জামায়াতের হরতাল চলছে ॥ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ॥ গত রাতে বাসে আগুনে মারা গেছে ১ জন ॥ কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল কাদের মোল্লার রায়ের প্রতিবাদে ডাকা দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলছে। বিক্ষিপ্ত ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। গতরাতে উত্তরাতে বাসে আগুন দিলে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা মারা যায়।

Hartal 5-2-13 (2)
আজ সকালে শেওড়া পাড়ায় জামাত শিবির মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ সময় ১ জন গুলিবিদ্ধ হয়। এ সময় পুলিশ ১০ জনকে আটক করে। রাজধানীর রায়ের বাগে বাসে আগুন দেয় পিকেটাররা। রামপুরায় জামায়াত শিবির মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। মহাখালীতে পিকেটারের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয় সকালে। যাত্রাবাড়ী, গাবতলী ও রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও জামায়াত শিবির মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের অবস্থান দেখে মনে হয়েছে তারা জামায়াত শিবিরকে প্রতিহত করতে বেশ তৎপর।

অপরদিকে রাজশাহীতে জামায়াত শিবিরের মিছিলে পুলিশ বাধা দিয়ে সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট মারে। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকায় শিবির কর্মীরা মিছিলের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশ রাবার বুলেট মেরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ছাড়াও খুলনা, বরিশাল, রংপুর, বগুড়াতেও পুলিশের সঙ্গে জামায়াত শিবিরের সংঘর্ষ ঘটেছে।

এদিকে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে হাইকোর্ট এলাকা নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে। কারণ আজ আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে মামলার দ্বিতীয় রায় হতে যাচ্ছে। এই রায়ে ১৯৭১ এ মানবতা বিরোধী ভূমিকায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রায় হতে যাচ্ছে। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কাদের মোল্লা মিরপুরে বহু মানুষ হত্যা, ধর্ষণসহ নানা অপকর্ম করেন। আদালতে এসব স্বাক্ষ প্রমাণ তুলে ধরা হয়। দীর্ঘ সময় হেয়ারিং চলে এ মামলার। গতকাল আদালত বলেছে, আজ মঙ্গলবার ৫ ফেব্রুয়ারি এই মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। একাত্তরের সেই ঘৃণিত ব্যক্তির পক্ষে তারই সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী হরতালের ডাক দেয়। জামায়াতে ইসলামী আরও হুমকি দিয়েছে, ‘প্রয়োজনে লাগাতার হরতাল’ দেওয়া হবে। এবং জামায়াতে ইসলামী দেশে গৃহযুদ্ধ বাধবে বলে গতকাল ৪ ফেব্রুয়ারি শাপলা চত্তরে এক প্রতিবাদ সমাবেশে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে।

একাত্তরের সেই পরাজিত শত্রু আজ এদেশের একটি রাজনৈতিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে দেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এদেশে রাম-রাজত্ব কায়েম করতে চাই। পরাজিত জামায়াত এদেশকে আফগানিস্তানের মতো তালেবানি কায়দায় হামলা

কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোলস্নাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের পাঁচটি প্রমাণিত হওয়ায় এ রায় দেয়া হয়। রায় ঘোষণার সময় আব্দুল কাদের মোল্লা কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
Kader Molla
মঙ্গলবার ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন।প্রায় নয় মাস শুনানি শেষে এ মামলার রায় দেয়া হলো। এ রায়ের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে দুটি মামলার রায় হয়ে হলো। প্রথম রায়ে আবুল কালাম আযাদকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

গত ১৭ জানুয়ারি আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার কার্যক্রম শেষে রায় যেকোনো দিন দেয়া হবে মর্মে (সিএভি) রেখে দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন ট্রাইব্যুনালে আসাসিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন।
জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু হয় ২০১০ সালের ২১ জুলাই।২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট এলাকা থেকে তাকে একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর তদন্ত সম্পন্ন হয়। ১৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। ২৮ মে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে কাদের মোলস্নার আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু করে ট্রাইব্যুনাল।

অভিযোগ গঠনের আদেশে কাদের মোল্লার পরিচিতিতে বলা হয়, ১৯৪৮ সালে ফরিদপুরের আমিরাবাদ গ্রামে কাদের মোলস্না জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় তিনি ছাত্রসংঘে যোগ দেন। আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনিত অভিযোগ সমূহের মধ্যে ছয়টি অভিযোগ গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল। ছয় অভিযোগের বিষয়ে প্রসিকিউশন তাদের সাক্ষী উপস্থাপন করেন।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়, কাদের মোল্লার নির্দেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে আটক মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে একাত্তরের ৫ এপ্রিল গুলি করে হত্যা করা হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৭ মার্চ কাদের মোল্লা তার সহযোগিদের নিয়ে কবি মেহেরুননিসার মা ও দুই ভাইকে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসায় হত্যা করেন।

