সংক্ষিপ্ত বিশ্ব সংবাদ (৩০-০১-১৩)

দি ঢাকা টাইমস ডেস্ক ॥ প্রতি সপ্তাহের মতো আজও আমরা বিশ্বের বিভিন্ন মজার মজার খবর আপনাদের সামনে তুলে ধরবো- আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।
HATI
গণ্ডার-হাতির গায়ে চৌকিদার পাখি

আফ্রিকার উগাণ্ডায় রয়েছে মার্চিসন অভয়ারণ্য, এই নির্জন অভয়ারণ্যকে বলা হয় আদিম আফ্রিকা। এখানের অরণ্যে রয়েছে হাতি, গণ্ডার, মোষ, ওয়াটার বক, পুশবক- আরও কত কী। মার্চিসন অভয়ারণ্যের গণ্ডারের আরেক নাম ব্ল্যাক রাইনো। এরা যখন অরণ্যে ঘুরে বেড়ায় তখন এদের গায়ে এসে বসে দুই-একটি করে পাখি। এই পাখিদের নাম ‘চৌকিদার পাখি’, চৌকিদার পাখি, গণ্ডার বা মোষের পিঠে বসে এদের গায়ের পোকা খায় আর প্রতিদানে মানুষ দেখলেই ডেকে ওঠে। আর গণ্ডার তখনই সতর্ক হয়ে যায়। শুধু চৌকিদার পাখি নয়, এখানে গণ্ডার, মোষ আর হাতির গায়ে লম্বা লেজওয়ালা কালো পাখিও দেখা যায়। এদের স্থানীয় নাম পিয়াপিয়াক। এরাও পিঠে বসে পোকা খায়। এ পাখিগুলো কাঠঠোকরার মতো লাফিয়ে গণ্ডারের দেহে নড়াচড়া করে। মানুষ দেখলে এরা একটা বিশেষ ধরনের ডাক ডাকে, তখন গণ্ডার বা মোষ সতর্ক হয়। তবে গণ্ডার বা মোষ পাখির অন্য ধরনের ডাক গ্রাহ্য করে না। চৌকিদার পাখিকে আবার বলা হয় অক্সাবেকার বা খাঁটি চৌকিদার পাখি।

কখনওবা এরা গণ্ডারের পিঠে বসে কাঠঠোকরার মতো লাফঝাঁপ দেয়। বনে ঘুরে ঘুরে গণ্ডার খেয়ে যায় গাছের পাতা। এই অরণ্যে গণ্ডারদের দুটি জাত রয়েছে। যেমন- ব্ল্যাক রাইনো আর হোয়াইট রাইনো। ব্ল্যাক রাইনো পত্রভোজী আর হোয়াইট রাইনো তৃণভোজী অর্থাৎ ঘাস খায়। হোয়াইট রাইনো অনেকটা দলবদ্ধ জীব। গণ্ডারদের মধ্যে এরাই বৃহত্তম, তারপর আসামের এক শৃঙ্গী গণ্ডার। হোয়াইট রাইনো কিন্তু সাদা গণ্ডার নয়। অনেকের মতে, শব্দটি ইংরেজি হোয়াইট নয় আফ্রিকান ভাষায় উইট অর্থাৎ ওয়াইড থেকে এসেছে, চওড়া চোয়াল বোঝানোর জন্য। চৌকিদার পাখি আর পিয়াপিয়াক পাখি দুটি শুধু গণ্ডারের দেহের পোকাই খায় না। এরা গণ্ডারের চলার পথের বন্ধুও বটে। গণ্ডারের কোনও শত্রু দেখলেও এই পাখিরা ডেকে উঠে। ওই ডাকে গণ্ডার বুঝতে পারে শত্রু এসেছে। তাই গণ্ডার ছোট টিলার উপরে ওঠে নিমিষেই দূরে অদৃশ্য হয়ে যায়। মার্চিসন অভয়ারণ্যে জলপ্রপাতও রয়েছে। যে জন্য উগাণ্ডার এই অভয়ারণ্যকে মার্চিসন ফলস ন্যাশনাল পার্কও বলা হয় এখন। এই অভয়ারণ্যকে বুশবাক নামে এক বন্যপ্রাণী রয়েছে। এদের গায়ের জৌলুসও কম নয়। এদের লাল চামড়ার ওপর সাদা ফুটকি আর দাগ রয়েছে। বনে যারা আসেন তারা কখনও গণ্ডার দেখে ভয় পান। কেউবা গণ্ডার দেখে গাছে উঠে যান। গাছে বসে একটু শব্দ করে দেখেন বদমেজাজি গণ্ডার তেড়ে আসে কিনা। গাছের ডালে আঘাত আর হাততালি। গণ্ডার সচকিত হয়ে ওঠে কখনওবা। তবু বদমেজাজি এই গণ্ডার রেগে তেড়ে ছুটে আসে না, ঊর্ধ্বশ্বাসে উল্টোদিকে পালিয়ে যায়। এখানের অরণ্যের হাতিগুলোও বেশ বিচিত্র। লোকজন দেখলে হাতিরা শুঁড় দিয়ে মাটিতে সশব্দে আঘাত করে। তারপরই হঠাৎ শুঁড় দিয়ে ধুলো শুষে নিয়ে নিজের পিঠের ওপর ছড়িয়ে দেয়। হাতিরা ধূলিস্নানও করে। কোনও কোনও হাতির গজদন্তও যেন মাটি ছুঁয়ে যায়। বনে হাতি যখন ঘুরে বেড়ায় তখন এদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় দুধ সাদা গো-বক। হাতির পায়ের চাপে ঘাস নড়ে ওঠে, সেখান থেকে পোকা ওড়ে আর বকগুলো গপাগব গিলে ফেলে এদের। যে সব হাতির গজদন্ত আছে তাদেরকে দৈত্য বলা হয়। তেমনি কেউ কেউ গণ্ডারকে দৈত্যও বলেন। হাতি আর গণ্ডার পরস্পর পাশ কাটিয়ে যায়, কেউ কাউকে পাত্তা দেয় না। মজার ব্যাপার কী, উগাণ্ডার মার্চিসন অভয়ারণ্যে হাতি চলাচলের পথে শত শত ডাং-বল বা হাতির মলে জন্মায় হাজার হাজার তেঁতুল চারা। এদের মধ্যে অতি অল্পসংখ্যক চারা গাছই বড় হতে পারে।

