চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের ফারাক এখনও ব্যাপক ॥ মার্চ-এপ্রিলে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নেবে

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ গতবছরের তুলনায় এবার লোড শেডিং-এর পরিমাণ বেড়েছে। শীত থাকতেই অনেক স্থানেই লোড শেডিং হচ্ছে। আর তাই রাজধানীবাসী আরও বেশি চিন্তিত এই কারণে যে শীতেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে গরমে কি হবে? ঠিক তাই ঘটতে যাচ্ছে। এবার গরমে লোড শেডিং-এর মাত্রা নাকি বাড়বে- এমন আভাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, রাজধানীসহ সারাদেশে লোডশেডিং বাড়ছে। তাপদাহ শুরু না হতেই লোডশেডিং হচ্ছে দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। কোন কোন এলাকায় এর পরিমাণ আরও বেশি। সামনে সেচ মৌসুম শুরু হচ্ছে। এ অবস্থায় মার্চ-এপ্রিলে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হবে দেশবাসীকে। এমনকি এ বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের কর্মকর্তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। আসন্ন সেচ মৌসুমে যে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের ধারণা করা হচ্ছে তা সামাল দিতে এ সপ্তাহেই বৈঠকে বসছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে লোডশেডিং প্রসঙ্গে বলেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা সেচ মৌসুমে লোডশেডিং মোকাবেলা করব। তিনি জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে লোডশেডিং বাড়ছে। এদিকে, লোডশেডিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা অনুযায়ী শিল্পকারখানা, বাসাবাড়িতে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগও দিতে পারছে না পিডিবি। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে অরাজকতা সৃষ্টির আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে গ্যাস। এরপর জ্বালানি তেল, কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি।

রাজধানীর নারিন্দা, বেগমগঞ্জ লেন, গেন্ডারিয়া, দয়াগঞ্জ, শনির আখড়া, রামপুরা, মিরপুর এলাকায় সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এসব এলাকায় দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। এছাড়া রাজধানীর উত্তরা, আগারগাঁও, পুরানা পল্টন, মতিঝিল, বাসাবো, মুগদা, ভাষাণটেক এলাকায়ও নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে একদিকে যেমন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে একই কারণে কর্মঘণ্টাও কমছে। বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের অভাবে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। শিল্পে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালু রাখতে গিয়ে খরচ বাড়ছে।

লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছে শিল্প কারখানার মালিকরা। তারা বলছেন, ২৪ ঘণ্টায় একদিন হলেও কর্মঘণ্টা হচ্ছে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। আর যখন কর্মঘণ্টা চলে ঠিক তখনই বিদ্যুৎ থাকে না। বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে একদিকে যেমন উৎপাদনে ভয়াবহ ধস নামছে, তেমনি উৎপাদন সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে। একইভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই লোডশেডিংয়ের কারণে আরও বেশি বিপাকে। মিরপুর কাজীপাড়ার এক ব্যবসায়ী বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে তিন দিনে আমার ১৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে আমার ফ্রিজ নষ্ট হয়েছে। এর সঙ্গে ওই ফ্রিজে থাকা সব তরল দুধ ও আইসক্রিম গলে গিয়ে বিক্রি অনুপযোগী হয়েছে।

