এটি ছিল একটি নতুন যুগ, নতুন সময়ের সূচনার ইংগিতবাহী।

মেক্সিকোর দক্ষিণে ছোট্ট গ্রাম ইয়াক্সুনা। সবাই একে মায়া গ্রাম হিসেবে জানে। ১ ডিসেম্বর সারা দিন এই গ্রামে ছিল উৎসবের আমেজ। চারিদিকে ছিল সাজ সাজ রব। মায়া সভ্যতার কিছু ধারক আজও বাস করেন সেখানে। পৃথিবীর কিছু জায়গায় ছড়িয়ে পড়া আতংকের চিহ্নমাত্র দেখা যায়নি সেখানে। বরং সবাই ছিলেন উৎসবে মাতোয়ারা। এই উৎসব ধ্বংসের আগের শেষ আনন্দ উৎসব ছিল না। ছিল নতুন যুগকে আহবানের উৎসব। কারণ অনেকেই মনে করেন, এই বিশেষ দিনটি পার হলেও মানব সভ্যতা পদার্পণ করলো নতুন এক জগতে। আর সেই জগৎ সুখি-সুন্দর করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সকলের। আর নতুন এই জগতে থাকবে না কোন হিংসা-বিদ্বেষ, ভয়-ভীতি। একটি সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় ছিল সকল মানুষের হৃদয়ে।

মায়া সভ্যতার ইতিকথা

২৫০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিকাশ লাভ করেছিল এই মায়া সভ্যতা। এর বেশকিছু নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে কয়েক হাজার বছর ধরে চলা এই বর্ষপঞ্জি। সংবাদ সংস্থাগুলোর খবরে জানানো হয়, ২০ ডিসেম্বর থেকে অনেক দর্শনার্থী ভিড় করেছেন মেক্সিকোর মায়া সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া প্রত্নতাত্ত্ব্‌িক প্রাচুর্যে ভরা ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে। নতুন মায়া যুগের সূচনাপর্বের অভিজ্ঞতা নিতে সেখানে জড়ো হন তাঁরা।

দক্ষিণ আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের আগে সেখানে মায়া বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা হতো। এটি বিখ্যাত মেসো-অ্যামেরিকান লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার হিসেবে পরিচিত। পরে সেখানে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি চালু হয়। সেই বিখ্যাত মেসো-অ্যামেরিকান লং কাউন্ট ক্যালেন্ডার পাঁচ হাজার ১২৫ বছরের বৃত্ত শেষ করছে, হয়েছে গতকাল ২১ ডিসেম্বর। সে কারণেই ধ্বংসের গুঞ্জন উঠেছিল। তবে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (নাসা) বিজ্ঞানীরা বেশ আগেই এই আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছিলেন। গতকালও নাসার বিজ্ঞানীরা বলেছেন, গৃহ-নক্ষত্রের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ কোন কিছুর পরিবর্তন ঘটলে খুব সহজেই তা চোখে পড়তো। সব কিছু স্বাভাবিক রয়েছে।

উল্লেখ্য, অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ মনে করেন, মায়ানরা খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৩ হাজার ১১৪ বছর আগে থেকে সময় গণনা করা শুরু করেছে। সময় এবং সৃষ্টির কুশলী বিন্যাস সম্পর্কে মায়ানরা অনেক আগেই অবগত ছিলেন। তাদের ছিল ভবিষ্যৎ জানার ক্ষমতা। মায়ানরা আগে থেকেই জানত যে চাঁদ, শুক্র এবং অন্য গ্রহ-তারা চক্রাকারে ঘুরছে। সেই সময়েই তারা নিখুঁতভাবে সময় গণনা করতে পারত। তাদের একটি পঞ্জিকা ছিল যাতে সৌর বছরের প্রতিটি মিনিটের নিখুঁত বর্ণনা ছিল। মায়ানরা মনে করত প্রতিটি জিনিসের ওপর সময়ের প্রভাব রয়েছে এবং প্রতিটি জিনিস একেক সময় একেকটি অবস্থানে বিরাজ করছে। মায়ানদের কাছে মহাকাশের উপর ২২টি ভিন্ন ভিন্ন পঞ্জিকা ছিল। এর মধ্যে কোনো কোনো পঞ্জিকা এখন থেকে ১০ মিলিয়ন বছর আগের। খুব বোদ্ধা লোক ছাড়া এগুলো থেকে কিছু বের করাও কঠিন।

যা হোক অনেক বিজ্ঞানীরা মায়া ক্যালেন্ডারের এই ঘটনার পর মনে করেন, যেহেতু কোন কিছু ঘটেনি। তবে একটি নতুন শতাব্দিতে গমন করলো পৃথিবী। তবে সেই পৃথিবীতে যেনো না থাকে হিংসা-বিদ্বেষ। পৃথিবীর সকল মানুষ যেনো সৃষ্টিকর্তার সেই অঘোম নিয়ম মেনে চলেন। আর তাহলেই আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম পাবে একটি সুখি-সুন্দর পৃথিবী। এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

Advertisements
Loading...