তৃতীয় অভিযোগ, ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ বিকেলে আরামবাগ থেকে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেব মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনের বাসস্ট্যান্ডে গেলে কাদের মোল্লা ও তার সহযোগিরা তাকে ধরে পাম্পহাউসে জল্লাদখানায় নিয়ে জবাই করে হত্যা করেন।

চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত কাদের মোলস্না ও ৬০-৭০ জন রাজাকার রাজধানীর কেরানীগঞ্জ থানার খানবাড়ি ও ঘটেরচর (শহীদনগর) এলাকায় যান। সেখানে মোজাফফর আহমেদ খান এবং দুজন নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গণি ও গোলাম মোস্তফাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কাদের মোল্লার ও তার সহযোগিরা ভাওয়াল খানবাড়ি এবং ঘটেরচরে (শহীদনগর) হামলা চালিয়ে শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা করেন।

পঞ্চম অভিযোগ অনুযায়ী, ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাদের একটি হেলিকপ্টার মিরপুরের আলোকদি গ্রামের পূর্ব দিকে নামে। কাদের মোল্লা অর্ধশতাধিক অবাঙালি ও রাজাকার নিয়ে গ্রামের পশ্চিম দিক থেকে ঢোকেন এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকেন। ওই ঘটনায় ৩৪৪ জনের বেশি লোক মারা যায়।

ষষ্ঠ ও শেষ অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ছয়টার দিকে কাদের মোলস্না ও তার সহযোগী কয়েকজন বিহারি ও পাকিস্তানি সেনা মিরপুরের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর কালাপানি লেনের হযরত আলীর বাসায় যান। কাদের মোলস্নার নির্দেশে হযরত আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে তার স্ত্রী আমিনা এবং দুই মেয়ে খাদিজা ও তাহমিনা, দুই বছরের ছেলে বাবুকে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় কাদের মোল্লার ১২ সহযোগী মিলে হযরতের ১১ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে। হযরতের আরেক মেয়ে মোমেনা ওই সময় আত্মগোপন করে সেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ গত বছরের ২০ জুন সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী জবানবন্দি দেন ৩ জুলাই। এ পর্যন্ত কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দুজন তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষের ১২ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। একই মামলায় সামিপক্ষের ছয় সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।

গত ৭ জানুয়ারি থেকে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তিনদিন আইনী পয়েন্টে যুক্তি উপস্থাপন করেন। এরপর অপর আইনজীবী আব্দুস সোবহান তরফদার অন্যান্য বিষয়ে তাদের যুক্তি উপস্থাপন করেন।

গত বছরের ৩ জুলাই আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষি মোজাফ্‌ফর আহমেদ খানের জবানবন্দির মধ্যে দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এরপর শহিদুল হক মামাসহ একে একে ১২ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজন নারী সাক্ষী ক্যামেরা ট্রায়ালে তাদের জবানবন্দি পেশ করেছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের জেরা করেছেন।

প্রসিকিউশন লিস্টের মোট ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে এ মামলার দুই তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১২ জন ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
অন্যদিকে গত ১৫ নভেম্বর কাদের মোলস্নার পক্ষে তার নিজের সাক্ষের মধ্যদিয়ে মোট ৯৬৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের বেধে দেয়া ছয়জন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। উভয়পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী তার যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। তিনি ২৭ ডিসেম্বর তার যুক্তি উপস্থাপন শেষ করলে ট্রাইব্যুনাল ৭ জানুয়ারি থেকে আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন। ধার্য তারিখ থেকে আসামিপক্ষ তাদের যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন।
গত ২০ জুন আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ৯৬ পৃষ্টার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন শেষে ৩ জুলাই সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গত ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়। এরপর প্রসিকিউশনের আবেদনে গত ১৬ এপ্রিল মামলা ট্রাইব্যুনাল-২এ স্থানান্তর করা হয়। এরপর গত ৭ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আরো একটি অভিযোগ এবং ছয়জন সাক্ষীকে এ মামলায় অর্ন্তভুক্ত করা এবং ফরমাল চার্জে কিছু শব্দের সংশোধনী চেয়ে আনা আবেদনের ওপর শুনানি হয়। গত ২৮ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ছয়টি অভিযোগ এনে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল-২, তার বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ১ নভেম্বর হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১।

২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিম র্কোর্ট এলাকা থেকে তাকে একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনালে তদন্তকারী সংস্থার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২ আগস্ট কাদের মোলস্নাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আটক রাখার আদেশ দেয়া হয়। (সৌজন্যে : বাংলাদেশ নিউজ২৪)।

Advertisements
Loading...