রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবশেষে আলোর মুখ দেখছে ॥ অস্ত্র কেনা ও পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে রাশিয়ার সঙ্গে ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণচুক্তি

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ অবশেষে সেই স্বপ্নের রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে চলেছে। ১৯৬১ সালে পাক আমলে পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর পদ্মার তীরঘেষে রূপপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এজন্য বহু জনবসতী উঠিয়ে দেয় তৎকালিন সরকার। সেই রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গতকাল ১৫ জানুয়ারি রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
Ruppur Poromanu
অস্ত্র কেনা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ১২ হাজার কোটি টাকা পেতে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার ১৫ জানুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্‌লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক বৈঠকে এ চুক্তি করেন। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সব অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি রাশিয়া থেকে কিনবে বাংলাদেশ।

অস্ত্র কেনার জন্য বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় আট হাজার কোটি টাকা) ঋণ দেবে রাশিয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্‌লাদিমির পুতিন এ ঘোষণা দেন।

অস্ত্র বিক্রি ও পরবর্তী সেবা প্রদানকে উদ্দেশ করে পুতিন বলেন, ‘আমরা দুদেশই অস্ত্র-প্রযুক্তি সহায়তা বাড়তে আগ্রহী।’ তবে বাংলাদেশ কোন ধরনের অস্ত্র কিনছে, সে ব্যাপারে পুতিন কোনো ইঙ্গিত দেননি। পুতিন বলেন, বাংলাদেশের রূপপুরে দেশটির প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকন্দ্র স্থাপনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের (চার হাজার কোটি টাকা) ঋণ দেবে রাশিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা কেবল সর্বাধুনিক প্রযুক্তিই সরবরাহ করছি না ৃ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক পর্যায়ে আর্থিকভাবে সহযোগিতাও দিচ্ছি।’

রাশিয়ার পারমাণবিক গবেষণা করপোরেশন রোসাটমের প্রধান সার্গেই কিরিয়ানকো বলেন, রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রযুক্তি ও পরিবেশগত নিরীক্ষা এ বছরের মধ্যে শেষ করা হবে। বিদ্যুৎকন্দ্রটিতে এক হাজার মেগাওয়াটের দুটি রিঅ্যাক্টর থাকবে। ২০২০ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। তবে তিনি বলেন, পরে দেশটির আরও ঋণের প্রয়োজন হবে।

রূপপুর প্রকল্পে পূর্বের কিছু বিষয়

রাশিয়ার সঙ্গে স্বাক্ষর হতে যাওয়া চুক্তি অনুসারে, রাশিয়া নির্মানকাজের জন্য পুরো অর্থ সহজশর্তে বাংলাদেশকে ঋণ দেবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সব কারিগরি সহযোগিতাও দেবে। রাশিয়ানরা ১০ বছর রিঅ্যাক্টর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবেন। এ সময় প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি প্রকৌশলীকে তারা প্রশিক্ষণ দেবেন। বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরের ক্ষতিকারক স্পেন্ট ফুয়েল আগামী ৮০ বছর রাশিয়ায় নিয়ে পুঁতে রাখা হবে। নির্মাণ শেষ হওয়ার ১৫ বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ বিক্রির টাকা থেকে ঋণ পরিশোধ করা হবে। সেই অনুযায়ী আগামী বছর শুরু হয়ে ২০১৭ সালের মধ্যেই রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

চুক্তির পরপরই প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা হবে। রাশিয়ার সঙ্গে স্বাক্ষর হতে যাওয়া চুক্তি অনুসারে, রাশিয়া নির্মানকাজের জন্য পুরো অর্থ সহজশর্তে বাংলাদেশকে ঋণ দেবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সব কারিগরি সহযোগিতাও দেবে। রাশিয়ানরা ১০ বছর রিঅ্যাক্টর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবেন। এ সময় প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি প্রকৌশলীকে তারা প্রশিক্ষণ দেবেন। বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরের ক্ষতিকারক স্পেন্ট ফুয়েল আগামী ৮০ বছর রাশিয়ায় নিয়ে পুঁতে রাখা হবে। নির্মাণ শেষ হওয়ার ১৫ বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ বিক্রির টাকা থেকে ঋণ পরিশোধ করা হবে।