যে সাগরে কেউ ডোবে না

মৃত সমুদ্রইংরেজিতে এর নাম ‘ডেড সি’, বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘মৃত সমুদ্র’, কিন্তু নামে সমুদ্র থাকলে কী হবে, আসলে এটি একটি হ্রদ। একপাশে লিসান নামে পেনিনসুলা, অন্যপাশে উসডাম পর্বত। দুইয়ে মিলে আশ্চর্য নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের রূপ দিয়েছে। এই ডেড সির অবস্থান হল ইসরাইল এবং জর্ডানের মাঝামাঝি একটা জায়গায়। বিজ্ঞানীদের মতে, সম্ভবত আগে কখনও ডেড সি সাগরের সঙ্গে যুক্ত ছিল আকাবা উপসাগরের মাধ্যমে। বর্তমানে এটিকে একটি অবরুদ্ধ হ্রদ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। ডেড সির উত্তরে জর্ডান উপত্যকা, পূর্বে মোয়াবাইট সমতল, দক্ষিণে আরাবাহ মরুভূমি এবং পশ্চিমে আছে পর্বতমালার সারি। এই হ্রদটি ৩৬০ বর্গমাইল বিস্তৃত অর্থাৎ এটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৭৬ কিলোমিটার আর প্রস্থে ১০ থেকে ১৬ কিলোমিটার। গড় গভীরতা ১,০০০ ফুট। বিখ্যাত জর্ডান নদী এই হ্রদে এসে মিশেছে। নদীটি প্রতিদিন যে জল বয়ে আনে তার পরিমাণ প্রায় ছয় মিলিয়ন টন। ডেড সির জলে অতিরিক্ত মাত্রায় লবণ থাকার জন্য কোনও প্রাণী বাঁচতে পারে না।