গেন্ডারিয়ার শরৎ গুপ্ত সড়কের বাসিন্দারা জানান, এ এলাকায় একবার বিদ্যুৎ গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পরে আসে। এভাবে দিনরাত ২৪ ঘণ্টায় ১০-১১ বার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার যখন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে তখন তার ভোল্টেজও কম থাকে। তিনি বলেন, এতবার লোডশেডিং হওয়ার পরও বিদ্যুতের বিল কম আসে না। বরং প্রতি মাসেই বিল বেশি আসছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুৎ বিলও কমছে না, আবার বিদ্যুৎও পাচ্ছি না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে এ মুহূর্তে ৯টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১ হাজার ১২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। কোন কোন কেন্দ্র একেবারেই বন্ধ রয়েছে। এগুলো হল ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩.৪ ও ৫নং ইউনিট গ্যাসের অভাবে সম্মিলিত ক্ষমতা ৫৫০ মেগাওয়াটের স্থানে উৎপাদন হচ্ছে ৪৬০ মেগাওয়াট। বেসরকারি খাতের ঘোড়াশাল (ম্যাক) ৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও এখন এটি গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। টঙ্গী (জিটি) ১০৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫০ মেগাওয়াট। সিদ্ধিরগঞ্জ পিকিং পাওয়ার প্লান্ট ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন করছে মাত্র ৪৪ মেগাওয়াট। মেঘনা ঘাট পাওয়ার স্টেশনের উৎপাদন ক্ষমতা ৪৫০ হলেও উৎপাদিত হচ্ছে ৪২০ মেগাওয়াট। হরিপুর পাওয়ার লিমিটেডের উৎপাদন ক্ষমতা ৩৬০ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে ২৩০ মেগাওয়াট। রাউজান বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ৩৮০ মেগাওয়াট হলেও গ্যাসের অভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ আছে কেন্দ্রটি। এছাড়া শিকলবাহা ৪০ মেগাওয়াট ও শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্যাসের অভাবেই বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির পাশে অবস্থা কয়লাভিত্তিক দুটি ইউনিটের মধ্যে কারিগরি জটিলতার কারণে একটি বন্ধ রয়েছে। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে বেশ কয়েকটি। এছাড়া রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টগুলোতে অতি পুরনো যন্ত্রপাতি বসানোর কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপরীতে জ্বালানি তেলের চাহিদা অনেক বেশি। ফলে বেশি তেল পুড়ালেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না কেন্দ্রগুলো। মার্চ-এপ্রিল থেকে যখন পুরোদমে সেচ কাজ শুরু হবে তখন লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

১৬ ফেব্রুয়ারি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের কাছে পিডিবির চেয়ারম্যানের পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গ্যাসের অভাবে বর্তমানে ২ হাজার ৩২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট। আর গ্যাসের কারণে উৎপাদন হচ্ছে না ১ হাজার ১২১ মেগাওয়াট। ওই চিঠিতে চেয়ারম্যান বলেন, তরল জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এছাড়া গ্যাসের দ্বারা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু রাখলে উৎপাদন খরচ কম হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না করা হলে সামনে সেচ মৌসুমে সেচ কাজে বিঘ্ন ঘটবে। পাশাপাশি লোডশেডিংও বাড়বে।

পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরের তিন বছরে ২ হাজার ৮৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করেছে। আর ৫ হাজার ২১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য ৪৯টি কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করা হয়েছে। তিনি জানান, ২০১০ সালে গ্যাসে ২ হাজার ৯৩৮ মেগাওয়াট, জ্বালানি তেলে ৫৬৬ মেগাওয়াট, জলবিদ্যুৎ ১২৬ এবং কলা থেকে ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। আর ২০১১ সালে গ্যাসে আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৪১ মেগাওয়াট, জ্বালানি তেলে ১ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুতে ১৭৪ মেগাওয়াট এবং কয়লানির্ভর ১৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।

পিডিবি কর্তৃপক্ষের এসব কথা কেবল কাগুজে বলে মন্তব্য করেন পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, মহাজোট সরকার রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার স্টেশন নিমার্ণকে একটি জরুরি প্রকল্প হিসেবে নিয়েছে। বিশেষ বিধানের আওতায় এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওয়ার্ক অর্ডার দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কাগজে-কলমে তিন হাজার মেগাওয়াট যে বলে তা ঠিক আছে। গোলমাল মাঠে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যেগুলো চালু হয়েছে, সেগুলোর কোন কোনটি উৎপাদন ক্ষমতার চাইতে কম উৎপাদন করছে। কারণ উন্নত দেশে যেসব রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট পুরনো বা বর্জ্য হিসেবে দেখা হয়, সেগুলো কম দামে আমাদের ঠিকাদাররা নিয়ে আসে এবং সেগুলো স্থাপন করে। তিনি বলেন, রেন্টালের মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। দ্বিপাক্ষিক লিয়াজোঁর মাধ্যমে উৎকোচ নিয়ে পিডিবি বিদ্যুৎ খাত ধ্বংস করার ব্যবস্থা করছে।

পিডিবির সূত্র মতে, ২৩ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫ হাজার ১০৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৯৬০ মেগাওয়াট। লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ১৪৯ মেগাওয়াট। তথ্য সূত্র: দৈনিক যুগান্তর।

Advertisements
Loading...