The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি ॥ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কার্যকর হবে ১ জানুয়ারি থেকেই

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) উপস্থাপিত পাঁচটি বিতরণ কোম্পানির সব প্রস্তাবই ত্রুটিপূর্ণ হলেও গ্রাহক পর্যায়ে আরেক দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ছে এবং তা ১ জানুয়ারি থেকেই কার্যকর করা হবে বলে বিইআরসির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
powerstation
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিইআরসি প্রতিষ্ঠার পর জনগণের স্বার্থ না দেখলেও একটি জিনিসই নিশ্চিত করেছে, তা হলো পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধিতে সরকারকে সহায়তা করা। তাদের মতে, কমিশনের প্রধান কাজ হলো দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা এবং ক্রেতার স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু একবারও তারা প্রশ্ন করেনি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গৃহীত পদক্ষেপগুলো কার স্বার্থে করা হচ্ছে কেন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বদলে ক্রমে ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে কেন উৎপাদন খরচ বাড়ছে কেন বিদ্যুৎ সঞ্চালনকালে সিস্টেম লস অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি কেন রেন্টাল কুইক-রেন্টালের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ কী করে এবং কখন এসব ব্যর্থতা নিয়ন্ত্রণ করবে এসব প্রশ্ন এখন সবার হলেও কমিশন শুধু দামই বাড়ায়।

জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়নি। ফলে ১৯৯৬ সালের পর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ক্রমে বেড়েছে। ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তন হলেও এ ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০০৫ সালেই সম্ভবত সরকার আরও ছোট এমনকি ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র চালু করতে উদ্যোগী হয়। বর্তমানে ৮১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ২৭টিই রয়েছে ছোট ছোট কেন্দ্র, যার মোট উৎপাদন ১৫০ মেগাওয়াটের বেশি নয়। ফলে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাছাড়া ১৯৯১ সালে জ্বালানি নীতির আওতায় বিদ্যুৎ বিভাগে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯১ সালে প্রথমে ডেসা, পরে ডেসকো। ১৯৯৬ সালে পিজিসিবি, ২০০১ সালে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি, ২০০৩ সালে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, এভাবে ক্রমে বিদ্যুৎ বিভাগ আলাদা সংস্থায় পরিণত হয়। পরপর দুটি সরকার এ ক্ষেত্রে একই নিয়ম বজায় রাখে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে উৎপাদন, বিতরণ ও সঞ্চালন বিভাগ পৃথক কোম্পানিতে রূপান্তরিত হওয়ায় দুর্নীতির পরিমাণ অনেকাংশে বেড়ে গেছে। এসব কোম্পানির দক্ষতা বৃদ্ধির আগেই কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়ার এটিও অন্যতম কারণ। কিন্তু এসব বিষয়ে বিইআরসির কোনো জবাবদিহিতা বা কার্যক্রম নেই। তারা শুধু দাম বাড়াতেই তৎপর। তাছাড়া প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বদলাচ্ছে বিইআরসি। কখনো বিদ্যুৎ বিলের মাসিক রেট ১টি, কখনো ৪টি, কখনো ৬টি। এতে নানা ধোঁয়াশার সৃষ্টি করছে। ফলে একই বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও ক্রেতারা বুঝতে পারছেন না বিল কেন বাড়ছে।

বিইআরসি সূত্র জানায়, সম্প্রতি পাঁচটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাবের ওপর বিইআরসিতে গণশুনানি শেষ হয়েছে। প্রত্যেকটি কোম্পানিরই কমবেশি ত্রুটি চিহ্নিত করেছে বিইআরসি। তাছাড়া আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর বিষয়ে তীব্র আপত্তি ও বিরোধিতা করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্যাব, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), বিকেএমইএ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিনিধিরা গণশুনানিতে উপস্থিত হয়ে দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছেন। ক্যাব, এফবিসিসিআই ও বাসদসহ কয়েকটি সংগঠন দাম বাড়ানোর বিষয়ে লিখিতভাবে আপত্তি জানালেও ৭ম বারের মতো দাম বাড়াতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে বিইআরসি। আর এ দাম ১ জানুয়ারি থেকেই কার্যকর করা হবে। গত ২৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পলস্নী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৯ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানিতে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন দল বলেছিল, এ প্রস্তাবনায় অনেক ভুল রয়েছে। যা সংশোধন করে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিইআরসির কাছে জমা দিতে হবে।