সাধারণত দেখা যায় সমুদ্রের জলে চার থেকে ছয় শতাংশ লবণ থাকে। কিন্তু ডেড সির জলে এই লবণের পরিমাণ ২৩-২৫ শতাংশ। গভীরতা অনুযায়ী লবণের পরিমাণও বিভিন্ন রকম। প্রতিদিনই নদীবাহিত লবণ জমে ডেড সির জলে লবণের অনুপাত বেড়ে যাচ্ছে। বাড়তে-বাড়তে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, এর জলে আপেক্ষিক গুরুত্ব মানুষের পুরো শরীরের আপেক্ষিক গুরুত্বের চেয়েও বেশি। সাঁতার না জানলেও মানুষ অনায়াসে ভেসে থাকতে পারে এই ডেড সিতে। তুরস্ক সরকার এই হ্রদের জল থেকে লবণ উৎপাদন করে। সবচেয়ে মজার খবর হল, জাপান তাদের দেশের ডেড সির জল দিয়ে তৈরি করেছে ‘অ্যাকোয়া অ্যামিউজমেন্ট পার্ক’, ফলে হাজার মাইল দূরের ডেড সি চলে এসেছে তাদের দেশে। এই ডেড সির জলে জাপানিরা ইচ্ছে করলেও ডুবতে পারে না। আমাদের দেশেও যদি এমন একটা পার্ক থাকত, তা হলে খুব মজা হতো। জলে ভেসে-ভেসে আমরাও জাপানিদের মতো গল্পের বই পড়তে পারতাম!

হেলগোল্যান্ড দ্বীপ যেখানে মোটরগাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ

হেলগোল্যান্ড নর্থ সি-র মাঝে ছোট্ট একটি দ্বীপ। আয়তন মাত্র ১ বর্গ কিলোমিটার আর মূলভূমি থেকে এর দূরত্ব ৪৬ কিলোমিটার। জাহাজ হেলগোল্যান্ড থেকে খানিকটা দূরে নোঙর করে। কারণ দ্বীপের কাছে সমুদ্র অগভীর। যারা এ হেলগোল্যান্ডে আসেন তাদের দ্বীপে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ছোট নৌকা জাহাজ থেকে বের হওয়ার দরজার গা ঘেঁষে নোঙর ফেলে। ওই নৌকায় যেতে হলে জাহাজ থেকে এক মিটার নিচে নোঙর করা নৌকায় লাফ মারতে হয়। যারা এ পথে আসে তারা লাফঝাঁপে অভ্যস্ত। তবে যারা বয়স্ক তাদের জাহাজের দু’জন কর্মচারী বের হওয়ার দরজার দু’পাশে দাঁড়িয়ে একেক করে যাত্রীদের দু’পাশ থেকে বগলের কাছে ধরে আর নৌকায় ঝুপ করে নামিয়ে দেয়। হেলগোল্যান্ডে ত্রিভুজ আকারের একটি লাল পাথর আছে যেটা সমুদ্র থেকে খাড়া হয়ে উঠে গেছে ৬১ মিটার উঁচু পর্যন্ত। ত্রিভুজের দক্ষিণ দিকে খানিকটা অংশ সমুদ্রের সমতলে। ওখানে জেটি। সমুদ্রের সমতলে দ্বীপের যে অংশ তাকে বলে উল্টারল্যান্ড অর্থাৎ নিচের তলা। এ দ্বীপে রয়েছে হফমান ফন ফালার্মলেবেনের আবক্ষ মূর্তি। এখানে থাকাকালে হফমান ফন ফালার্মলেবেন ডয়েভসল্যান্ড লিড (জার্মানির নাম) লেখেন যা পরে ওই দেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়। এ দ্বীপের নিচের অংশে কেবল দোকানপাট, রেস্তোরাঁ আর হোটেল। দোকানগুলো সব ডিউটি-ফ্রি শপ। অধিকাংশই পারফিউম, হার্ড ড্রিংক্স আর জামা-কাপড়ের দোকান। হেলগোল্যান্ডে বন্য ফুল, ঘাস আর গাছপালার মধ্য দিয়ে চলে গেছে পিচ বাঁধানো রাস্তা। একপাশে হেলগোল্যান্ডের লাল পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র আর বালির বেলাভূমি রোদে ঝিকমিক করে। দ্বীপে মোটরগাড়ি নিষিদ্ধ এমনকি সাইকেলও নয়, আছে মোট দুটো ইলেক্ট্রো ট্যাক্সি, আরেকা অ্যাম্বুলেন্স। সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত এ দ্বীপে অনেকে আসেন স্বাস্থ্য সারাতে। চিংড়ি ঘরও আছে এখানে। এ দ্বীপের আশপাশে বিভিন্ন সাইজের চিংড়ির প্রাচুর্য।

