সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদের উচ্চতা আমার থেকে অনেক বেশি: মাশরাফি

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ মাশরাফি বিন মুর্তজা। আজ ছিল তাঁর জন্ম দিন। তিনি নিজেকে কখনই বড় করে দেখেন না। তিনি মনে করেন, সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদের উচ্চতা তাঁর থেকে অনেক বেশি।

mashrafi

তিনি ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়েছেন অনেক আগেই। ক্রিকেটের এই বরপুত্র কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার নিরন্তর উৎসে পরিণত হয়েছেন। জীবনের পথচলায় আজ ৫ অক্টোবর তাঁর ৩৩ পূর্ণ হলো। দুই বছর পূর্বে একই দিনে পৃথিবীর আলোয় এসেছে তার দ্বিতীয় সন্তান। অর্থাৎ আজ তার সন্তানেরও জন্মদিন। তাঁর এই জন্মদিন উপলক্ষে তিনি অনেক কথা বলেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে। বর্তমান সময়ে জনপ্রিয় এই ব্যক্তিত্বর সেই সাক্ষাৎকার হতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

mashrafi-2

তাঁকে প্রথম প্রশ্ন ছিল ৩৩ বছর কেটেই গেলো, কথা রাখেনি কজন?

উত্তরে মাশরাফি বিন মুর্তজা বলেছেন, সুনীলের এই কবিতা আমি জীবনে অসংখ্যবার শুনেছি, তবে পড়িনি। হয়তো পড়িনি বলেই সবাই কথা রেখেছে!

দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল বয়স বাড়ছে, না কমছে?

মাশরাফির উত্তর: সিরিয়াস হয়ে বলতে গেলে; দুটিই তো হচ্ছে। মৃত্যুর কথা ভাবতে গেলে বয়স কমছে। আমরা সবাই প্রতিদিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আর ম্যাচিউরিটির কথা বললে বয়স অবশ্যই বাড়ছে।

তবে এই উত্তরে মাশরাফি আরও বলেন, আসলে বিভিন্ন জায়গায় আমার বয়স একেক রকম। খেলার মাঠে এক রকম, পরিবারের ক্ষেত্রে এক রকম, বন্ধুদের সঙ্গে আরেক রকম, সব জায়গাতে অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করি। বাসায় যেমন হওয়া উচিত, আমি ঠিক সে রকমই। মাঠে সিনিয়র-জুনিয়র আলাদা করি না, সবার সঙ্গে আমি এক রকম। আবার অধিনায়কের দায়িত্বটুকু তো পালন করতেই হয়। আর বন্ধুদের কাছে আমি বাঁধনহারা। ওখানে ৩-৪ ব্যাচ ছোট কিংবা বড়, আমরা সবাই এক।

mashrafi-3

আপনি কখনোই হইচই করে জন্মদিন পালন করেন না, কেক কাটেন না। কেনো?

মাশরাফি বললেন, নানা বাড়িতে বড় হয়েছি। আমার প্রথম জন্মদিন খুব ধুমধাম করেই পালন করেছিলেন আমার মা। নানা শুধু দেখেছেন। অনুষ্ঠান সব শেষ হওয়ার পর নানা ডেকে মাকে বললেন, ‘ধরো তোমার ছেলে যদি ৭০ বছর বাঁচে, তাহলে ওর বয়স কমছে না বাড়ছে?’ মা মাথা নীচু করে জবাব দিলেন, ‘কমছে।’ নানা তখন বললেন, ‘তাহলে এভাবে উৎসব না করে গরীব-দু:খীদের খাওয়াতে পারো, নফল নামাজ পড়তে পারো।”

আম্মা হয়তো তারপর থেকে সেটাই আঁকড়ে আছেন। আমার বোধ হওয়ার পর দেখিনি আমার পরিবারের কারও জন্মদিন উৎসব করে পালন করা হয়েছে। উইশ করা বা এ ধরনের কিছু তো হয়ই। তবে তা পালন করা হয় না। আমিও ছেলেমেয়েদের জন্মদিনে কেক কাটি না বা পালন করি না। হয়তো ঘুরতে যাই ওদের নিয়ে কিংবা একসঙ্গে সময় কাটাই।

মাশরাফি আরও বললেন, তার মানে এই নয় যে, যারা পালন করে, তারা ঠিক করে না। এটি যার যার নিজস্ব ব্যাপার। আমার মায়ের ভাবনাকে সম্মান করি তাই আমি আমাদের পরিবারে পালন করি না। এই তো।

