চর-পিয়ালে এক আজব ভিআইপি পাখির কাহিনী

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ জনমানবহীন চর-পিয়ালে তরুণ এক ‘বড় মোটাহাঁটু’ দেখে এবার জলচর পাখিশুমারি দলের দেশি-বিদেশি সদস্যরা হতবাক হয়ে গেছেন। বাংলাদেশে দুর্লভ বলে এ পাখির ভিআইপি-মর্যাদা তো আছেই; তার ওপর উপকূলীয় চরে প্রথমবারের মতো এর দেখা পাওয়া গেল। আকারে এবং গড়নে অন্য সৈকত-পাখিদের চেয়ে এ পাখি একেবারেই ভিন্ন মানের; দৈর্ঘ্য দেড় ফুট এবং ওজন ৭০০-৮০০ কিলোগ্রাম। ইংরেজিতে এই আজব পাখির নাম ‘গ্রেট থিক-নি’ অথবা ‘গ্রেট স্টোন-কার্লিউ’।

Chor piali
সুন্দরবনের কচিখালি সৈকত ছাড়া আমাদের দেশে এ পাখির দেখা মহাভাগ্যে মেলে। গত ৪০ বছরে সিরাজগঞ্জের যমুনা-তীরে এবং রাজশাহী শহর-সংলগ্ন পদ্মার চরে দু’বার মাত্র এর দেখা মিলেছে। তবে পাখিটি এদেশেরই স্থায়ী বাসিন্দা; অন্যান্য সৈকত-পাখির মতো গ্রীষ্মে এরা দেশত্যাগ করে না। কচিখালি সৈকতে এর ছানা পাওয়া গেছে বলে সবাই নিশ্চিত যে, এ দেশটি এখনও এই দুর্লভ পাখির প্রজননভূমি। সুন্দরবনে সচরাচর ফেব্রুয়ারি-জুন মাস এ পাখির প্রজননকাল। তখন এরা উন্মুক্ত সৈকতে কাঠির ঠুনকো এক বেষ্টনী বানিয়ে তার মধ্যে ডিম পাড়ে, সাধারণত একটি, কখনও বা দুটি। অসফল প্রজনন ছাড়াও এ পাখির জীবনে যে সমস্যাটি বড় হয়ে উঠছে তা হলো আহার্য-সংকট। কাঁকড়াই এ পাখির মূল আহার্য। কাঁকড়া কাবু করার জন্য ড্যাগারের মতো অদ্ভুত এক জোড়া চঞ্চু রয়েছে এর। সৈকতে কাঁকড়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে বলে এ দেশে বহু প্রজাতির সৈকত-পাখি নতুন হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে। তাই হয়তো সীমিত আহার্য নিয়ে প্রবীণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না নেমে কচিখালির আঁতুড়ঘর ছেড়ে এক তরুণ মোটাহাঁটু পাখি নতুন ভূমির খোঁজে বেরিয়ে পড়েছিল। মোটাহাঁটু-সমাজের সেই কলম্বাসই অবশেষে চর-পিয়ালে এসে তার নিঃসঙ্গ জীবন শুরু করেছে। দুর্গম এই চরের নিরালা সৈকতে এর জন্য পর্যাপ্ত কাঁকড়া আছে। কালক্রমে সুন্দরবনত্যাগী আরও তরুণ মোটাহাঁটু এখানে এসে হয়তো এর একাকিত্ব ঘোচাবে। তবে নির্জন চর-পিয়ালে মহিষের পাল ছেড়ে রাখাটা মনপুরার ধনকুবেরদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এ চর কতদিন সৈকত-পাখির বসবাসযোগ্য থাকবে তা বলা যায় না।

শ্রীলংকা, ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের সৈকতেই মূলত বড় মোটাহাঁটু পাখির বসবাস সীমিত। পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে এ পাখি সম্পূর্ণ উৎখাত হয়ে গেছে। বাংলাদেশেও এর অবস্থা ভালো নয়। বৈশ্বিক বিপন্ন প্রাণী হিসেবে বিবেচিত না হলেও পাখিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত। এর টিকে থাকার মতো নিরুপদ্রব নদীতীর ও সৈকত কি ভবিষ্যতে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যাবে! এখান থেকে বিলুপ্ত হলে তো বিশ্বে কোথাও একে পাওয়া যাবে না। বড় মোটাহাঁটু ছাড়া পৃথিবীতে মাত্র ৮ প্রজাতির মোটাহাঁটু রয়েছে। অধিকাংশ সৈকত-পাখি বিশ্বব্যাপী বিস্তারিত হলেও মোটাহাঁটু পাখির বসবাস একেকটি মহাদেশে সীমিত। পৃথিবীর ৬টি মহাদেশকে ৯টি প্রজাতি যেন নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। ইউরোপ ও এশিয়া দখল করেছে দুই প্রজাতি : ‘ইউরেশীয় মোটাহাঁটু’ ও ‘বড় মোটাহাঁটু’, আফ্রিকায় আছে তিন প্রজাতি : ‘তিলা মোটাহাঁটু’, ‘পানিয়া মোটাহাঁটু’ ও ‘সেনেগাল মোটাহাঁটু’, অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে দুই প্রজাতি : ‘সৈকত মোটাহাঁটু’ ও ‘ঝাড় মোটাহাঁটু’, আমেরিকায় পাওয়া যায় দুই প্রজাতি : ‘পেরু মোটাহাঁটু’ ও ‘দুইদাগি মোটাহাঁটু’, ইউরোপ ও এশিয়ার ভাগে পড়েছে যে দুই প্রজাতির মোটাহাঁটু তার গুরুত্বপূর্ণ বাসস্থানের নাম বাংলাদেশ। এদের সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের।

Advertisements
Loading...