হেলগোল্যান্ডবাসীদের প্রধান ব্যবসা মাছ ধরা। এখানের খুদে বাড়িগুলো এক সময় ছিল জেলেদের কর্মশালা এবং কর্মস্থান। বর্তমানে মাছ ধরার পদ্ধতি বদলেছে, অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু জেলেদের ছোট ঘরগুলো ভাঙা হয়নি। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বীপবাসীদের জীবন ধারনের ইতিহাস। ছোট-বড় কোনও বাড়িগুলো খালি পড়ে নেই, কোনোটা হয়েছে সরকারি দফতর, কোনোটা দোকান বা রেস্তোরাঁ। এখানে একটি বাড়িতে জাদুঘর বসেছে, সেখানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে মাছ ধরার পুরনো সাজ-সরঞ্জাম। হেলগোল্যান্ডে আছে লাল পাথরের একটি থাম। একে বলা হয় ‘লাঙ্গে অ্যানা স্মৃতি প্রতীক চিহ্ন’। এটি ৪৮ মিটার উঁচু। এটাও কোনও সময়ে মূল দ্বীপের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সমুদ্রের দাপটে ডুবে গেছে তবে মাঝের অংশ ভাটার সময় জেগে ওঠে। এ স্থানের নাম লাঙ্গে অ্যানা নামকরণের একটি কাহিনীও আছে। দ্বীপের এক ড্যান্স বারে নাকি এক পরিচারিকা কাজ করত, নাম অ্যানা। লম্বা আর রোগা ছিল বলে ওর নাম হয়েছিলো লাঙ্গে অ্যানা। সেই নামটি পরে এ স্থান ও লম্বা পাথরের ওপর বর্তায়।

হেলগোল্যান্ড হস্তান্তরিত হয় তিনবার। গোড়ায় ছিল ডেনমার্কের অধীনে। ১৮১৪ সালে চলে যায় ইংল্যান্ডের অধিকারে। ওই শতকেই আবার পটপরিবর্তন হয়। ১৮৯০ সালে ইংল্যান্ড ও জার্মানির মধ্যে দেয়া-নেয়া চলে। তখন হেলগোল্যান্ড আসে জার্মানদের হাতে, তার পরিবর্তে জার্মানি ওদের হাতে তুলে দেয় জাজিওবার দ্বীপ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জার্মানির নৌবহর ধ্বংস করার জন্য ইংল্যান্ড হেলগোল্যান্ডের ওপর প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ করে। বাসিন্দারা তখন দ্বীপ ছাড়তে বাধ্য হয়। যুদ্ধ সমাপ্তির পর ১৯৫২ অবধি ইংল্যান্ড হেলগোল্যান্ডে অধিকার কায়েম করে রেখেছিল। ওটা বম্বিং রেঞ্জ হিসেবে ব্যবহার করত। এ সময় ইংল্যান্ডের রয়্যাল নেভি হেলগোল্যান্ডে ছয় হাজার টনেরও বেশি বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করে। সেই বিস্ফোরণের ধাক্কা মালভূমি পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এ বিস্ফোরণকে ওরা আখ্যা দিয়েছে বিগ ব্যাং। ১৯৫২ সালে হেলগোল্যান্ড আবার জার্মানির অংশ হয়।

