আবার সোনার দাম বেড়েছে ॥ বহু সোনার দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ॥ স্বর্ণের ভরি ৬০ হাজার টাকা!

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ সোনার দাম দিনকে দিন বাড়ছে। ১৯৮৮ সালে যে সোনার ভরি ছিল মাত্র ৬ হাজার টাকা, আজ সেই সোনার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার টাকায়! এই অস্বাভাবিক সোনার দাম বৃদ্ধির কারণে এই সেক্টরটিতে নেমে এসেছে অমানিষা। সোনার ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।

রাজধানীর সোনার মার্কেটগুলোতে ঘুরে অনেক তথ্যই জানা গেছে। চাঁদনী চক মার্কেটে দেখা গেলো সেই মন্দাভাব। যেখানে এক সময় ঢোকা যেতো না, সেখানে এখন ফাঁকা। ক্রেতা নেই, বেচা-কেনা নেই, ব্যবসায়ীরা হাত পা গুটিয়ে বসে আছেন। এই অবস্থা চলছে সোনার দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে। চাঁদনী চকের এক ব্যবসায়ী জানালেন, বিশ্ব বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে যে হারে সোনার দাম বাড়ছে তাতে মানুষ আজকাল আর সোনার দোকানে আসছেন না। মানুষ সিটি গোল্ড অথবা অন্য কোন সামগ্রী কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে এই শিল্পটি ধ্বংস হয়ে যাবে। ঢাকা নিউ মার্কেটের লাবণী জুয়েলার্সের এক কর্মকর্তা জানালেন, আমরা বেচে সময় পেতাম না, এখন বসে থাকতে হচ্ছে। এই অবস্থার জন্য দাম বৃদ্ধিকেই তিনি দায়ি করেন। তিনি বলেন, বিশ্ব বাজারে যেভাবে সোনার দাম বাড়ছে তাতে আমাদের দেশে সোনার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। উচ্চ শ্রেণীর বিয়েতে ছাড়া এখন আর সাধারণ মানুষ সোনার বাজারে আসছেন না। এই অবস্থায় অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে সরকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন।

১ মার্চ দেশীয় বাজারে ২২ ক্যারেটের ভরি সোনার দাম ছিল ৬০ হাজার ১২৮ টাকা। গত এক বছরে ভরিতে স্বর্ণের দাম ১৮ হাজার টাকা বেড়েছে। স্বর্ণের দাম এযাবতকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। বিশ্ববাজারেও ১ মার্চ প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল এক হাজার ৭০৯ ডলার। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণেই ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশীয় বাজারে তারা স্বর্ণের দাম বাড়িয়েছেন। ওইদিন ভরিতে প্রায় এক হাজার ১শ’ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে। এরপর ক্রেতাদের ভরিতে দেড় হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হয়। এ কারণে বর্তমানে এক ভরি স্বর্ণ কিনতে প্রায় ৬২ হাজার টাকা গুনতে হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বাড়ায় তাদের ব্যবসায় মন্দা নেমে এসেছে। ক্রেতারা সিটি গোল্ডের দিকে ঝুঁকছে। তাদের মতে, এ খাতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটির জন্য কোন নীতিমালা নেই।

বিশ্ববাজারেও প্রতি আউন্স সোনার দাম এক হাজার ৭০৯ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণে দেশের সোনার বাজারে ক্রেতা ব্যাপকভাবে কমেছে। সোনার এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করছেন দেশীয় ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, আফ্রিকাসহ রফতানিকারক দেশগুলো সোনা রফতানি কমিয়ে দিয়েছে। বিপরীতে চীনের মতো জনবহুল দেশগুলো সোনা কিনে মজুদ করছে। সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়ছে। ফলে বর্তমানে দেশে সোনার বাজারে ৭০ ভাগ ক্রেতা কমেছে। অব্যাহত লোকসানের মুখে ২০ ভাগ ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। এছাড়া নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় মানুষ মৌলিক চাহিদা মিটিয়ে সোনার মতো বিলাসী পণ্য কিনতে পারছে না।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ক্যারেটের প্রকার ভেদে দেশে ৪ ধরনের রেটে সোনা বিক্রি হয়। এর মধ্যে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। ১ মার্চ দেশীয় বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ছিল ৬০ হাজার ১২৮ টাকা, ২১ ক্যারেট ৫৭ হাজার ৪৪৫ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৪৯ হাজার ২২২ টাকা এবং সনাতনী ৩৭ হাজার ৯০৮ টাকা। অথচ ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি ২২ ক্যারটের প্রতি ভরি সোনার দাম ছিল ৪২ হাজার ১৬৫ টাকা, ২১ ক্যারেট ৪০ হাজার ২৪০ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৩৫ হাজার ৮৬৬ টাকা এবং সনাতনী ২৭ হাজার ৯৯৩ টাকা। এক বছরে ভরিতে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে স্বর্ণের দাম।