৩০ ডিসেম্বর রোববার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ওজোপাডিকো) প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তাতেও একইরকম ত্রুটি থাকায় কোম্পানি দুটি যে পরিমাণ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে, তাতে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশের মতো বাড়ানো দরকার হতে পারে বলে মত দেয় বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন দল।

৩১ ডিসেম্বর সকালে গণশুনানি হয় ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডেসকো) প্রস্তাবের ওপর। ডেসকো ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে। কিন্তু তাদের উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিইআরসির মূল্যায়ন দলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ বাড়ানোর দরকার হতে পারে। শুনানি শেষে বিইআরসি ডেসকোকে ৩ জানুয়ারির মধ্যে ভুলত্রুটি শুদ্ধ করে সংশোধিত তথ্যাদি উপস্থাপন করতে বলেছে।

একই দিন বিকালে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি। ডিপিডিসি ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। কিন্তু তাদের দেওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিইআরসির মূল্যায়ন দলের হিসাব অনুযায়ী ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ বাড়ানো দরকার হতে পারে। গণশুনানিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোম্পানিগুলো জুতসই জবাব দিতে পারেনি। এ কারণে গণশুনানিতে আলোচনায় বিইআরসি তাদের সুযোগ দিয়েছে শুনানির পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধনী দিতে। তবে সংশোধনী যাই হোক, বিদ্যুতের দাম বাড়বে এবং তা ১ জানুয়ারি থেকেই কার্যকর হবে বলে বিইআরসির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এবার দাম বাড়ানো হলে তা হবে বর্তমান সরকারের শাসনামলে সপ্তমবার। এ সরকারের ৪ বছরের শাসনামলে এখন পর্যন্ত বিদ্যুতের খুচরা দাম বাড়ানো হয়েছে ৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর ফলে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৪ টাকা থেকে বেড়ে ৫ টাকা ৭৫ পয়সা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠবারের মতো বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়।

# বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুতের দাম বাড়ার চিত্র হচ্ছে :

# ১ মার্চ ২০১০ : গ্রাহক পর্যায়ে ৫ শতাংশ।

# ১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ : পাইকারি ১১ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে ৫ শতাংশ।

# ১ আগস্ট ২০১১ : পাইকারি ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

# ১ ডিসেম্বর ২০১১ : পাইকারি ১৬ দশমিক ৭৯ ও গ্রাহক পর্যায়ে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ।

# ১ ফেব্রুয়ারি ২০১২ : পাইকারি ১৪ দশমিক ৩৭ ও গ্রাহক পর্যায়ে ৭ দশমিক ০৯ শতাংশ।

# ১ সেপ্টেম্বর ২০১২ : পাইকারি ১৬ দশমিক ৯২ ও গ্রাহক পর্যায়ে ১৫ শতাংশ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উলস্নাহ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। রেন্টাল, কুইক-রেন্টালের ভুল নীতির কারণেই বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ছে। আর সরকারের এ ভুল নীতির দায় চাপানো হচ্ছে জনগণের ঘাড়ে। মাত্র ১ হাজার কোটি টাকা খরচ করে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মেরামত করা হলে এর চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হতো।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিইআরসি জনগণের টাকায় চলে জনগণেরই বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা দাম বড়ানোর দোকান খুলে বসেছে। তাদের কোনো দরকার নেই। তাদের লজ্জা থাকলে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে সরকারের ভুল নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করত।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিইআরসি ভোক্তাদের কোনো কথা রাখেন না। তাই গণশুনানির কোনো প্রয়োজন নেই। তারা দাম বাড়াবেই। কাজেই দাম বাড়াতে থাক। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের আমলে প্রতি ৩ মাস পরপর বিদ্যুতের দাম বাড়বে। (সৌজন্যে : দৈনিক আমাদের সময়)।

Loading...