ভার্না সমুদ্র বন্দর

কৃষ্ণ সাগরের তীরেই ভার্না। এই ভার্নার সমুদ্র সৈকতে রয়েছে সোনালি রঙের বালি, পাড়ে সারি সারি পাইন গাছ। সব বয়সের নারী-পুরুষ এখানে স্নান করে। কেউ কেউ সোনালি বালিতে শরীর এলিয়ে বিকেলের রোদ মাখে গায়ে। ভার্না ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমুদ্র শহর। গ্রীষ্মকালে সারা ইউরোপের লোক ছুটে আসে এখানে। ইউরোপের প্রায় সব বড় শহরের সঙ্গেই এর বিমান যোগাযোগ রয়েছে। সোফিয়া থেকে ৪৬৯ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বুলগেরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শহর এই ভার্না। এই সমুদ্র বন্দরটি গড়ে ওঠার একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সমুদ্রে মাছ ধরতে যেসব জেলে আসত, তারাই এখানকার প্রথম অধিবাসী। ধীরে ধীরে এর রূপান্তর ঘটল সামুদ্রিক বন্দর হিসেবে। বড় বড় জাহাজ এখানে নোঙর ফেলতে আরম্ভ করল। জেলেদের অধিকাংশই ছিল দেবতা ডারজালার ভক্ত। মাঝে মাঝে এখানে উৎসব হতো এই ডারজালা দেবতার নামে। তখন নানা ধরনের খেলাধুলার আয়োজন হতো এই সমুদ্রতটে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে ভার্নায় রোমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কথিত আছে, রোমান কবি ওভিদ এখানে ছিলেন কিছু দিন। ভার্না নাম হয় আনুমানিক ত্রয়োদশ শতকে। তারপর অনেক উত্থান-পতন। কখনও পোল্যান্ডের রাজার অধীনে, আবার কখনও তুর্কি সম্রাটের অধীনে। ১৮৭৮ সালে তুর্কি শাসন থেকে বুলগেরিয়া মুক্ত হলে ভার্নাও স্বাধীন বুলগেরিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো ছায়া ভার্নাকেও আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তবে তেমন ব্যাপক নয়। এখানকার রাজার বুদ্ধিতে সেদিন ভার্নাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। রাজা বুঝতে পেরেছিলেন, হিটলারের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি পেরে উঠবেন না। তাই সোজাসুজি আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠানোর ব্যবস্থা নেন। প্রস্তাবের শর্ত ছিল বুলগেরিয়ার ইহুদিদের ইসরাইল চলে যেতে বাধা দেয়া যাবে না। সেটা নাকি মানা করছিল হিটলারের বাহিনী। প্রায় ৪১ হাজার ইহুদি কয়েক দিনের মধ্যেই বুলগেরিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এখনও বুলগেরিয়ায় তার স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। ভার্না সমুদ্র বন্দর থেকে একটু দূরে রয়েছে মাঝে মাঝে ছোট পাহাড়। পাহাড়ের বুকচিরে তৈরি হয়েছে রাস্তা। আশপাশে গ্রাম। গ্রামে ছড়ানো-ছিটানো বাড়ি। অধিকাংশ বাড়ির মাথায় টালির টোপর। ছোট ছোট আঙুর ক্ষেত। মাঠেই চষাজমিতে টমেটো, মুলা প্রভৃতি চাষ হচ্ছে। লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। সালাদ এখানের অন্যতম খাবার। প্লেটভর্তি সালাদের মধ্যে টমেটোর ভাগই বেশি। এছাড়া শসা, পিয়াজ, আঙ্গুর আর কুচি কুচি করে কাটা বাঁধাকপি। এছাড়া থাকে ভেড়ার মাংসের কাবাব, সামুদ্রিক মাছ ভাজা, ডাল, ভাত ও রুটি। এসব খাবারের উপর অলিভ অয়েল ছিটিয়ে দেয়া হয়। ভার্নার গির্জাগুলো বেশ সুন্দর। গির্জার ভেতরের চিত্রকলা দেখে যে কেউ মুগ্ধ হন। এখানে বিশাল দেয়ালজুড়ে রয়েছে নানা রঙের ছবি। ছবিগুলোর অধিকাংশই পুরানভিত্তিক। তাদের বিশ্বাস, পাপ করলে নরকে জীবনযাপন করতে হয়। সেখানে ফুটন্ত তেলে ছেড়ে দেয়া হয় দেহটি। তেমনি সব ছবি। যারা এখানে আসেন তাদেরকে স্বাগত জানান পাদ্রিরা। এখানের পাহাড়ি পথের আশপাশে পাহাড়ের গায়ে রয়েছে নানা রঙের গাছ। আর পাইন গাছ বেশি দেখা যায়। শীত পড়তেই প্রায় সর্বত্র কুয়াশার আস্তরণ দেখা দেয়। রোদ উঠতেই গাছের পাতায় রোদ্দুর লেপটে পড়ে চিক চিক করে। এখানে পাহাড়ের গায়ে আপেল গাছ। প্রচুর আপেল দেখা যায় গাছের ডালে ডালে। মাঝে মধ্যে আঙ্গুরের ক্ষেত। এখানের অরণ্য ভূমিতে রাতে বিদ্যুৎ বাতিও জ্বলে। পাহাড়ি পল্লীতেও তাই। আর ভার্নার সমুদ্র সৈকত নানা রঙের বৈদ্যুতিক বাতিতে ঝলমল করে ওঠে। যারা সারাদিন ভার্নায় কাজ শেষে সন্ধ্যায় নিকটস্থ পল্লীতে ফেরেন তখন তার কাছে মনে হয়, যেন স্বর্গলোকে ফিরেছেন তিনি।