ক্যারেট ১ মার্চের দাম ১ জানুয়ারি ২০১ বেড়েছে (হাজার টাকায়)
২২ ক্যারেট ৬০১২৮ ৪২১৬৫ ১৯৯৬৩
২১ ক্যারেট ৫৭৪৪৫ ৪০২৪০ ১৭২০৫
১৮ ক্যারেট ৪৯২২২ ৩৫৮৬৬ ১৩৩৫৬
সনাতনী ৩৭৯০৮ ২৭৯৯৩ ৯৯১৫

বিশ্ববাজারেও গত এক বছরে সোনার দাম প্রায় ২৮০ ডলার বেড়েছে। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ২০ শতাংশ। ১ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতি আউন্স সোনা এক হাজার ৭০৯ ডলারে বিক্রি হয়েছে।
গত বছরের ১ জানুয়ারি এর দাম ছিল এক হাজার ৩৬০ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে স্বর্ণের হাইটেকনোলজির ব্যবহার বেড়েছে। দফায় দফায় স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা মনে করেন, গত কয়েক বছরে ডলার, পাউন্ড, ইউরোর পরিবর্তে স্বর্ণের রিজার্ভ বৃদ্ধি করতে তৎপর হয়েছে বিভিন্ন দেশ। ভিয়েতনাম, বাংলাদেশের মতো দেশ এখন স্বর্ণ রিজার্ভ করছে। আইসিটি টেকনোলজিতে এখন বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ব্যবহূত হচ্ছে। মোবাইল এবং টেলিকমিউনিকেশন্স প্রযুক্তিতে ধাতু হিসেবে স্বর্ণের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ছে।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সভাপতি ডা. দিলীপ রায় বলেন, বিশ্ববাজারে সোনার দাম বৃদ্ধির কারণে দেশীয় বাজারে দাম বেড়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সারা দেশে ৩০ হাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ী রয়েছে। ফলে এই খাতে টার্নওভার কয়েক হাজার কোটি টাকা। তার মতে, বর্তমানে দেশে কোন স্বর্ণ নীতিমালা নেই। এ খাতে রাষ্ট্রীয় কোন পৃষ্ঠপোষকতা নেই। তাই এ খাত রক্ষায় শিগগির স্বর্ণ নীতিমালা করা উচিত।

জুয়েলারি সমিতির সাবেক সভাপতি চাঁদনী চকের সোনার ব্যবসায়ী এম এ ওয়াদুদ খান বলেন, ইরাক যুদ্ধের পর থেকে বিশ্ববাজারে সোনার দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ সময়ে উন্নত দেশগুলো ডলার, ইউরোর পরিবর্তে সোনা কিনে মজুদ করছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি সোনা রফতানি করে সাউথ আফ্রিকা। এর পরই রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও রাশিয়া। কিন্তু বর্তমানে তারা জোগান দিতে পারছে না। কারণ চীনের মতো দেশগুলো সোনা মজুদ করছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে মানুষ তাদের চাহিদা পূরণ করে সোনার মতো বিলাসী পণ্য কিনতে পারছে না। ফলে সোনার বাজারে ক্রেতা কমেছে। তিনি বলেন, ঢাকা শহরেই শতাধিক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।

এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। এখনই তরিৎ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

Advertisements
Loading...