জীবনের অর্থ আপনার কাছে কি? এমন এক প্রশ্নের জবাবে মাশরাফি বললেন, সিম্পলি বললে, আমার কাছে জীবন মানে ঠিকভাবে বেঁচে থাকা, মূল্যবোধ ঠিক রাখা। আমাদের দেশে সমালোচনা করতে বা বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে সময় লাগে না। আমি অনেক ভেবেছি সেসব নিয়ে। এখন আর আমি ভাবি না। লাভ নেই।

তিনি আরও বলেন, জীবনের অর্থ আমার কাছে সিম্পল চলা। জীবন তো ক্ষণস্থায়ী। কারও সঙ্গে ঝামেলা না বাধানো। সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা, কারও ক্ষতি না করা। কেও যদি এক্সট্রা অর্ডিনারিভাবে চলতে চায়, সেটা সম্পূর্ণ তার ব্যাপার। হয়তো সেটার মাঝেই সে সিম্পপ্লিসিটি খুঁজে নিয়েছে। তবে আমি আমার মতো সিম্পল।

জনপ্রিয়তাকে কিভাবে দেখেন? এমন প্রশ্নে মাশরাফি বলেন, কোনো ভাবেই দেখি না। কারণ আমি এসব নিয়ে ভাবিই না। আমি অতোটা শিক্ষিত নই, তবে একটা ব্যাপার সব সময় মানার চেষ্টা করি। ছেলেবেলায় একবার এক শিক্ষকের সঙ্গে আমি অন্যায় করে ফেলেছিলাম। স্যার তখন বলেছিলেন, ‘আমি তোমাকে ভালো জানি, আমার কাছে খারাপ হয়ো না। ভালো হতে সময় লাগে, খারাপ হতে কিন্তু সময় লাগে না।” এটা আজীবনের জন্য আমার মাথায় গেঁথে গেছে। যাদের কাছে আমি ভালো, তাদের কাছে আর যায় হোক অন্তত খারাপ হতে চাই না।

তবু কি মনে হয়, নিজেকে, সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মাশরাফি সাবলিলভাবে বলেন, আমি কখনোই সেভাবে অনুভব করি না। বিশ্বাস করেন, আমার কাছে সাকিবের উচ্চতা আমার থেকে অনেক বেশি। তামিম, মুশফিক, রিয়াদের উচ্চতা বেশি। এমন নয় যে, বলার জন্য বলছি, সত্যিই তাই অনুভব করি। ওদেরকে সব সময় আমি অন্য জায়গায় রাখি।

তবে এই যে লোকে আপনাকে অতিমানব, মহামানব বলে… সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক সময় এই যুগের মুক্তিযোদ্ধা বলে ফেলে, এসব কিভাবে নেন আপনি?

মাশরাফি বললেন, এসব বলা আসলে বোকামি ও ভীষণ বাড়াবাড়িও। আমি প্রচণ্ড লজ্জা পাই, তার চেয়ে বেশি বিব্রতবোধ করি। টিমমেটদের কাছে সবচেয়ে বেশি বিব্রত হই। ওরাও তো আমার মতোই দেশের জন্য নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছে।

বিশেষ করে, ক্রিকেটারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়টি টানলেই খুব খারাপ লাগে। আগেও অসংখ্যবার আমি বলেছি, আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ সব কিছুর আগে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্থান সব কিছুর ওপরে। সামান্য ক্রিকেট খেলা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা বাতুলতা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

হ্যাঁ, এটি ঠিক আমাকে যে ভালোবাসে, তাকে আমি মূল্যায়ন করি। তবে সে ভালোবাসার প্রকাশ বা ভাষা ব্যবহারে পরিমিত হওয়া প্রয়োজন।

অনেক দিন বাঁচতে ইচ্ছে করে?

এমন এক প্রশ্নে বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই জনপ্রিয় ব্যক্তি বর্তমানে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা বলেন, ইচ্ছে করে, অবশ্যই করে। সবারই ইচ্ছা করে বাঁচতে। আমারও করে খুব। আমার লাইফস্টাইল দেখে অনেকের হয়তো এটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কারণ আমি জীবনভর দুরন্তপনা করেছি, অর্থাৎ ঝুঁকির সঙ্গে বসবাস। তবে এখন ছেলে-মেয়ের দিকে তাকালে মনে হয়, চলতেই থাকুক এমনিভাবেই, অনেক বছর বেঁচে থাকি!

একজন সফল অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি বিন মর্তুজার খ্যাতি আজ বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বময় গড়িয়েছে। বিশ্বের ক্রিকেট অনুরাগিরাও তাঁর প্রশংসা করেন। আজ তাঁর জন্মদিনে আমাদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

মন্তব্য

Loading...