ডয়েশ মিউজিয়ামের আশ্চর্য সংগ্রহ

বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জাদুর একশো বছর ছিল ১৯০৫ সাল। পরপর আবিষ্কারের ভেলকি দেখিয়ে সারা পৃথিবীবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাই একশো বছর পরও ২০০৫ সালকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার অফ দ্য ফিজিক্স’ বলা হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে নানা বিজ্ঞানসভা, কনফারেন্স, বিজ্ঞানমেলা ইত্যাদি। আইনস্টাইনের দেশ জার্মানিতেই রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান-জাদুঘর। জার্মানি বা ডয়েশল্যান্ডে অবস্থিত বলে নাম ডয়েশ মিউজিয়াম। এই মিউজিয়ামে আছে নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের এক অনন্য দুনিয়া। প্রথমেই চোখে পড়বে এক বিশাল মাস্তুল দেওয়া জাহাজ। ১৮৮০ সালের এই জাহাজটির নাম ‘মরিয়া’, তার পাশ দিয়ে ঢুকে যাওয়া যায় বড় জাহাজেরর লাইন দেওয়া কেবিনে। সেখানে বড়-বড় মাটির মডেলের সাহেব-মেমরা বসে গল্পগুজবের ভঙ্গিমায় সময় কাটাচ্ছে। ঘরের গোল কাচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে নীল সমুদ্র ও তার উপর দিয়ে উড়ে বেড়ানো সি-গাল পাখিগুলোকে। সত্যিকারের পুরনো জাহাজের সঙ্গে তার কেবিন ও সাগরকে সাজানো হয়েছে আশ্চর্যভাবে।

সারিবদ্ধভাবে রয়েছে প্রত্যেকটি বিভাগ- সাইকেল, মোটরগাড়ি, রেল, উড়োজাহগাজের মতো পৃথিবীর যাবতীয় যানবাহন ও আরও অনেক কিছু। সাইকেল বিভাগের সামনে বিরাট চাকা দেওয়া প্রথম আবিষ্কৃত সাইকেল। সেই সাইকেল কেমন করে পরিণত হল এ যুগের গিয়ার দেওয়া সাইকেলে- তার আন্দাজ পাওয়া যায় অদ্ভুত সব গিয়ার দেওয়া সাইকেলগুলো দেখলে। উড়োজাহাজের বিভাগে গেলে মনে হয়, বিমানবন্দরের রানওয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। শুধু প্লেনগুলো ওঠানামা না করে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সেখানেই ঝূলছে রাইট ভাইদের ১৯০৯ সালে তৈরি প্রথম উড়োজাহাজ। এখানে স্টিম ইঞ্জিনের রেল, পাহাড়ে ওঠা র‌্যাক রেল থেকে তীব্রগতির বুলেট ট্রেনের ইঞ্জিন অবধি সাজানো আছে। আছে ১৮১৪ সালে তৈরি প্রথম স্টিম ইঞ্জিনটিও। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে এই রেল ইংল্যান্ডের কোলিয়ারিতে কয়লা নিয়ে যাওয়া-আসার কাজ করেছিল। এ যে শুধু সাজানোই রয়েছে, তা নয়। রোজ বেলা বারোটার সময় একজন জার্মান কর্মচারী একে পাঁচ মিনিটের জন্য চালিয়েও দেয়।

ডয়েশ মিউজিয়ামের আশ্চর্য জগতে সাজানো আছে কাপড় তৈরির মেশিন, কম্পিউটার, স্পেস মডিউল, আরও কত কী!
বিভিন্ন বিজ্ঞান বিভাগে নিজের হাতে বিজ্ঞানভিত্তিক নানা পরীক্ষানিরীক্ষাও করা যায়। একপাশে রয়েছে ফরাসি বিজ্ঞানী ও অক্সিজেন আবিষ্কারক আঁতোয়ানেত ল্যাভোসিয়রের প্রয়োগশালার হুবহু অনুকরণে তৈরি একটি ঘর। অপটিক্স আলোর খেলা দেখে তাক লেগে যায়। ঘনত্বের পার্থক্যে কীভাবে কোনও জিনিস চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়, তা দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...