টিপাই মুখ বাঁধ ওদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে ॥ সুরমা ও কুশিয়ারার বুকজুড়ে শুধুই চর আর চর!

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মানুষ বলে নদীর একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে। আবার কতস্থানে নদী ভাঙ্গনে ঘর-বাড়ি, জায়গা-জমি সবই বিলিন হয়ে যাচ্ছে। আবার কতকগুলো নদীতে চর জেগে নৌকা চলতে পারছে না- সবই উপরওয়ালার খেলা। কখনও বন্যার পানিতে মানুস, পশু-পাখি, ঘর-বাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আবার কখনওবা পানির অভাবে হাহাকার নেমে আসে। এই অবস্থা আজ নতুন নয়। পৃথিবীর আদি ইতিহাস তাই বলে।

যখন পাবনার ঈশ্বরদীর সাঁড়া ঘাটে পদ্মার ভাঙ্গনে হাজার হাজার মানুষ পথে বসেছে তখন আবার সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর বুকজুড়ে এখন চর আর চর- সবই তাঁর খেলা!

এক সময়ের খরস্রোতা নদী দুটি এখন স্রোতহীন। বর্ষা মৌসুম ছাড়া পানি থাকে না। চলতে পারে না ডিঙ্গি নৌকা পর্যন্ত। নদীবক্ষ ভরাট হয়ে গেছে। জলের পরিবর্তে নদীর বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। স্রোতস্বিনী সুরমা এখন অনেকটা মরা নদী। গভীরতা কমে ভরাট হওয়ায় সুরমা-কুশিয়ারার জল ধারণ ক্ষমতা এখন খুবই কম। নদীতে যে পরিমাণ পানি রয়েছে তাও বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। পানিতে মারাত্মক দুর্গন্ধ। নদী তীরবর্তী গ্রাম, শহর, বন্দরের ময়লা-আবর্জনা, পয়ঃনিষ্কাশনের নিরাপদ ভাগাড় সুরমা ও কুশিয়ারা নদী। প্রমত্তা এই দুই নদীর বুকে এতদিন শ্যাওলা বাসা বাঁধার সাহস পায়নি। এখন দুটি নদীর বদ্ধ পানিতে শ্যাওলা আর আবর্জনার স্তূপ।

সুরমা-কুশিয়ারাকে এখন মেরে ফেলার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। টিপাইমুখ বাঁধ হয়ে উঠছে সুরমা-কুশিয়ারার গলার ফাঁস। ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী এ দুটি নদীর অববাহিকা ঘিরেই সভ্যতার মানব বসতি ঘটেছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। জীবন-জীবিকা ছিল সুরমা-কুশিয়ারানির্ভর। বিভাগীয় নগরী সিলেটের প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজার ছিল সুরমা নদীর বন্দর ঘাট। তৎকালীন সময়ে প্রমত্তা সুরমার বুকে ছিল উত্তাল ঢেউ আর স্রোত। চলতো বড় বড় জাহাজ, লঞ্চ ও নৌকা। জাহাজের মাস্তুলের কথা ভেবেই সুরমা ও কুশিয়ারায় ব্রিটিশ আমল থেকে এ যাবতকালে নির্মিত ব্রিজগুলো উঁচু করা হয়েছিল। নদীপথ নির্ভর অবিভক্ত ভারতবর্ষের ব্যবসার অন্যতম নৌপথ ছিল সুরমা ও কুশিয়ারা। এ কারণেই উৎপত্তিস্থল থেকে সুরমা-কুশিয়ারা যেদিকেই গেছে সেই তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শহর, বন্দর ও জনবসতি। সিলেট নগরী ও ছাতক শিল্পাঞ্চল এর একটি দৃষ্টান্ত। শুধু আধুনিক সভ্যতা নয় সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকা আধ্যাত্ম ও সাহিত্য জগতেও বিরাট উর্বর ভূমি। আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হজরত শাহজালাল (রহ.), হজরত শাহপরান (রহ.) ও শ্রী চৈতন্যর প্রিয় ভূমি ছিল সিলেট। এছাড়াও এখান থেকেই বিকাশ লাভ করে মরমী কাব্য সাহিত্যের। হাছন রাজা, রাধা রমন, দুরবিন শাহ, আরকুম শাহ’র মতো গীতি কবিরা সুরমার তীরে বসে লিখেছেন অজস মানবতার গান। আজ সুরমা ও কুশিয়ারার করুণ মৃত্যুধ্বনি আগাম বাজছে। এনিয়ে দুশ্চিন্তায় এ অববাহিকতার কোটি মানুষ। তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর।

উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে টিপাইমুখ বাঁধের মরণফাঁদ। ভারত সরকারের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখলেও বিষয়টি আমলে নেয়া হচ্ছে না। দুটি নদীর উৎসমুখে ভারতের অভ্যন্তরে বাঁধ নির্মাণ করে উজান থেকে পানি প্রত্যাহারের লক্ষ্যে টিপাইমুখ বাঁধের কাজ এগিয়েই চলেছে। ফলে গোটা সিলেট অঞ্চল বিরান ভূমিতে পরিণত হবে এমন আশংকায় বিশেষজ্ঞরা। এর পরিণতি সিলেটকে জীববৈচিত্র্য শূন্য করার পাশাপাশি গোটা অঞ্চলকে মরুময় করে তুলতে পারে। এমনকি এই বাঁধ নির্মাণে আন্তর্জাতিক নদী আইনেরও তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে এখন প্রতি সেকেন্ডে ৮০ দশমিক ৬০ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। যদিও কয়েক বছর আগেও এর পরিমাণ ছিল ৩শ’ ঘনমিটার। এরই প্রভাব পড়েছে সুরমার ভাটি অঞ্চলে। মরে গেছে সুরমার প্রায় ৩ কিলোমিটার। বাংলাদেশের সিলেট জেলার অমলশীদ সীমান্ত থেকে মাত্র ১শ’ কিলোমিটার দূরে ভারতের মণিপুর রাজ্যের চোরা চাঁদপুর। ‘সবার জন্য বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি সফলের লক্ষ্যেই ওখানে সুরমা-কুশিয়ারার উৎস মুখের অনতিদূরে স্থাপন হচ্ছে টিপাইমুখ বাঁধ- এমন অজুহাত ভারতের। নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলেও বরাক আন্তর্জাতিক নদী। তাই বরাকে বাঁধ দিয়ে ভাটির বৃহৎ অঞ্চলকে মরুকরণ করার অধিকার ভারতের নেই। প্রকল্পটি জাতিসংঘ, ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংকসহ সব আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিপন্থী। ভারতের বরাক নদী বাংলাদেশের সুরমা, কুশিয়ারার নদীর অমলশীদে এসে মিলিত হয়েছে। বরাক-সুরমা ও কুশিয়ারার এই তিন নদীর মিলনস্থল অমলশীদ এক সময়ে অনেক গভীর ছিল। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার অমলশীদ থেকে সুরমা ও কুশিয়ার দুই ধারায় বিভক্ত হয়েছে। অস্বাভাবিকভাবে অমলশীদে পানি হ্রাস পাওয়ায় বর্তমানে এই দুটি নদীর গতিপথ ভিন্নতা লাভ করেছে। কুশিয়ারার বাংলাদেশ অংশ ভেঙে চর জেগে উঠেছে ভারত অংশে। অপরদিকে, সুরমার বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে বিশাল চর। অনেকটা বদলে গেছে বাংলাদেশের মানচিত্র। যদিও টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে টিপাইমুখ বাঁধ প্রতিরোধ আন্দোলন। ক্ষমতায় থাকাকালে প্রতিবাদ না করলেও বিরোধী দলে এসে এই আন্দোলনে শরিক হয়েছে বিএনপি ও জামায়াত। এ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে জাতীয় পার্টি, জাসদ, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ, খেলাফত মজলিশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, তালামীযে ইসলাম, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। এছাড়াও অঙ্গীকার বাংলাদেশসহ সিলেটের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন একই দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। শুধু বাংলাদেশ নয় এই মরণ বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে ভারতের মণিপুরের লোকজনও। তারপরও ভারত সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি। এদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর ও মিজোরাম সীমান্তে প্রস্তাবিত টিপাইমুখ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিবাদে মণিপুরে চলমান সাইকেল র‌্যালি ৩ মার্চ থৌবাল জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। তানজেং এলাকার উইম্যান ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এই র‌্যালির আয়োজন করে। তাদের অভিযোগ টিপাইমুখ বাঁধ হলে ওই অঞ্চলের ৩২২ বর্গকিলোমিটার এলাকার ৬৭ গ্রাম বিপন্ন হবে।

এই যদি অবস্থা হয় তাহলে নদ-নদীগুলো কিভাবে তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। এক সময়ের প্রমত্তা নদ-নদীগুলো এখন শুধুই কালের স্বাক্ষী হয়েই বেঁচে থাকবে?

Advertisements
Loading...