প্রথম পর্যায়ে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম একটি রিঅ্যাক্টর স্থাপন করার কথা ছিল। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল দেড় বিলিয়ন ডলার। নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লাগবে পাঁচ বছর। প্রথমটির নির্মানকাজ শুরু দুই বছরের মধ্যে আরও এক হাজার মেগাওয়াটের একটি রিঅ্যাক্টর স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের ছিল।

প্লান্টের ঝুঁকি নিয়ে কিছু কথা

বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের সচিবের নেতৃত্বে যাওয়া ওই প্রতিনিধি দলের এক সদস্য জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্লান্টের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রিঅ্যাক্টরের স্পেন্ট ফুয়েল। এগুলোকে মাটির নিচে ১০০ ফুটেরও গভীরে পুঁতে রাখতে হয়। এর পরও ঝুঁকি থাকে। এটি নিয়ে আমাদের (বাংলাদেশ) ভয় ছিল। পরে আলোচনার পর রাশিয়া এগুলো তাদের দেশে নিতে রাজি হয়েছে। বিদ্যুৎ প্লান্টের পুরো ৮০ বছর মেয়াদই তারা এই স্পেন্ট ফুয়েল তাদের দেশে নিয়ে যাবে। এটা আমাদের বিশাল প্রাপ্তি।

উৎপাদন খরচ হবে মাত্র ৬০ পয়সা ইউনিট!

সূত্র জানায়, পরমাণু শক্তি কমিশনের সমীক্ষা অনুযায়ী পারমাণবিক চুল্লি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গ্রাহক পর্যায়ে দাম পড়বে ইউনিটপ্রতি ৬০ পয়সা। ১৫ বছরের মধ্যে প্লান্টের নির্মান ব্যয় উঠে আসবে। মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেন, রাশিয়া সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক গড়ে তুলতে গভীরভাবে আগ্রহী। তারা বাংলাদেশকে বড় ধরনের ছাড়ও দিতে পারে। শতভাগ নিরাপত্তাসহ তারা গুণগতমান সুনিশ্চিত করার নিশ্বয়তা দিয়েছে। জানা যায়, ২০১৫ সালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা হবে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে ২০ হাজারে। বিভিন্ন দেশে ৪৩৯টি আনবিক রিঅ্যাক্টর রয়েছে। নতুন করে আরও ৬০টি পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে যাচ্ছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হচ্ছে। তবে কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রূপপুর পরমাণু প্রকল্পের অতীত উদ্যোগ

১৯৬১ সালে রূপপুর প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মা নদীর তীরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের প্রায় এক হাজার মিটার পূর্ব-দক্ষিণ কোনে এ প্রকল্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য তৎকালীন সরকার ২৫৯ দশমিক ৯০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ওই সময় প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ৩৫ লাখ টাকায় কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। সুদীর্ঘ সময়ে প্রায় ৪৯ বছর এ প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কানাডা, সুইডেন, নরওয়ে, রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে। ১৯৬৩ সালে ৭০ মেগাওয়াট পারমানবিক চুল্লি স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৬৪ সালে কানাডা সরকারের সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা হয়। ১৯৬৬ সালে কানাডা, সুইডেন ও নরওয়ের সঙ্গে আলোচনা হয় ১৪০ মেগাওয়াট পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের। ১৯৭৩ সালে ২০০ মেগাওয়াট পারমানবিক চুল্লি স্থাপনের জন্য রাশিয়র সঙ্গে আলোচনা হয়। পরে বিভিন্ন সরকারের সময় এ নিয়ে আলোচনা হলেও কার্যকর কিছু হয়নি। অবশেষে এ সরকারের আমলে গতবছর জানুয়ারিতে কারিগরি সহযোগিতার বিষয়ে কাঠামো চুক্তি হয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নে যার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য

এই প্রকল্প বাস্তবায়নে অত্র এলাকার যাদের ভূমিকা রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। তাঁর দল আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি বহুদিন সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান। যে কারণে সরকারের উপর মহলে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে এবার আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এই সংসদ সদস্যের দীর্ঘদিনের দাবি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

Advertisements
Loading...